রম্য রচনায় ইন্দ্রানী ঘোষ

অচেনাকে ভয় কি আমার ওরে (সিরিজ ২) 

এর মধ্যে বেশ কয়েক বছর কেটে গিয়েছে । ওলিয়েন্ডর দিদিমণি মা হতে চলেছেন । গরমের ছুটি হওয়ার পর তিনি সমতলে নেমে আসবেন । তাঁকে নিতে বাপের বাড়ীর লোকজন এসেছেন । তাদের ছোট্ট কাঠের বাড়ীটাতে মজলিসি বৈঠক বসেছে । অধ্যাপক সাহেব দিদিমণি বাপের বাড়ীর লোকেদের জিজ্ঞেস করে বসলেন ‘আচ্ছা ওলিয়েন্ডর নামটা কেন রেখেছিলেন আপনাদের মেয়ের? এক বঙ্গললনার এরকম বিদেশী নাম? কোন কারন ছিল?’ দিদিমণির মা বললেন ‘আমার দাদুর রাখা নাম বাবা, আমার দাদু ব্রিটিশ ছিলেন, মনে প্রাণে এ দেশকে ভালবেসে, বাঙালি মেয়েকে ভালবেসে বিয়ে করে এখানেই থেকে গিয়েছিলেন ।ইংরেজি ফুলের নামে মেয়েদের, নাতনিদের নাম রাখাটা তাঁর সখ ছিল । বাকি তিনি আদ্যপান্ত বাঙালি ।’ কথায় কথায় সেদিন জানা গেল দিদিমণির শরীরে সাহেবের রক্ত আছে তাই তিনি মেমসাহেবদের মতই সাহসী ।
তা সে যাই হোক দিদিমণি তো সমতলে নেমে এলেন । অধ্যাপক সাহেব তো একা অনেকদিন পর । একদিন লাইব্ররীতে বেশ কিছুটা সময় কাটিয়ে বাড়ী ফিরছেন । আবার সেই সাহেব এসে হাজির । অধ্যাপক অনেক বলে কয়ে তাঁকে বাড়ীতে নিয়ে এলেন । সাহেবের পাহাড়ের অর্কিড এবং পাখী নিয়ে জ্ঞান অধ্যাপক মশাইকে মুগ্ধ করল । তিনি দু কাপ কফি বানিয়ে নিয়ে এলেন । সাহেব কফির কাপে চুমুক দিলেন, আবার ম্যাচবক্স চাইলেন । সাহেব চুরুট ধরালেন অধ্যাপক মশাই সিগারেট । দুজনের মৌতাত জমে উঠতে অধ্যাপক জিজ্ঞেস করলেন ‘ ওয়ের একয্যাক্টলি ডু ইউ লিভ সার?’ সাহেব বললেন ‘ সিন্থেসাইসড উইথ নেচার আই এক্সিষ্ট, বাট আই উইল সি ইউ সুন’ । এই বলে সাহেব উঠে পড়লেন এবং কর্পূরের মত উবে গেলেন ।
অধ্যাপক মশাই আর দেরি না করে, সেদিন রাতেই বাড়ী তালা মেরে বেরিয়ে এলেন এবং বাসস্ট্যান্ডের কাছে একটা সরাইখানায় রাত কাটিয়ে পরদিন ভোরে পাহাড় থেকে নেমে এলেন ।
যথাসময় ওলিয়েন্ডর দিদিমণির একটি পুত্রসন্তান জন্মাল । অধ্যাপক মশাই ছেলের মুখ দেখে চমকে উঠলেন । অবিকল সেই সাহেবের মুখ । আর দিদিমণি মা হেসে, কেঁদে আহ্লাদে আটখানা হয়ে বললেন ‘এ যে আমার সাহেব দাদু ফিরে এলেন’ । ওলিয়েন্ডর দিদিমণির আর অধ্যাপক পলাশ বসু দৃষ্টি বিনিময় করলেন । সে দৃষ্টিতে শুধুই মুগ্ধতা আর বিশ্বাস ছিল ।
সে ছেলে এখন ইংল্যান্ডে । আমার সাথে একবার দেখা হয়েছিল তাঁর ।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।