|| পঁচাত্তরে পা, সাবালক হলো না? || T3 বিশেষ সংখ্যায় ইন্দ্রাণী ঘোষ

রান্নাঘর ও স্বাধীনতা

রান্না যে এক শিল্প তা লীলা মজুমদার তো কবেই বলে গেছেন, সেকালের গৃহিনীরা রেঁধে বেড়ে খাইয়ে হৃদয় অধিকার করে নিতে পারতেন.। সেই চুড়ো করে খোঁপা বাঁধা, উঁচু করে কোমড়ে শাড়ী গোঁজা গিন্নীরা । লীলা মজুমদার কথার জাদুকরিনী, তাঁর বই নিয়ে তো আজও রাতে ঘুমোতে যাই.। কি যে সখ হয়, অহি দিদির মত কুমড়োর ছক্কা আর পরোটা বানাতে, ছোট ছোট রোগা হাতে গোলাপী বাতাসা আর ভাজা মৌরি তুলে দিতে, দুধ জ্বাল দিয়ে তাঁর মোটা সরটি লালচে হয়ে যাবার পর তুলে রাখতে, ডুলিতে কুঁচো মাছ রাখতে. কিছুই করা হয় না .। ওই দিনগত পাপক্ষয় ছাড়া .। রান্নাঘর মেয়েদের স্বাধীনতার জায়গা তো এককালে ছিলই, তাদের সুখ, দু:খ মিলে যেত গনগনে আঁচের আগুনে, বা ধরতে থাকা উনুনের ধোঁয়াতে, নিভু নিভু আঁচে মিলে যেত সংসারের সাতকাহন. । রান্নাঘরে দুমদাম আওয়াজ মানেই সেদিন গিন্নী মার মেজাজ খারাপ. আর যেদিন সব শান্ত সেদিন গভীরে দু:খের এস্রাজের ছড় একাএকা ধুন তুলছে. এই রান্নাঘর যে শিল্পের এক পিঠস্থান তা স্বীকৃতি পেতে বেশ সময় গড়িয়ে গেছে ।
তা এইরকম কজন গিন্নীমাদের আমি চিনি বৈকি তাঁরা সকলে আধুনিকা, বিদূষী । সকলেই রান্নাঘরকে নিজের প্যাশন এবং খোলা আকাশ ভেবে থাকেন ।

তা আজ ভাবলাম সেই বান্ধবীদের কথা বলি যারা রান্নাঘরের খোলা জানলা দিয়ে আকাশকে অনেকখানি ঢুকিয়ে এনেছে ।

সাবিনা ইয়াসমিন – সাংবাদিকতা, শিক্ষকতা করার পর এখন জমিয়ে রান্না করেন আর মাটির কাছাকাছি রান্নার খোঁজে প্রায়ই বেড়িয়ে পড়েন. সাবিনার দু হাতে উপচে ওঠে গল্পে.। মাটির গন্ধ মাখা, রান্না আর ঘরকন্নার গল্পে. । মায়ার মিশেলে বাংলার মাঠে ঘাটে হওয়া শাক সবজি কেমন করে পরিণত হয় অমৃতে সেই স্বাদ সাবিনার লেখনী বেয়ে কড়া নেড়ে যায় রসনায়.। প্রান্তিক মানুষদের, সব্জি বিক্রেতাদের, মাঝিদের হাল হকিকতের খবর সাবিনার ঝুলিতেই থাকে ।

অমৃতা ভট্টাচার্য – অধ্যাপিকা অমৃতার কলম তো নয় যেন তুলি. রান্নার কথা বলতে বলতে উনুনে গরম ভাতের উপরে কুমড়োর ডগার ফুঁটে ওঠার কথা বলে যখন, জলছবির মত ভাতের টগবগানির মাথায় কুমড়ো ডাঁটাকে দেখতে পাই । ডাবু হাতা, বাজারের থলি, মিটসেফ এদের আত্মকথাও থাকে । অমৃতা রান্নাঘরের গল্প নিয়ে বই করলে ইতিহাসের দলিল হবে বৈকি । রান্নাঘর যে ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ সে তো বলাই বাহুল্য ।

শ্যামশ্রী চাকী – উত্তর বঙ্গের মেয়ে. তিস্তা পারের মেয়ে। তিস্তা পারের মানুষদের মধ্যে কেমন একটা পলি মাটির গন্ধ থাকে । নরম তুলতুলে ভেজা ভেজা মনের গন্ধ। শ্যামশ্রী যেমন গাছ করে, তেমনি লেখে, তেমনি রান্না করে । ওর হেঁশেলের নাম ‘পুষ্পান্ন’ ।
একা হাতে ‘বন্দে মাতরম থালি’ রান্না করেছে ৫০ জনের জন্য । আমাদের পাড়াতে বিশাল মাধবীলতা দিয়ে ঘেরা পুঁচকে বারান্দাওয়ালা ফ্ল্যাটটার ভিতরে এই তিস্তা পারের মেয়ে যে কি কর্মকান্ড ঘটিয়ে চলে ওই জানে ।

মৌমিতা ব্যানার্জী আচার্য – ভাইজাগে থাকে । প্রবাসে থাকলে সর্ষে ইলিশ, চিংড়ি, কচি লাউ তো বুকের ভিতর জেগে থাকবেই তাই মৌমিতা ‘রসুইঘর ‘ শুরু করেছে । মৌমিতার সাথে আমার আলাপ আমার ইস্কুলের অতি আদরের বান্ধবী সংযুক্তার সূত্রে ।

যাই হোক এত কথা বলার একটাই কারন আজ স্বাধীনতা দিবস আর আমার মনে হল রান্নাঘর যে স্বাধীন আকাশ হতে পারে সেটা মনে করার সবচেয়ে ভালো দিন আজকে । কাজেই রান্নাঘর যাদের প্যাশন তাদের বড়সড় একটা সেলাম আর নমস্কার ঠুকে দিলাম ।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।