সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে হেমন্ত সরখেল (পর্ব – ৯)
by
TechTouchTalk Admin
·
Published
· Updated
তাপ-উত্তাপ
পর্ব – ৯
‘তগো মতলব বোঝনের সাইধ্য তিন মাথারও নাই |’
‘এইডা কী কইলা? তিন মাথা? খোলসা কইরা কও |’
‘বুড়া বুড়ি পাকাইয়া পাডের নাহান হইয়া রয়, দ্যাখছস্? তহন মুণ্ডুখান লাইম্যা আহে দুই হাঁটুর মইধ্যে | ঐডারে দূর থিকা দেহিস, লাগবো য্যান তিনখান খোপড়ি পইরা রইছে | হ্যায়রে যমেও লয় না, লেকেন বুদ্ধি য্যান পাইক্কা তাল! যহন পেরেশান হইবি, যাওন লাগবো বাট বিছরাইতে তিন মাথার লগে | তুড়ি মাইরা বাৎলাইয়া দিবোয়ানে কী করণ লাগবো | ঢুকছে খোপড়িতে?’
‘হ | তা আমারে কইলা ক্যান?’
‘হুদা কি তরেই কইছি? নবাবরেও কইলাম | কাইল ঢ্যারা দিছিলো না, সেকেন টেরেন ধরবো, আইজ মস্তকে সুজ্জি তুইল্যাও তগো টেরেন খোলে নাই, তগো দিমাগে কী নিত্ত করতাছে, হেই পেলানডাই বুঝি নাই, তাই কই আর কী!’
মুচকি মারলেন নবাব | কয়েক প্রস্থ চা হয়ে গেছে | আরেকবার হবে হবে করছে, এটা বুঝেই রাণিসাহিবা বাণী ছেড়েছেন | কথা শেষে নজর আড় হয়ে মিলিত হতেই বুঝে ফেলেছেন নির্বাক ইচ্ছে | কর্তার মনোভাব তিনি বুঝবেন না তো আর কে আছে এ ব্রহ্মাণ্ডে যে ও চোখ পড়বে!
‘না, অহন আর চা লাগবো না, লয়েন, বাজারমুহা হয়েন | মুই বস্তা বাইন্ধাই রাখছি | যহন আপনাগো পসন্দ হয়, কইয়েন, হাইট্যা লমু |’
পিতৃদেবের হাতে গতকালই দশ হাজার দিয়ে রেখেছি | আর্থিক নিরাপত্তা থাকলে বদলে যায় পুরুষের চাল-ঢাল | ভঙ্গিমা দীপ্ত হয় | বাবারও অন্যথা দেখছি না | রতন’দাকে সাথে নিয়ে বেরোলেন | রতন শিল্পী একখানা | সব ব্রেনের কোডাক-এ ক্যাচ করে চলেছে | একবার খালেকের ওখানে যাওয়া দরকার | ওকে লাগবে এখন অগ্রোত্তরে |
পথিমধ্যে পাতু | দেখেই কান পর্যন্ত হাসলো | আমার কানের গোড়া গরম হলো ওকে দেখে, একবার মাত্র সুযোগ পাওয়ার অপেক্ষা, জাস্ট ছাতু করে দেব ন্যাড়াচিতেটাকে |
‘রাগ করছো আমার উপর?’
‘ক্যান, তোর উপর রাগ করুম ক্যান, তুই কোন আমার বাড়া ভাতে ছাই দিছস?’
‘না, মুই বুজছি, তোমার খবরখান দেবেইস্যা’রে দিছি, তুমি চটছো | তুমিই কও, মোর করণের আছিল ডা কী, বাত হুইন্যা চলনের পাঠ তো তুমিই দিছো, হ্যার লগে আছি, না চইল্যা, যাই কই?’
‘না, চটি নাই | প্রভুভক্ত হইছস দেইখ্যা ভালোই লাগছে |’
‘কই যাও?’
‘ক্যান, তা দিয়া তোর কী, দেবেশ’রে কইতে হইবো? গতিবিধি নোট করণের কাম লইছস নি?’
‘আর শরম লাগাইয়ো না, তুমি ছিলা না, ত হ্যের লগে ছিলাম। অহন আইয়া পড়ছো, লগেই থাকুম | পূর্বের নাহান জান কবুল |’
‘নাটক মারাইস না, তরে চিন্যা ফেলছি |’
‘ঐ জুতা এই শর, মাইরা লও, অ্যামন কইয়ো না, তুমি চইল্যা না গ্যালে এহান হইতো না |’
বলতে বলতে হুমড়ি খেয়ে পায়ের ওপর এসে পড়লো শয়তানটা | তিলেখচ্চর! অগত্যা চললো সাথে |
বাঁওড় থেকে একটা দক্ষিণাভিমুখী নালা বর্ষার উফানকে টেনে আনতে বর্তমান মুসলমান পাড়ার মুখে | কথা ছিল সাইফন বানানো হবে | কিন্তু খালেকের কাকার স্বার্থ রক্ষায় সেটা নালা এবং তদোপরি কালভার্টে থমকে আছে | সাইফন বানাতে হলে ওনার দখলীকৃত লাগোয়া জমির খানিকটা ব্যবহারে আনতে হবে, বিশেষ সুবিধা প্রাপ্তির পর, সেটা অধিকারের রূপ ধারণ করতে নিতান্ত তাচ্ছিল্যসময় লাগে | চাচাজান সে অধিকার থেকে নিজেকে বঞ্চিত ভাবতে পারছিলেন না কিছুতেই | অগত্যা, জলে জল আটকেছে | আটকেছে মুসলিম ভোটে সাইফন | রইসের রসুখ না থাকলে শোভা নিমজ্জমান পরিলক্ষিত হয় | এতদঞ্চলে ওল-এর ওজনদার কৃষক হিসেবেও সুনাম আছে গোলাম আলি’র |
‘আস্সালাম ওয়ালেকুম, চাচা |’
‘ওয়ালেকুম আস্সালাম…’
জবাব দিতে দিতে আলের ওপর দাঁড়িয়ে কাজের তদারকিতে ব্যস্ত ‘মালিক’ পেছনে ঘুরলেন |
‘আরে বেটা, কেমন আছো? কোথায় গেছিলে, দেখা যায়নি যে বেশ ক’দিন ?’
‘ভালো আছি, চাচা। কোলকাতায় ছিলাম | চাকরি পেয়েছি, সবটা সেট করতে দেরি হলো, তাই আসতে পারিনি |’
‘সে তো তোমার মুখের জেল্লা ই বলে দিচ্ছে, দিমাগে শান্তি আছে | ভালো, খুব ভালো, কাজ তো একটা দরকার, বাবারও আর খাটবার বয়স তো নেই!’
‘আজ্ঞে |’
‘তা, এদিক পানে? খোকার কাছে ?’
‘হ্যাঁ, বাড়ি আছে ?’
‘আমি তো দেখে এসেছিলাম বাড়িতে, গিয়ে দ্যাখো, জনাবের তো বিন-দৌলত খয়রাতি’র কাজ থাকে প্রচুর!’
রাস্তার পাশ থেকেই শুরু হয়েছে জমি | আলে’র ওপরে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন | অন্তিম বাক্যিটায় গাল বেঁকলো, আমি স্মিত হেসে এগিয়ে এলাম | বিচিত্র মানব প্রকৃতি | জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ সবটা খালেক দেখে | ওর খুড়তুতো দুটো ভাই, দুটোই লুচ্চা | খালেক শুধু বাড়ির কাজ নয়, বাইরের যাবতীয় ঝেল-ঝাপট সামলায় | যতই দম-খম থাক গোলাম আলি’র, সাইফন আটকানো ওনার কম্মো ছিল না | একমাত্র খালেকের মুখ চেয়ে পার্টি ব্যাপারটায় নীরব ছিল | খানিক লড়ে, সরকারী তন্ত্র স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতার অভাবে শান্ত হয়ে যায় | এর এফেক্ট পড়েছে সতেরো কিলোমিটার জুড়ে নালাটার পাড়ে বসবাসকারী কৃষিজীবী জনতার ওপর, বিগত ভোটে কাটাকাটি হয়েছে বেশ কিছু পকেট ভোট | খালেকের একনিষ্ঠতা, অমানুষিক পরিশ্রম আর জনসংযোগের দক্ষতা, যা ক্যাডারবাহিনীর অখণ্ড বদনামের বিপ্রতীপে সুনামের ঢেউ-এ বিরোধী ভোটও ক্যারি করে আনে, তাকে অবহেলায় অস্বীকার করেন গোলাম আলি | খালেকের নিজের কাকা | নিদর্শন ভুঁড়ি ভুঁড়ি | নৌসাদ আলি’র পেটেই ফেটে গেল অ্যাপেনডিক্স | রাত তখন দেড়টা-দু’টো হবে | সদলবলে দৌড়লাম গাঁদিয়ারা রেফারেল হাসপাতালে | সহোদরের সাথে গোলাম চাচাও আছেন | তফাদার ডাক্তারকে ঘুম থেকে জাগানো হলো | সদ্য জাগ্রত চিকিৎসক মুখ কুলকুচি করে এলেন বাংলার দু পেগ-এ | যা ও ঢুলছিলেন, এবার এক্কেবারে চাঙ্গা, টনাটন ফিট | ওপর থেকে পেটে দুটো টোকা মেরেই প্রশ্ন, ‘ ব্লাড গ্রুপ?’
‘কার, আমার? ও নেগেটিভ |’
‘গাধা! আপনার জেনে কী করবো? পেশেন্টের | জানেন?’
‘না তো!’
‘আপনি পেশেন্টের কে হ’ন?’
‘ছোট ভাই |’
‘ঘন্টা! ভাইয়ের ব্লাডগ্রুপ জানেন না, ভাই হ’ন?’
রাতের নার্স নাক শিকেয় তুলে ঘুমাচ্ছে | নিজেই ব্লাডগ্রুপ টেস্ট করে বললেন, ‘ কেউ একজন পেশেন্টকে তুলে আমার সাথে ও.টি.-তে এসো। এক আদমি | জাস্তি নেহি মাংতা | আর আপনি, ঘোষিত ভাই, এনারও ও নেগেটিভ, কাজেই, আপনি রেডি থাকুন, ব্লাড লাগবে, সময় নেই, ডাইরেক্ট বডি টু বডি দিতে হতে পারে | বাহ্যি-প্রস্রাব সেরে অন ইওর মার্ক হোন |’
ক্রমশ…