মাচা প্রস্তুত। আলো চমকাচ্ছে নানা রঙের। তার সঙ্গে ঝমঝম বাজনা। মাঝে মাঝে শোনা যাচ্ছে ডি জে.. ডি জে… লছমি ডি জে ..।গ্রীন রুমে চেয়ারে বসে আছে লছমি আম্মী , ডি জে দলের মালকিন। লছমি র ছেলে লছমন প্রসাদ এখন দলটা চালায় , লছমি র বয়স হয়েছে আর নাচতে পারে না তবে সব দেখ ভাল করে। ফর্সা, দোহারা গড়ন, এক ঢাল চুল চুড়ো করে বাঁধা। পিঠে উলকি তে আঁকা তেঁতুল বিছে,দু হাতে মেহেন্দি। পানের পিক ফেলে লছমি বলে — আরে বিন্নি ইতনি দের কিঁউ রে জলদি জলদি কর, সুরতিয়া তু কঁহা ।
বিন্নি আর সুরতিয়ার হাতে সবুজ জরির কাঁচুলি, ঠোঁটে লিপস্টিক ঘষতে ঘষতে বলে — আম্মী তিনঘন্টা নাচতে নাচতে আমাদের পেটে খিল ধরে যায়। আজ স্রিফ আমরা দুজন । বিজলির ধুম জ্বর । হাল বহুৎ খারাপ। আরে কি কিস্সা শুনবে? কাল পাশের মহল্লায় মাচা ছিল, টিপ টিপ বর্ষা পানি নাচছিল বিজলি, পার্টির লড়কারা বাজনার তালে তালে ওর গায়ে জল ছুঁড়তে লাগল। সিন জমে গেল এত্ত রূপেয়া দিল কিন্তু বিজলি র তবিয়ৎ খারাপ হয়ে গেল। ও আম্মী ঔর একটা নাচনী স্টেজে দিতে হবে।
— আচ্ছা আচ্ছা ঠের যা, রাণু বহিন কে ফোন লগাই।
আম্মীর ফোন পেয়ে রাণু চলে এল দশ মিনিটে। হাতে তালি বাজিয়ে ভুরু নাচিয়ে বলে — জান হাজির। বড়ী আম্মী কি করতে হবে বলো।
— যা সুন্দর করে মেয়ে সাজ। একদম প্রিয়ংকা চোপড়া। খুব ভালো নাচতে হবে।
রাণু আবার হাতে তালি দেয়। ভুরু আকঁতে আকঁতে জবাব দেয় — বাংলায় থাকতে ট্রেনে ভিক্ষে করে পেট চলত ,ইউ পি এসে মাচায় নেচে হেভ্ভি ইনকাম হলো ফির ভি এক বাত আম্মি জী, নাচনী দের কোন ইজ্জত নেই। ধুর্ এই শরীর টাকে একদিন আখ মাড়াই এর কলে ফেলে দিব।
লছ্মন বাইক রেখে হুড়মুড় করে গ্রীনরুমে ঢুকলো। শো এর টাইম হয়ে গেছে কিন্তু মুড খুব খারাপ। আম্মীর কানে কানে বলে জরুরি বাত আছে,পিছনের ঘরে চলো। আম্মী কে হাত ধরে নিয়ে গিয়ে ফিস ফিস করে বলে — কলকাত্তা থেকে টিভির বড়া রিপোর্টার এসেছে খবর পেয়েছি। সার্কিট হাউসে উঠেছে। সঙ্গে তার দুটো আদমী আর একটা খুবসুরত লড়কী। শুনলাম টি ভি তে ওরা বাতচিত করবে এসব মাচার নাচা গানা নাকি আচ্ছা না, নাচনীদের কোন ইজ্জত নেই। আম্মী বল্ নাচা গানা ভালো না? আমি বিশসোয়াস্ করি না, আরে এই গ্রামের আদমী গুলো রোজ ইতনা কাম করে শাম হলে দারু পিয়ে নাচ দেখবে ফূর্তি করবে খারাপ কি আছে হাঁ? এখানে যা যা হবে ঐ রিপোর্টার সাব সব ফোটো ভিডিও করে নিয়ে যাবে। কি করবো বল জলদি, খতম করে দিব? খুন চেপে গেছে আমার। খুবসুরত লড়কি টা কে উঠিয়ে লিয়ে আসব?
আম্মীর মুখ রাগে লাল, বলে ওঠে — এক ঝাপ্পড় , ছোট থেকে তোকে এই শিখিয়েছি আমি। শরম নেই তোর । এসব কাম করবি তো দল ছেড়ে চলে যাব। গঙ্গা মাই কি পানি তে ঝাঁপ দেব হামি।
লছ্মন মা কে জড়িয়ে ধরে ,বলে — না না ভুল হয়ে গেছে মাপ কর আমাকে। তু ছাড়া কেউ নেই রে, বাপু কে মনে ই নেই হামার।
— তোর বাবাকে বেহড়ের বাগীরা খুন করেছে। কত্ত বড় পুলিশ অফসর ছিল তোর বাপ। ইমানদার আদমী। আমি অছ্যুৎ হলাম ডাকুদের হাতে। লিখাপড়া নাচ গান জানা আমার মত মেয়ে ধীরে ধীরে হল এ মহল্লার এক নম্বর নাচনী। তোকে মনের মত মানুষ করতে ও পারলাম না। যা তু এখন স্টেজে যা। শো কা টাইম। আমাদের উকিল দীপক বাবু কে ডেকে পাঠাই দেখি কি বুদ্ধি দেয়। পড়ালিখা আদমী দিমাক ভী ঠান্ডা।
দীপক উকিল কে ফোন করে স্টেজে চলে যায় লছ্মন।
দীপক সান্যাল প্রবাসী বাঙালি। অনেক বছর ধরে এ অঞ্চলে আছেন। আম্মীকে চেনেন , যথেষ্ট মান্যতা ও দেন। মনযোগ দিয়ে সব শুনে বলেন — অনুসন্ধান টিভির ডিরেক্টর এখানে এসেছেন ওনার নিজের লোকজন নিয়ে, ওনাকে চেনে না এমন কেউ নেই। উনি সাহসিকতার জন্য এবছর পুরস্কার পেয়েছেন , ওনারা যে এখানে এসেছেন পুলিশ ও জানে এই দ্যাখো আজকের কাগজে ওনার ছবি, আমার হাতে ই আছে।আম্মী ছবি টা দেখল একদৃষ্টে। মুখের রেখায় রেখায় অদ্ভুত কাঠিন্য, হাতের মুঠি শক্ত হয়ে গেল।
লছমনের আজ নাচে মন নেই। স্টেজ থেকে এসে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে। আম্মী জানায় — বেটা, তোর কোন ক্ষতি হতে দিব না। আমি সব দেখে লিব।
******
মিস্টার দীপাঞ্জন চৌধুরী অনুসন্ধান টিভির সর্বময় কর্তা। ছাব্বিশ বছর আগে ডান পা জখম হয়েছিল। সব হারিয়ে শূন্য হাতে কলকাতা য় বাড়ি ফিরে আবার নতুন করে জীবন শুরু করেন। মেয়ে সুমনা বড় হয়ে বাবার কাজেই যোগ দিয়েছে। সামাজিক অবক্ষয়ের নানা দিক তুলে ধরার জন্যে যে কোন ঝুঁকি নিতে তিনি পিছ পা হন না কোনদিন। এমন ই একটা প্রজেক্ট নিয়ে তিনি রঙ্গৌলি গ্রামে এসেছেন। তিনি থানা থেকে আগেই খবর পেয়েছেন জায়গা টি বেশ বিপজ্জনক। সব কাজ করতে হবে খুব সাবধানে। ঠিক করেছেন দেহাতি র বেশভূষা য় যাবেন নিজের টিম নিয়ে। কদিন ধরে তাঁর শরীরটা ভালো যাচ্ছে না তাই এরকম সাংঘাতিক মিশনে সুমনা জোর করে সঙ্গে এসেছে। ট্রেন ধরার জন্য রেডি হতে হতে আত্মতৃপ্তির হাসি হাসলেন তিনি। আজকের মিশন তাহলে পুরোপুরি সাকসেসফুল।
******
রঙ্গৌলি থেকে কলকাতা যাবার ট্রেন একটাই। ভোর ছটায়।টিমের ছেলে দুটি ও সুমনা তাড়াতাড়ি স্টেশনে এসে পড়েছে। দীপাঞ্জন চৌধুরী ডান পা টেনে টেনে ধীরে আসছেন হাতে ফাইল ধরা। বেরুবার আগে লাস্ট মিনিটে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টস লিখছিলেন আর ব্যাগে রাখা হয় নি। সুমনা ঠিক পরে সব গুছিয়ে রাখবে এইসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ সামনে তাকিয়ে দেখলেন বড় একটা অশোক গাছ ফুলে ফুলে লাল। মনে পড়ল সেই পুরোনো কোয়ার্টারে র বাগান, বুকের ভেতরটা ছ্যাঁৎ করে উঠল।
হঠাৎ কে যেন ডাকল — দীপন দীপ দীপ ।
দীপাঞ্জন চমকে উঠে এদিক ওদিক তাকান, এই নামে যে ডাকতো সে তো আর নেই।
গাছের পেছন থেকে বেরিয়ে আসে সাদা শাড়ি পরে আম্মী।
কয়েক মিনিট দুজন দুজনের দিকে নির্ণিমেষ তাকিয়ে
— নিরূপমা নিরূপমা তুমি তুমি বেঁচে আছো? কোথায় ছিলে কোথায়? আর্ত কন্ঠে বলে ওঠেন দীপাঞ্জন।
আম্মী খানিকটা এগিয়ে এসে বলে — আমি নাচনী লছমি। বেহড়ে ছিলাম এতদিন। ডাকুদের সঙ্গে লড়াই এর পর শিব জীর কৃপায় তুমি ও যে বেঁচে আছ আমি ও জানতাম না।
বুকের ভিতর থেকে গভীর দীর্ঘশ্বাসের মত শব্দ বেরিয়ে এল দীপাঞ্জনের — পাপাই বেঁচে আছে? আমাদের পাপাই ?
— হ্যাঁ। কাল যার মাচার নাচ দেখতে গেছিলে ওই লছ্মন প্রসাদ আমাদের পাপাই। এই নাচের দল আমাদের ।
দীপাঞ্জন যেন নিজের শরীরের ভার সামলাতে পারলেন না। সামনে বড় পাথরে পায়ে ধাক্কা লাগতেই উপুড় হয়ে পড়ে গেলেন। চশমা, হাতের ফাইল, দামি ক্যামেরা সব ছিটকে পড়ল। পাথুরে ঢালে ক্যামেরা গড়াতে গড়াতে টুকরো হতে থাকল। দমকা হাওয়ায় উড়ে যেতে থাকলো রিপোর্টিং এর কাগজ। চেতন অবচেতনের মাঝামাঝি অবস্থায় তাঁর মনে হল সুমনা দৌড়ে এসে তাঁকে দুহাতে তুলে নিজের টিমের ছেলে দুটিকে বলছে প্লীজ হেল্প হেল্প… সাদা শাড়ি র শেষ প্রান্ত টুকু দ্রুত অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে .. অন্ধকারে তলিয়ে যেতে যেতে মেয়েকে আঁকড়ে ধরে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেন দীপাঞ্জন….ট্রেনের হুইসেল শোনা যাচ্ছে দূর থেকে…