এক মাসের গপ্পে ঈশা দেব পাল (পর্ব – ৪)

বিভাস বসুর বউ – ৪

রোজি চুপ করে থাকে। হয়ত বুঝতে পারে একটা অমোঘ উত্তর আমি এড়িয়ে গেলাম। রোজি ঠিক যার উপস্থিতির কথা বুঝে নিতে চাইছে তার কথা আমার বলা হলনা , যদি ও পলিটিক্যালি কথাটা ঠিক ই। সুপ্রভর বাড়িতে নতুন কেউ থাকেনা। এখনো। রোজি কথা ঘুরিয়ে দ্রুত বলে—আজ তো হলনা, কাল যাবি তো হাতি দেখতে ?
চকিতে মন টা ভাল হয়ে গেল। একটা মেয়ে হাতি কদিন ধরে ফরেস্টের কাছে বসে আছে। ফরেস্ট থেকে মাঝে মাঝেই হাতির দল চলে আসে, আবার চলে যায় ও। সেরকম ই দলছুট মনে হয় এটি। একটা বেড়ার ওইপারে ঘন জঙ্গল। ঐ কাঁটাতাড়ের বেড়াটার ওদিকে কাউকেই যেতে দেওয়া হয়না। আর হাতিটা কোন পথে কে জানে , ওই বেড়াটার কাছাকাছি ই এসে বসে আছে। কলেজে শুনেছিলাম কদিন আগে তুরীপাড়া বলে একটা জায়গায় হাতির দল তান্ডব করেছে, হয়ত তাদের ই কেউ দলছুট হয়েছে। ফরেস্ট ডিপার্ট্মেন্ট থেকে একজন মাহুত এসে দেখাশোনা করছে আর হাতিটা কে জঙ্গলে ফিরিয়ে নিয়ে যাবার চেষ্টা ও করছে। সবাই তাকে দেখতে যাচ্ছে কদিন ধরে। আমি আনন্দে উঠে বসে বলি—দাঁড়া, রিমা দের একটা ফোন করি। ওরা সবাই বলছিল যাবে। আমাকে আজ ই বলছিল কাল গেলে কখন যাব …।রোজি বেশ আশ্বস্ত হয়ে হাসে, সম্ভবত আমার আনন্দ দেখে।
অল্প আগের মনখারাপ থেকে বেরিয়ে খানিকটা খুশি মেখেই সাড়ে আটটা বাজলেই খেয়ে নিই, বেশ গরম ঝাল চিকেন এর সঙ্গে রুটি। ডিনার হয়ে গেলে আমরা দুবোনেই হানি লেমন খাই। রোজি কে গ্লাস টা এগিয়ে দিয়ে বলি—ঐ বিভাস বসু এখনো ফেরেনি , জানিস তো ?
–রোজি জানে,–তাই বলে— গেল কোথায় বলতো ? উবে যাওয়া এত সোজা ? মারা ই গেল নাতো !
—নাহ, তাহলে খবর টা আসত ই। কোথাও লুকিয়ে আছে, হয়তো নতুন বিয়ে টিয়ে করেছে, তাই নিজেকে লুকিয়ে রেখেছে।
রোজি বিষন্ন হয়ে বসে থাকে। তারপর বলে—এই দুবছরে বউটার কি চেঞ্জ হল , না ?
আমি চুপ করে থাকি। প্রথম চাকরি পাওয়ার পর বাবা এসে গোটা দশেক বাড়ি রিজেক্ট করে বিভাস বসুর বাড়িটাই পছন্দ করেছিলেন। বাড়ি থেকে বেরিয়ে প্রথম এতদূরে চাকরি। বাবা খুব ভয়ে এবং চিন্তায় ছিলেন। এখানকার মানুষজন দেখে অল্প হতাশাও ছিল বাবার। মনে হয়েছিল আমি এতদিন যেভাবে থেকেছি তার সঙ্গে মানিয়ে চলা খুব কঠিন। চিরকাল অভিজাত স্কুল কলেজে পড়েছি, অভিজাত পোশাক পড়েছি, নামী স্কুলে গান শিখেছি, বাড়িতে বসে ছবি আঁকা শিখেছি , সে সব বিদ্যার চর্চার জায়গা তো এটা নয়ই, বরং সাংস্কৃতিক দূরত্ব রেখে আমি কিকরে থাকব সে এক বিরাট চিন্তা ছিল বাবার। অথচ প্রথমবার পাওয়া কলেজের চাকরি আমি ছাড়তে চাইনি কোনো কারণেই। তাই অনেক দেখেশুনে বাবা বিভাস বসুর বাড়িটাই পছন্দ করলেন। বাড়িটা দারুণ। এই এলাকায় একমাত্র তিনতলা বাড়ি। ভদ্রলোক হাই স্কুলে ইংরেজি পড়ান। সারাদিন বাড়িতে টিউশান পড়ান। ছাত্র-ছাত্রীদের ভিড় লেগেই থাকে। বাবার মনে হয়েছিল বেশ ভাল, সুস্থ পরিবেশ। বাড়ির একতলায় পাশাপাশি দুটো ফ্ল্যাট। দুটোই সুন্দর। সাদা মার্বেল । বড় বড় বারান্দা। কাঁচের জানালা। কাঠের আলমারি সহ। আমার ও ভাল লেগেছিল। কলেজের নতুন দিদিমণি বলে উনি সাদরে আমার থাকার ব্যবস্থা করেছিলেন, ফ্ল্যাটে প্রয়োজনীয় কিছু রেনোভেট ও করে দিয়েছিলান। ওনার বয়স প্রায় পঞ্চাশ। অত্যন্ত সৌম্যদর্শন। খুব ধীর এবং ভদ্র কথা। শিক্ষক বলতেই যে ছবি মনে ভেসে ওঠে উনি যেন ঠিক তাই। ছেলে মেয়ে নেই। স্বামী-স্ত্রী। বউ কে দেখেই শুধু অবাক হয়েছিলাম, হাসি পেয়ে গেছিল। একটু ভয় ও লেগেছিল। অদ্ভুত সাজ, চোখে ঘনিয়ে ওঠা সন্দেহ, নিজের বয়স কে ঢাকার প্রাণপণ চেষ্টা। ভদ্রলোকের সৌম্য, শান্ত চেহারার পাশে বড্ড বেমানান লেগেছিল। যেন প্রকৃতির কি একটা নিয়ম ভুল হয়ে গেছে তাদের ক্ষেত্রে। মনুষ্য জীবনে নারী সুন্দর হবে, পুরুষ কম সুন্দর এটাই কাম্য। কিন্তু এখানে প্রকৃতির বিপরীত বিচারের শাস্তি নিয়ে এই মহিলা যেন বিরক্ত, অস্থির। রাতে মাঝে মাঝেই ভদ্রমহিলার অতি অভদ্র চিৎকার ও শুনতাম। কিন্তু ভদ্রলোকের কন্ঠ ও শোনা যেত না। এ ও যেন প্রকৃতির বিরুদ্ধাচার কে জোর করে অতিক্রম করার মরীয়া চেষ্টা। পাশের ফ্ল্যাটে দুই দিদিমণি থাকতেন, তাঁরা বলেছিলেন, বিভাস স্যারের কলকাতায় এক বান্ধবী আছেন। কলেজ লাইফের। ওনাকে ভালবেসেই বিয়ে করেননি সেই মহিলা। তার কাছে মাঝে মাঝে স্যর যান কলকাতায় কাজে যাবার নাম করে। অন্তত ওর বউ এর সেরকম ই সন্দেহ। তবে বাকি পৃথিবীর সব মেয়েদের নিয়েই সন্দেহ করেন তিনি। সে ছাত্রী হোক বা স্থানীয় দিদিমণি। স্যর কারোর সঙ্গে কথা বললেই উনি এরকম ই ঝগড়া করেন। বুঝতে পারি একটা তুমুল ইন্সিকিউরিটি ওনাকে কাবু করে রেখেছে। তাই ই এত ঝগড়া। শুধু বুঝতে পারতাম না এত মানসিকতার তফাতের দুটো মানুষের বিয়ে হল কিকরে ?
এখানে, এই ছোট জায়গায় অনেক মিথ্যে সত্যি ঘুরে বেড়ায়। লোকে স্বাভাবিক সম্পর্ক কে অস্বাভাবিক করে দেখে। তাই সব কথায় আমি কান দিই না। কিন্তু বছর খানেক হয়ে গেল ভদ্রলোক নিরুদ্দেশ। আজ ও ফেরেন নি। দেখা গেল ব্যঙ্কে বউ এর নামে প্রায় সব টাকা রেখে দিয়েছেন। স্কুলের টাকারও বউ নমিনি। কিন্তু বিভাস বসুর বাড়ি ছাড়ার পরেই ভদ্রমহিলা কেমন অদ্ভুতভাবে বদলে গেলেন। প্রথমদিকে একা একা চিৎকার করেই কাঁদতেন, মাস তিনেক পর হয়ত খেয়াল হল এই কান্না কোথাও গিয়ে পৌঁচচ্ছেনা। তারপর ই বদলে গেলেন। সাজেন না। মুখরা ভাব টাই নেই। বরং মুখের মধ্যে একটা ভ্যাবাচাকা ভাব ফুটে আছে, যেটাকে কষ্ট করে ও আটকাতে পারছেন না। আগে ওনাকে দেখে আমারই হাসি পেত, করুণাও হত। কিন্তু এখন ওনার ওই দৃষ্টি আমার সহ্য হয়না। যতবার ই দেখি একটা তীব্র আশঙ্কা আমাকে পেড়ে ফেলে। সেটা ঠিক কিসের ভয় আমি বুঝিনা।
আমি হেসে বলি রোজি কে— দেখেছিস তো, কেন বিয়ে করিনা । করতে চাইনা। সম্পর্কের কোনও ভবিষ্যৎ হয় ?

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।