তীক্ষ্ণ শিসে চটকে গেল ঘুম | এ কর্তার সঙ্গে যুক্ত আমি বহুকাল | হয়তো শুনেছে আমি এসেছি, এখন সময় হয়েছে নবাবের |
পাথর পেটানো বুকে উন্মত্ত ঝর্ণা আছড়ে দেয় বুন্দের থোকা | অবিরাম ভাঙে দেহ, কিলকারি’তে ভরে সমারোহের সবুজ | একফসলি বারিস তরতরে করে মহীরুহ বাচ্চাকাল | এভাবেই ক্ষীণতোয়া আমি খালেকের সামাজিক পরিচর্যায় আজ আমি হয়ে উঠেছি আজ | রত্নাখালের শুকনো দ’ | আরেক পদক্ষেপেই সাবরে যেতাম এক ছোবলে | এক টানে পেছনে সরিয়ে মুহূর্তে সামনে সে | বসে পড়ল হাঁটু গেঁড়ে | নিস্পন্দ, অপলক চোখে চোখ | অহিরাজ প্রসারিত ফণায় মৃদুমন্দ হিল্লোলে | দূর থেকে মাইকে ভাসছে ‘পরদেশি জানা নেহি’, এখানে যুযুধান দু প্রতিপক্ষ | কেউ যেতে দিতে চায় না অপরকে | একটা হাঁটু উঠে এল সাপের সামনে | লহমায় বাইট, ফস্কালো | পর পর কয়েকটা | বিদ্যুৎ গতিকে হার মানিয়ে কখনও ডাইনে কখনও বাঁয়ে সরলো লক্ষ্যবস্তু | বুঝতে পারছি না, খালেক কী চায় | ইশারায় চুপ করে থাকতে বলেছে | আবার একটু নাড়ালো হাঁটু | বাইট ফস্কাতেই হাতের মুঠোয় নিয়ে নিলো গর্দন পলের ভগ্নাংশে। লেপ্টে গেলেন বিষধর বাজুতে | নিষ্পেষনের ব্যথা খালেক ভোগ করেছে বহুদিন | অমাবস্যা-পূর্ণিমার জো এলেই গরম সেঁক দিতে হতো |
শিস আবার | রতন’দা অঘোরে ঘুমাচ্ছে | মশারি গলে বেরিয়ে এলাম | রাস্তায় পা রাখতেই- ‘এদিকে আয়’, টগর গাছটার আড়ালে দাঁড়িয়ে খালেক | আঁধার কি তোমার ভালো লাগে ? কাছে যেতেই বলল, ‘চল আমার সাথে, কথা আছে।’
‘ এখন ?’
‘কেন ? অসুবিধা কীসে ? আগেও তো আমরা রাতেই আড্ডা মেরেছি |’
‘ সেটা বলছি না | চল |’
খালেককে বোঝানো যাবে না, বোঝানোর নেইও কিছু | পার্টিতে প্রথম প্রবেশ ওর হাত ধরে | একটু একটু করে উচ্চতা বেড়েছে আমার, ঘাড়ে হাত রেখে সাহসী করেছে | পাশে তাকিয়ে দেখতাম, সাথে হাঁটছে | একটা সময় একটু পেছনে রয়ে গেল, সেদিনও বুঝিনি, আমি জোরে হাঁটছি নাকি ওর স্পিড কম | ঘাড় ঘুরিয়ে দেখতাম, আসছে, পেছনে | তারপর কলেজ রাজনীতি, ও স্কুলের গণ্ডি টপকেই লেগে গেল গুড়ের ব্যবসায় | মাঝেমধ্যে আসতো ক্যান্টিনে, কখনও এল.সি.’র অফিসে | একটা সময় ও বলত, আমি শুনতাম, এখন অফিসে বসে আমি বিজ্ঞতা ঝাড়ি, ও শোনে | মুচকি মুচকি হাসে, কোনো তর্কেও ওর পার্টিসিপেশন থাকে না | তবুও, খালেক খালেক, আমার খালেক, রতনধন | মাঠপাড়ার যে কোনো লাফরায় চুপচাপ ক্ষুর চালিয়ে সটকে পড়তে হয়তো বা আগের মতো এখনও ওর জুড়ি নেই |
‘শোন, যে কারণে তোকে বিরক্ত করলাম…’
‘ না না, বিরক্ত হইনি এক ফোঁটাও | বরং ভালো লাগছে | ভেবেছিলাম এবার হয়তো তোর সাথে দেখাই হবে না |’
‘ নিত্য সমাদ্দার ডেকেছে তোকে, কাল সন্ধেয়-ই পার্টি অফিসে হুইপ পেয়েছিল ছেলেরা | শুধু আমায় এড়িয়ে যেতে পারে না বলেই, ব্যাপারটা আমার হাতে ছেড়ে দিয়েছে | মুসলমান পাড়ার ভোটগুলো নিতে হলে আমায় একটু মাখন তো লাগাতেই হবে পার্টির |’
‘ কেসটা কী ? কেন ডেকেছে ? কী হুইপ দিয়েছে ?’
‘ তুই বুঝিস না, কেন হুইপ দিয়েছে ?কী বলে থাকতে পারে ?তোর সামনেই অমিয়-এর জন্য হুইপ জারি হলো, অ্যাতো তাড়াতাড়ি ভুলে গেলি দিনটা ?’
‘ অমিয় তো আর আমার মতো রেগুলার ক্যাডার নয় ! পার্টি আমাকে আর ওকে এক করলো ?’
‘ হ্যাঁ, করলো, কেন করলো জানিস ? কারণ তুই ছেড়ে চলে যাচ্ছিস | দেবেশ সব ঢেলেছে | পাওয়ারে বসা পিঁপড়ের বিষ কি তোকে নতুন করে চেনাতে হবে ? তোর ছিল না ? মাঠপাড়ার বিষ্ণু কোথায় ? ফিরিয়ে আনতে পারবি আর ওকে ? আজ তুই সরছিস, তোকেও তো সে বিষের ভাগ নিয়ে যেতে হবে রে !’
‘ হুঁ, বুঝলাম | তা, কী ফরমান ? ডিমাণ্ডটা কী ?’
‘ হয় এখান থেকে চাকরিটা কর আর না হলে এটা সবাইকে বল যে কাজটা তোকে পার্টি করে দিয়েছে | তুই যে সপরিবার বেরোচ্ছিস এটা জানিয়ে পাঠানো হয়েছে আমায় |’
‘ এ-এটা জানিস তুই ?’
হাসলো খালেক | পকেট থেকে বিশ্বনাথের বিড়ি বের করে ধরালো | ধোঁয়ো ছেড়ে বললো, ‘চল, শিশুতীর্থের বারান্দায় বসি | কতোদিন আড্ডা মারা হয়নি | শুনলাম, নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ আবৃত্তি করেছিস তুই ?’
কেঁপে গেল ভেতরটা। কী নির্লজ্জ মেয়ে মাইরি ! গেয়ে বেরিয়েছে ? চুপচাপ হেঁটে এসে বসলাম দুজনে স্কুলের সিঁড়িতে | ফাঁটা আকাশে তেরছা চাঁদের ছেতরে গেছে রূপ | মায়া মাখা মরা আলো | ধাপ্পা খেলছে মেঘের সাথে | কতদিন কিছু বলা হয় না ওকে ! দূরত্বটা যে অসম্ভব হয়ে গেছে সেটা টের পেলাম এখন | একটা বিড়ি খেতে ইচ্ছে করছে |
স্টেশন ছাড়ার আগের মুহূর্ত পর্যন্ত – সবটাই বললাম | আমার ইজ্জত গ্যাছে শুনে ও অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল মুখের দিকে | আবার, সে কথা নির্ঝর-ই সকলকে বলে বেরাচ্ছে এটা ভাবতে যে ওর অসুবিধা হচ্ছে, সেটাও আর আশ্চর্যচকিত নজর বলে দিল আমায় |
‘ আমার মনে হয়, তোর পিকচারটা নষ্ট করার জন্য ওকে দিয়ে দেবেশ এটা বলাচ্ছে | তুই তো স্পট ছেড়ে ফুটে গেছিস, প্রতিবাদ করারও কেউ নেই, আমি তোর সবচেয়ে কাছের,আমায়ও বলিসনি তুই | এ কথার প্রতিবাদ যেহেতু পার্টি আমার কাছ থেকে পায়নি, তাই, এটায় যে তুই দোষী এটা মেনে নিচ্ছে সকলেই | খেলাটা বেড়ে খেলেছে |’
‘ এবার ?’
‘ সন্ধের পর পরই তোদের বাড়ির পেছনে বসিয়ে রেখেছিল হরিদাসী-কে |’
‘ রাধে’র মা’কে ?’
‘ হ্যাঁ, যাতে তোর চোখ পড়লেও তুই সন্দেহ না করিস | ও সব শুনেছে | গিয়ে বলেছে পাতু’কে | আজকাল পাতু দেবেশের ডান হাত | তারপরই হুইপ জারি হয়েছে | আমার পাড়ার তিনটে জি.আর.-এর কেস আছে, আমি তাই অফিসে বসেছিলাম | পাতু আমায় লক্ষ্য না করেই সবটা বলতে শুরু করে দিল | বাধ্য হয়েই ওরা আমায় ইনভল্ভ করলো, নইলে এতক্ষণে তুই পোস্টমর্টেমের যোগ্য হয়ে যেতিস | আল্লাতালাহ্ আরও কিছু দিন রাখতে চায় তোকে এখানে |’
‘ আরে এখন কী করবো সেটা বল !’
‘ অধৈর্য হোস না | প্ল্যান করে কাজ করতে হবে | তোকে এখান থেকে সরতে দিলে আমি কোপ খাব | যদিও, সেটা হবেও না | তোর ক্ষেত্রে যতই আমায় দায়িত্ব দেওয়া হয়ে থাকুক না কেন, সেটা বিশ্বাস করে দেওয়া হয়নি | এখানে আমার পেছনেও ব্যাকআপ টিম আছে পার্টির | তোর কালকের প্রোগ্রাম ক্যান্সেল | পার্টি যেটা চাইছে সেটা করে দিয়ে কেটে পড় | এখানের বাড়িটাও তো রাখতে হবে ! না হয় বলেই দিলি, কাজটা পার্টিই জোগাড় করে দিয়েছে, কী যায় আসে ?’
‘ এতে তো ভবিষ্যতে আরও চাপ বাড়বে !’
‘ তুই বেঁচে না থাকলে তার থেকে অনেক বেশি চাপ কাকু-কাকিমার বাড়বে | কাজেই নিজের লেজটা সাবধানে টেনে বের করে নে হাতির পায়ের নীচ থেকে | আমিও এতে সুরক্ষিত থাকবো | তোর চাকরির খাওয়াটাও তো খাওয়াবি, না কি ?’