সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে ইন্দ্রাণী ঘোষ (পর্ব – ২)

আরশি কথা

ফিনফিনে বোন চায়না কাপে সুগন্ধী দার্জিলিং চা নিয়ে জানলার পাচশে বসে ঝোরা. না: আজ আলো জ্বালা যাবে না. মোছা মোছা রোদ্দুর রঙ, জল রঙ মিলিয়ে কেমন ঝিম ধরানো সিম্ফনি. পড়তেও ইচ্ছে করছে না ঝোরার. ফোন দেখবে? না: থাক. নিরবিচ্ছিন্ন একাকীত্ব বড় মহার্ঘ.
বারান্দার দিকের দরজা খুলে দেয় ঝোরা. ঘরে ঢুকে আসে শুকনো পাতারা. শহরের অনতিদুরে এই জায়গাটুকু ঝোরার বড় পছন্দের. সামনে এক ফালি বাগান. কেয়ারি করা নয়. দু খানা ঝুপ্সি আম গাছ, গুটি কয়েক বাতাবি লেবু, খানিক ল্যান্টানা আর কিছু জূঁই, বেলের গাছ. দরজা দিয়ে ঢুকে আসে শুকনো পাতার দল. এসে ঝাপ্টা মারে আরশিতে. একেকটা আরশি একেক দিকে লাগানো এ বাড়ীতে. নিজের হাতে সাজানো বাড়ী ঝোরার. আয়নার প্রাধান্য বেশি. নিজের অস্তিত্ব প্রতিবিম্বিত হয় যেন এ বাড়ীতে ঝোরার. প্রিসিমের মধ্যে দিয়ে সাদা আলোর সাত রঙের বিচ্ছুরণ যেন |
দরজার মুখোমুখি যে আয়না সেই আয়নাতে বাগানের গেট থেকে বাড়ী অবধি আসার পথটি দেখা যায়. সে পথ ঢাকা ঝরা পাতায়.. চায়ে চুমুক দিয়ে আয়নায় চোখ রাখে ঝোরা.সিপিয়া রঙের পাতারা আয়নায় ধাক্কা খেয়ে পড়ে আছে মেঝে জূড়ে. আয়নায় আরেকজনকে দেখা যাচ্ছে অবিকল তাঁর মত দেখতে. তবে সে সদ্য কিশোরী. এর সাথে মাঝে মধ্যে দেখা করাটা খুব জরুরী. এবার মুখোমুখি বসে সে আয়নার অবয়বের সাথে. ঝোরা জিজ্ঞেস করে ‘কেমন আছ?’ উদাস চোখে কিশোরী বলে ”কেমন আর থাকব, একই’. ঝোরা বলে ‘মাঝেমাঝে এলে তো পার, তোমার সাথে কথা বললে কেমন নদী হয়ে বইতে পারি. না হলে তো হারিয়ে যাওয়া বালুচরে.’ কিশোরী বলে ‘আমার একটা নাম দাও’, ঝোরা বলে ‘আচ্ছা বেশ তোমার নাম দিলাম স্বচ্ছতোয়া, পছন্দ?’. কিশোরী বলে ‘এ নামের মানে কি?’ ‘স্ফটিক জলের নদী’ ঝোরা বলে..
বাইরের আলো নিভে আসে স্বচ্ছতোয়াকে আর দেখতে পায় না ঝোরা. রাস্তায় শুরু হয় নিয়নের জলসা. আকাশের তারারা মিটিমিটি জ্বলে. আজ পূর্ণিমা. চাঁদের আসরে তারারা ম্লান. ঘরের আরশিরা চলে যায় পর্দার আড়ালে. রাস্তার আলো এসে ঘরে পড়ে. দু একটা রাতচরা পাখী এসে ঝুপ্সি আম গাছটাতে বসে. আজ আলো জ্বালবে না ঝোরা. রাস্তার আলোতে শুকনো পাতা কুড়োতে বসে ঝোরা. কয়েকটা পাখীর পালক উড়ে এসেছে শুকনো পাতার সাথে. ছাতারের পালক হতে পারে. টেবিলের এক প্রান্তে নুন, গোলমরিচের পাত্র, জলের জাগ. আরেকপ্রান্তে উপচে পড়ছে বইপত্র. রান্নাঘরের পরে আরও দুটি ঘর. শুকনো পাতা জড় করে রান্নাঘরের জানলা দিয়ে বাইরে ফেলে আসে ঝোরা. শুকনো পাতা জমালে কেমন হয়? না: মায়া বাড়াবে না ঝোরা. শুকনো পাতা, মলিন কুসুম, রঙীন পালক উড়িয়ে দেয়াই ভালো. নিজেদের ঠিকানা তাঁরা নিজেরাই খুঁজে নেবে.

বাজারের ব্যাগ হাতে নেয় ঝোরা. খানিক বাজার ঘুরে আসা যাক. সাতদিন বাড়ীতে সে সম্পূর্ণ একা. বাড়ীর সকলের ফিরতে এখনো দিন সাতেক দেরি. তরিবতের বাজারের কোন দরকার নেই. আলু, ডিম, পেয়াজের জোগান থাকলেই হল. ফাগুন বাতাসে ভেসে ভেসে চলে ঝোরা. পলাশ পাপড়ীর মত নির্ভার লাগে নিজেকে.আলু, পেয়াজ, ডিমের সাথে ফুলকপি, কড়াইশুটি নেয়, সাথে কুচো চিংড়ি অল্প করে. চিংড়ি ছাড়াতে দিয়ে, বাজারের বাইরে এসে খানিক মার্মালেড আর সসেজ কেনে হাল ফ্যাশনের দোকান থেকে.
বাজারের শেষে বাড়ীর পথ ধরে ঝোরা, বাতাবি লেবু ফুল আর আমের মঞ্জরীর গন্ধে আকুল এলোমেলো বাতাস ঝোরাকেও এলোমেলো করে দেয় আদরের আতিশয্যে….

(চলবে)

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।