বাইরের পর্দা ধরে থমকে দাঁড়ালো সে । অল্প ভয় ভয় লাগছিল তার। এরকম দামী বাড়িতে এলে যেরকম লাগে আরকি। অথচ আত্মহত্যার চিন্তা করার সময় তার ভয় লাগেনা। মানিয়ে নেওয়া আত্মহত্যার চেয়েও কষ্টের ।
এত বড় ফ্ল্যাট সে আগে দেখেনি। বোঝাই যাচ্ছে দুটো বা তিনটে ফ্ল্যাট জুড়ে এটা বানানো। মেঝেটা এমন চকচকে যে মনে হচ্ছে মুখ দেখা যাবে। এরকম মেঝেতে তার হাঁটতে ভয় লাগে। পড়ে যাবে মনে হয়। সে প্রায় তিনদিকে ঘেরা সোফার তিনটে বসার জায়গার একটায় গিয়ে বসে পড়ল । কতক্ষণ আর অপেক্ষা করে থাকবে ? কেউ তাকে বসতেও বলছেনা। দিদি তাকে দাঁড়াতে বলে ভেতরে গেছে। বসে বসে দেখছে কী শান্ত বাড়ির ভেতরটা। অথচ ভেতরে এ বাড়ির বৌদি আছে, তার দিদি ভেতরে গিয়ে তাঁকে মাসাজ দিচ্ছে । দুজন কাজের লোকও আছে। একটা বড় হলঘরের মত রান্নাঘরে রান্না হচ্ছে। কিন্তু প্রায় নিঃশব্দে যেন। বাসনের হাল্কা টুংটাং ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছেনা। তাদের বাড়িতে এরকম নিঃশব্দ সকাল ভাবা যায় ? গরীব আর বড়লোকের সকাল –বিকাল ও আলাদা হয়? বাড়িঘরের মত ? সে আকাশ পাতাল ভাবে আর দেখে দেওয়ালে কেমন একটা খড়ের গাদার মত রং, তার একপাশে পোড়ামাটির কাজকরা সাজ। তাদের বেলচা গ্রামে সাঁওতাল বাড়িতে এরকম ভাবে ঘর সাজাতে দেখেছে। আর দেখে বারান্দা জোড়া ফুলের টব, কিন্তু টবগুলো যে কী সুন্দর ! ঘর সাজানো দেখতে দেখতে মুগ্ধ হয়ে যায় সে । তার সংসারও হবে এরকম? রামরাজ্যের মত শান্তি থাকবে সেখানে ?
রামরাজ্যের আশায় সে বিয়ে করেছিল , একই আশায় বিধবা হবার পর জামাইবাবুর ডাকে কলকাতাও এসেছিল। প্রায় তিনবছর আগে তার বিয়ে হয়েছিল। গ্রাম থেকে সে বর্ধমানে এল শ্বশুরবাড়ি। বর ছিল ইলেকট্রিক মিস্ত্রি। ভালই কাটছিল তার। শাশুড়ি আর ননদের মৃদু অত্যাচার সে হজম করে নিচ্ছিল। কিন্তু তারের কাজ করতে গিয়ে বর মরে গেল দুম করে। শাশুড়ি তাকে অপয়া, অলক্ষ্মী বলে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিল। ভাই বলেছিল—ওই বাড়িতে তোর সমান অধিকার। দরকার হলে থানা পুলিশ করব। কিন্তু তার ফিরে যেতে ভয় হচ্ছিল। তখন জামাইবাবু এল তার ভগবান হয়ে। দিদি বিউটি পার্লার খুলেছে। সেখানে তার লোক চাই। সে কাজ শিখে নিক। ঢোলা সালোয়ার পরে মোটা বিনুনি বেঁধে কাঁধে ব্যাগ নিয়ে বেশ খুশিমনে সে চলে এল দিদির গড়িয়ার বাড়িতে। দেখল রমরম ব্যাপার। একতলায় পার্লার। দোতলায় দিদিরা থাকে। পার্লারে যেতে শুরু করে সেও বেশ চকচকে হয়ে গেল। তার চুল হেনা মেহেন্দি করে নানারকম কাটাকুটি করে, নখের রং বদলে , মুখে সুগন্ধী ফেসিয়াল করে সে ভুলে গেল সে কে ! মাত্র একবছর তার কাটল এরকম। সুখেই।
গত মাসে দিদি আবিষ্কার করল সাড়ে নটা বাজলেই সে পার্লারে এসে পড়ছে কেন। দিদি তখন রান্নাবান্নায় ব্যস্ত থাকে। দিদি হঠাৎ একদিন অসময়ে পার্লারে এসে দেখল জামাইবাবু বাজার ফেরত পার্লারে ঢুকে তার উরুতে হাত বোলাচ্ছে। দিদি কাঁদলনা, কিচ্ছু বললনা। এমন ভান করল যেন কিছুই দেখেনি। কিন্তু তার বিয়ের ব্যবস্থা দেখল। যেসব জায়গায় মাসাজে যায়, বা বড়লোকের যেসব বউরা পার্লারে আসে সবাইকে বোনের বিয়ে দেওয়ার কথা বলল। সে ও নিজেকে সংযত রাখল। জামাইবাবুও আর কাছ ঘেঁষলনা। ব্যাপারটা কয়েকমাস ধরেই শুরু হয়েছিল। সে জামাইবাবুকে বারণ করেনি। আত্মহত্যার চেয়ে সবই ভাল, এমনটা মনে হয়েছিল।
আজ তাকে সাজিয়ে গুজিয়ে নিয়ে এসেছে দিদি। এই বউদি তার এক দূর সম্পর্কের ভাইয়ের সঙ্গে সম্বন্ধ করেছে। দিদি বলেছিল এরকম সুযোগ পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। তাই বিবাহের সুযোগ নেওয়ার জন্য সে আজ শিফনের শাড়ি, শ্যাম্পু করা লকস কাটা চুল খুলে বেশ খুশিমনে ভাবছিল, ভাবতে চাইছিল নতুন জীবনের কথা। অতৃপ্ত শরীর, স্বামী সোহাগের গন্ধ, নিজের সংসার। এরকম বড়লোক সংসার ? সব মিলিয়ে এত শান্তি ? তারও হবে ? তখন রান্না করছিল যে মেয়েটি সে এসে বললো—ম্যাডাম তোমাকে ভেতরে ডাকছেন।
ভিতরে ঢুকতে গিয়ে পর্দা ধরে দাঁড়িয়ে পড়ে সে । ভেবেছিল লুকিয়ে বিয়ের কথা শুনবে । বিয়ের যে কথাতে সানাই লেগে থাকে সেরকম আলোচনা। যা সামনে বসে শুনতে নেই, আড়াল থেকেই সুন্দর। কিন্তু সে শুনল দিদি আর তার ম্যাডামের আলোচনা। ভাই জাহাজে চাকরি করে। বছরে একবার আসবে। ভাইয়ের প্রথম পক্ষের মেয়ে জড়বুদ্ধি। তাকে দেখাশোনা করবার জন্যই এই বিয়ে। দিদি যেন বোনকে একথা ভাল করে বুঝিয়ে দেয় ।
অধোবদনে নিজের পায়ের দিকে তাকিয়ে থাকে সে। চকচকে মেঝে কি চৌচির হয়? মা বসুন্ধরাকে ডাকলে কি তিনি সাড়া দেবেন ? সে নিশ্চিত হয়না। তাই পর্দা সরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে সুসজ্জিত ঘরে , ধীর পায়ে , যাকে বাইরে থেকে লজ্জা বলে মনে হয়। সে নববিবাহ, নতুন জীবনের আলোচনায় প্রবেশ করে দুরুদুরু বুকে । যাকে কেউই বুঝতে পারেনা পাতাল প্রবেশ বলে।