সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে ইন্দ্রাণী ঘোষ (পর্ব – ৩১)

আরশি কথা

কোনমতে হাত মুখ ধুয়ে ডাইনিং হলে যায় সকলে. ধোঁয়া ওঠা থুকপা, হাতে করা রুটি আর স্কোয়াসের তরকারী নামিয়ে দিয়ে যায় প্রচন্ড গম্ভীর মুখের চৌকিদার. রহস্য বুকে জড়িয়ে সিকিমের এই প্রত্যন্ত জনপদ যেন ধ্যানগম্ভীর সন্ন্যাসীর মত স্থির হয়ে থাকে. পেটে আগুন জ্বলছিল সকলের. ওই হাড় কাঁপানো শীতে ধোঁয়া ওঠা থুকপা খেয়ে যেন সকলের অমৃত ভক্ষণ হয়. রাতে যে যার কম্বলের নীচে ঢোকার আগে পরেরদিনের কাজের প্ল্যান ঠিক করে নেয়. প্রধান লামার সঙ্গে দেখা করতে হবে. অপূর্ব এখানে আসার আগেই কথা বলে রেখেছে ওনার সাথে. উনি সকলকে স্বাগত জানাতে কাল গেষ্ট হাউসে আসবেন তখনই সেই অমূল্য তথাগত দর্শনের সময় ও স্ক্রোল দেখার সময় সকলকে জানিয়ে যাবেন. মনাষ্ট্রীর বিশেষ কক্ষের শুট্যিং এর জন্যে সময় বরাদ্দ উনি করবেন.
সকালে উঠেই ঝকঝকে রোদ্দুর. ঝোরার ঘুম ভাঙল চৌকিদারের দরজার ঠকঠকানিতে. কম্বল ছেড়ে বেড়িয়ে চায়ের কাপ হতে নিয়ে বাইরে আসে ঝোরা. বাইরে এসে অবাক হয়ে যায়. এ তো সেই বাড়ী যা ঝোরা আয়নার ভিতরে দেখেছিল. কাল রাতে কিছু বুঝতে পারে নি অন্ধকারে. কাঠের বাংলোর সামনের দিকে বসবার ঘর, খাবার ঘর. পেছনে সার দিয়ে ছয়খানা ঘর. ঘরগুলির পেছনদিকে লম্বা পায়ে চলা পথ সোজা গিয়েছে রান্নাবাড়ীর দিকে. রান্নাবাড়ীটা মূল বাড়ীটার চেয়ে আলাদা. রান্নাবাড়ীর সামনে প্যান্সির বাগান. বাংলোর সামনের দিকে জেরেনিয়ামের সারি, কিছু অর্কিড, কিছু ক্রিসান্থিমাম, আর নাম না জানা লাল নীল ফুলের সারি. বাগানের সামনের দিকে দুটি রডোরেন্ড্রনের গাছ, ফুলে ফুলে ছেয়ে আছে. আর এই জেরেনিয়ামের বাগানের মধ্যে এক বিশাল ব্ল্যাক প্যান্থারকে চেন দিয়ে বেঁধে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন এক সৌম্যকান্তি লামা. ঝোরা বাক্যিহারা হয়ে যায়. এ তো ব্ল্যাক প্রিন্স. আয়নার ভিতরের সাম্রাজ্যে ঝোরার সাথে এর মোলাকাত করিয়েছিল স্বচ্ছতোয়া. টিমের বাকি সকলে একে একে বারান্দায় আসে হাতে চায়ের কাপ নিয়ে. সকলেই থমকে যায় বিস্ময়ে. ঝোরাদের সামনে সৌম্যকান্তি সন্ন্যাসী এগিয়ে আসে. হাতে ধরা ব্ল্যাক প্রিন্সের গলার চেন. সকলে ভয়ে কাঠ হয়. সন্ন্যাসী ইশারা করেন, আরেক সন্ন্যাসী লামা এসে ব্ল্যাকপ্রিন্সকে নিয়ে যায়. কালো মখমলি কোট আর ভাঁটার মত চোখ ওই সুন্দর রোদ ঝরা সকালেও সকলের শিরদাড়া দিয়ে ঠান্ডা স্রোত নামিয়ে দেয়. ঝোরা মনে মনে ভাবে এই এত সুন্দর ছবির মত পাহাড়ী গ্রাম, তাতে রঙীন কারুকাজ করা এত সুন্দর মনাষ্ট্রী, এই মনাষ্ট্রীর ভিতরে রয়েছেন সেই সোনার বরণ তথাগত, সৌম্য সন্ন্যাসী যেন মনের সমস্ত তাপ হরণ করে নিতে পারেন তাঁর উপস্থিতিতে, তবে তাঁর হাতে এই সাক্ষাত যমদূত কেন? কোন বিপদ বা রহস্যের ইঙ্গিত আছে কি এই পরিবেশে?

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।