শব্দটা এখনো বাজে মিঃ রায়-এর কানে। সেই কবে সত্যবাবু ক্লাসে পড়াতে পড়াতে বলেছিলেন – ‘ যদি জীবনকে নিজের ক্ষমতায় হারিয়ে দিতে চাও,যদি নিজের ইচ্ছেকে প্রধান্য দিতে চাও,তবে জেনে রেখো,তোমাদের এক প্রবল শত্রুর সামনা করতে হবে। তার নাম নৈরাশ্য।’ কথাটা সেদিন ক্লাসের কেউই বোঝে নি, নাইনের ছেলেদের সেটা বোঝারও কথা নয়! কিন্তু কি জানি কেন রায়ের মনে রয়ে গেল কথাটা। আর টের পেল হাড়েহাড়ে সেটা কি মারাত্মক সত্যি- সারাটা জীবন ধরে।
হঠাৎ করে বাবা মারা যাওয়ার পর রায়ের সে এক বিদিকিচ্ছিরি অবস্থা। তিন কুলে কেউ নেই,মাকে খেয়েই জন্মেছেন,কাজেই মামারা মুখ আগেই ফিরিয়েছেন। স্বাভাবিক ভাবে যেটা হয় সেটাই হল,ম্যাট্রিক আটকালো নন্ ম্যাট্রিকে,আর ভাগ্য অন্বেষনে রায় দিগ্বিদিকে। কোলিয়ারী, জাহাজঘাটা, কোলে মার্কেট, চিনা মার্কেট,শেষে জুটলো একটা কাজ সেই পাটনায়,এক বুড়ো সর্দারজী টেনে নিয়ে গেল,তা সেই থেকে কতো না দেখলেন!তবে প্রতিনিয়ত নৈরাশ্য আর সত্যবাবুর সেই অমোঘ বাণীর স্মৃতি সৃষ্ট জেদ তাকে আজ এই জায়গায় দাঁড় করিয়েছে,আজ তিনি সফল বিজনেসম্যান।
‘ —-স্যার! এবার অটো স্ট্যান্ডের নিলামটা হয়তো আমরা পাব না। বিরজুটা কিছুতেই রাজি হচ্ছে না। দীনেশের চাপ খেয়েছে মনে হয়।’- কথাটা তীর্থের মুখ থেকে শুনে ভালো লাগল না অতীন রায়ের। নিলামটা বরাবরই একটা প্রেস্টিজ ইস্যু। তাছাড়া বিশেষ একটা কারনেই স্ট্যান্ডটা হাতে থাকা দরকার,এ জন্য যদি দু চারটে পার্টি ও থ্রো করতে হয়,পিছু পা হবে না সে। ‘— তুমি কি করে বুঝলে দীনেশ বিরজুকে চাপ দিচ্ছে?’ প্রশ্নটা ইচ্ছাকৃতই করলেন,জানতে হবে ছেলেটা কতোটা জানে! ‘– স্ট্যান্ডের সেই দোকানটা নিয়ে যে ঝামেলাটা হল না,তাতে দীনেশ বিরজুকে হেল্প করে পুলিশ থেকে বাঁচিয়েছিল,আপনি দিল্লীতে ছিলেন,মোবাইল সুইচ অফ ছিল,সেইটাই এখন দীনেশ ক্যাশ করছে,বিরজু কাল রাতেই আমায় বলেছে ও এসবের মধ্যে থাকবে না। আসলে দীনেশের নাম দিয়ে এবার অন্য কেউ ঠেকাটা নিতে চাইছে,আপনি তাকে চেনেন’– কথাটা বলে শান্ত দৃষ্টিতে তীর্থ তাকিয়ে রইল বসের দিকে,ইশারায় তাকে যেতে বললেন মিঃ রায়। রিভলভিং চেয়ারটা ছেড়ে কাঁচের জানলার সামনে এসে দাঁড়ান। ঢিল ছোঁড়া দুরত্বে,ওনার অফিসের উল্টো পাশেই অটো স্ট্যান্ডটা,তার পেছনেই রেল লাইনের ওপর সার সার পরিত্যক্ত বগি। ‘— নাঃ এই ঠেকাটা আমার চাই ই চাই–‘ স্বগতোক্তি ঝরে পরে অতীনের।
রাতের অন্ধকারে দুটো ফুল ডালা ট্রাক এসে দাঁড়ায় অটো স্ট্যান্ডের ভেতর। চট্ করে জনা আষ্টেক মূর্তি নেমে যায় ট্রাক থেকে। ট্রাক দুটোর কেবিন থেকে নামে দুজন। নিঃশব্দে আটজন চলে যায় রেলের পরিত্যক্ত বগিগুলোর দিকে এবং ফিরে আসে চারদল বস্তার দুপাশ ধরে। ঘন্টা দুয়েক চলতে থাকে বস্তা দুই ট্রাকে তোলার কাজ। তারপর কেবিনের দুজনকে রেখে ট্রাক দুটি বেড়িয়ে যায় অটো স্ট্যান্ড থেকে।
রাস্তায় এসে দাঁড়াতেই সেল ফোনটা বেজে ওঠে অতীনের। ‘– হ্যাঁ, এই বেড়োল,হ্যাঁ, সব আছে,নব্বই পিস’– কথাটা বলেই ফোন কাটে সে,তীর্থের দিকে চেয়ে বলে- ‘– তোমার এই ঠেকার থেকে এগুলো অনেক বেশী দামি,সেটা বোঝ তো! এই কারনেই নিলামীটা আমার দরকার ছিল,এটা না পেলে,মালগুলো ওখান থেকে বেরই করা যেত না!’- সম্মতিতে মাখা দোলায় পার্থ। ‘ — চলো, অফিসে গিয়ে বসা যাক,একটু পড়েই গাড়ি এসে যাবে,ততক্ষনে গলাটা ভেজানো যাক’।
গাড়িতে উঠেই অবাক হয়ে যায় তীর্থ। ড্রাইভারের সীটে দিনেশ বসে আছে। ব্যাপারটা বোধগম্য হয় না তার। তাদের পরম শত্রু সুরজমলের ডান হাত দিনেশ,সে এখানে? এখন? এভাবে? হাঃ হাঃ করে হেসে ওঠেন মিঃ রায় আর দিনেশ। তীর্থের মাথার চুল গুলো হাত দিয়ে ঘেঁটে দিয়ে বলে ওঠেন মিঃ রায় — ‘ ও তুমি বুঝবে না,কাজেই ভাবতে ও যেও না,আম খাও- গাছ গুনছ কেন?’ পাশের অ্যাটাচি থেকে লাল টাকার দুটো বান্ডিল তুলে ধরেন তীর্থের দিকে — ‘ এটা রাখো,বাড়িতে পাঠিয়ে দিও,আজকের কাজের পুরস্কার…..’
খবরটা পেপারে বেশ ফলাও করে বেড়িয়েছিল। বিজনেস টাইফুন শ্রী অতীন রায় মাদক চোরাচালানে পুলিশের হেফাজতে। স্বীকারোক্তিতে এক অদ্ভুত কথা বলেছেন তিনি- তার এই অনৈতিক কর্মের জন্য নাকি তার এক স্কুল শিক্ষক দায়ী!! পুলিশ তার যুক্তি মেনে নিতে পারছে না। মনোচিকিৎসক দিয়ে কাউন্সিলিং করে রহস্যোদঘাটনের চেষ্টা চলছে। খবরের কাগজটা ভাঁজ করে টেবিলের একপাশে রেখে কফির কাপটা তুলে নেয় তীর্থ। একদম ছকে বেঁধে কাজটা করেছে সে। ধরা ছোঁয়ার বাইরে। জানত, বহুবার বলা গল্পটা রায়কে পাগল করে দেয়, প্রকৃতস্থ থাকতে পারেন না। সেটাকেই মুলধন বানায় সে। বাকিটা জলের মতো,গল্পের মাঝে সত্যবাবুর নৈরাশ্য শব্দটা বার তিনেক উচ্চারন করে পাগলের মতো হাসতে থাকেন মিঃ রায়,ততক্ষনে দীনেশ গাড়ি স্লো করে ফেলেছে,একটা লোহার রড মাথায় পড়ার আগেই রায় বুঝতে পারেন গাড়িটা ধাক্কা মারল একটা গাছে। পেটে পড়া অর্ধেক বোতল ব্ল্যাকডগ বুঝতেও দেয় নি যে তিনি রডের আঘাতেই জ্ঞান হারালেন। রায়ের ফোনের থেকেই একটা ম্যাসেজ পেয়ে পুলিশ উদ্ধার করে গাঁজা ভর্তি ট্রাক দুটো,দীনেশকে অ্যাটাচি থেকে টাকার অর্ধেকটা দিয়ে শেষটা নিয়ে চলে আসা পুরুলিয়ার বাড়িতে। এবার গুছিয়ে জীবন কাটানো। আর কতো নৈরাশ্যে বেঁচে থাকা যায়! ভাগ্যিস দীনেশের সাথে ওর যোগাযোগের খবরটা মিঃ অতীন রায়ের কানে যায় নি!!
এটুকু রিস্ক তো ওকে নৈরাশ্যের হাত থেকে বাঁচতে নিতেই হত।