সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে হেমন্ত সরখেল (পর্ব – ৫)
by
TechTouchTalk Admin
·
Published
· Updated
তাপ-উত্তাপ
পর্ব – ৫
পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে এলাম | উত্তর দেব না | বলবো না, কার জন্য চুরি করলাম, কে আজ আমায় চোর বলছে | জানি, বলে লাভ হবে না, আমি একটা সিঁড়ি বই কিছু নই | এখন কাছি দেবেশ নামক কদম্বকাণ্ডে বাঁধা | নৌকো স্থিরতা পাবে সেখানেই | শ্বাসেরা শিখে যায় পরিস্থিতির চাপে, কোথায় তাদের দীর্ঘ হওয়া মানা |
দাওয়ায় চাঁটাই পেতে, মা জননী শোয়া | চুপচাপ বসলাম, রতন’দা উঠে এল উঠোন ছেড়ে, দাঁড়িয়ে রইল | গায়ে হাত রাখতেই উঠে বসলো এক লপ্তে |-‘খোকা! কই গেছিলি? একবার বলিস নাই! কই গেছিলি আমাগো রাইখ্যা? বাপডা তো গেছিলো গিয়া আরেট্টু হইলেই !’
‘কাইন্দো না, আইয়া পড়ছি তো! সব ঠিক হইয়া যাইবো এইবার, দ্যাখো কারে আনছি !’
‘ কেডা! রতন না? হয়, রতনই তো! আহো বাবা,বও |’
উঠে বসে জায়গা করে দিলো মা চাঁটাইয়ে |
‘ঘরে আসেন, বাইরে কথা বলা ঠিক না |’
‘হ, যাও বাবা, ঘরে বও | মুই আইতাছি |’
‘বাবা কই ?’
‘কাজে | আইয়া পড়বো, শরীলডা হুগাইছে ম্যাস্তার লাহান |’
সবটা শোনার পর মাতৃদেবী পোঁ ধরলেন, ‘ হগলডি ত বোঝলাম, লেকেন উনারে কইবো কেডা ? তা-জিন্দেগী রাজি হইবো না, তুই চিনস্ না তর বাপেরে ?’
‘সাত কাণ্ড রামায়ন পইড়্যা সীতা কার পিতা ! তাইলে তোমারে কইলাম ক্যান ? তুমি বুঝাইবা |’
‘হ, বুইঝ্যা উল্টাইবো ! ঘাউরা কি আইজকের ! তর মামায় কইল বেলেঘাটায় জমিন দিব, গ্যাছে নি ? হয়ুর বাড়ির সাহায্য লইবো, সম্মান যাইবো না ? হেই জনম তর দাদু-ঠাকমায় দ্যায় নাই | ক্ষ্যামা দে বাপ, মোর দ্বারা হইতো না |’
‘তাইলে দেহি, কী করন্ যায়, তুমি যাইতে রাজি তো নাকি তহন ঘুইরা বইবা ?’
‘উনারে রাজি করাইতে পাল্লে, মোরেও পাইবি, তা না হইলে…’
‘ হ, হ, বুজঝি, য্যামন দ্যাবা তেমনডা ই দেবী মোর কপালে !’
আসা ইস্তক রা কাড়েননি মুখ থেকে | প্রণাম করার পরও আশীর্বাণী নদারদ | শুধু রতন’দাকে হেসে জিজ্ঞেস করলেন,’ভালো আছো ?’
অভিমানী মেঘ গলতে সময় নেয় | পুরুষের তো আরও বেশি | তার ওপর, যদি তা পুত্রের ওপর জন্মে সে তো তুষের আগুন, ভেতরে ভেতরে ধিকি ধিকি জ্বলে | বিকেলে বাজার থেকে ইলিশ এনেছিলাম | খেতে বসে বললেন, ‘ইলিশ !’
‘হ, খোকায় আনছে |’
খাওয়ার পর বাড়ির সামনের আদ্যিকালের ইটের রাস্তায় মিনিট বিশেকের পায়চারির অভ্যেসটা জ্ঞান হওয়া থেকে চিনি | পেছন পেছন বের হলাম | চাঁদের আলোয় পরিস্কার পথ | বাতাসে মায়া মায়া গন্ধ | বাপ-ব্যাটা দুই ভাই, মা মজা করে বলে | এখন গল্প জুড়েছে রতন’দার সঙ্গে | কোথায় আছি,কী খাই, বিয়ের কথায় মত আছে কি না, চলছে ইন্টারভিউ | আমার সামনে সামনে চলেছেন রায় বাহাদুর | আমার চোখে দেখা পরম পুরুষ | ভাঙলেও, মচকা খেতে দেখিনি | উফ্ করেননি কোনোদিন | স্থৈর্যের প্রতিমূর্তি | অপেক্ষায় আছি, কখন মুনি বাবা মৌনতা ভাঙেন |
‘কবে ফিরবে ?’
‘পরশু |’
‘অফিসটা কোথায় ?’
‘নাগের বাজার |’
‘ওখানে অফিস ? কাজটা কোন প্রকৃতির ?’
দাঁড়ালাম | আমায় দাঁড়াতে দেখে নিজেও দাঁড়ালেন | পাপ করবো না, বলবো না মিথ্যে, নইলে, যেটা সবাই কুঁদঘাটে জানে, সেটা বলা ই যায়, ‘বাড়ি আসো,বলছি |’
লাভা গলে বেরোতে দেখেছিলাম একটা ইংরেজি সিনেমায় | বন-জঙ্গল-বাড়ি-ঘর মুহূর্তে লীন হচ্ছিল বহ্নিশিখায় | গবাদি ক্ষণে খাক্ ! শিউরে উঠেছিলাম দেখে, হাতের পশম দাঁড়িয়ে ছিল দৃশ্যটা শেষ হওয়ার পরেও | জ্বালা দেখেছিলাম, স্পর্শ করিনি, এখন তার উত্তাপ টের পাচ্ছি | গলে ভিজিয়ে দিচ্ছে আমার কাঁধ, পিঠ | জীবনে প্রথম, পাথরের জল দেখছি | আমার কাঁধে তার মুখ, জাপটে রেখেছেন বুকে, চোখ আজ আর শুনছে না শাসন, অপত্যের দেহ শূচি হলো আজ | আমায় ছেড়ে চোখ মুছলেন ধুতির খুঁটে | রতন’দাকে বললেন,
‘ওখানে আমাদের থাকার মতো ঘর ভাড়ায় পাওয়া যাবে না ?’
‘আমি দেখে রেখেছি |’
‘কাইল ই যামু | থার্ড টেরেন-এ | কী নিবা, গুছাও |’ মাকে বললেন। চলে গেলেন কলে | হাত মুখ ধোবেন, গুরুপ্রণাম হবে, তারপর বিছানায় যাবেন | ‘কোন্ জন্ম য্যান কারা কারে দ্যায় নাই ?’- মা’র দিকে ফিরলাম আমি।
‘মাইর খাবি, পাজির পা ঝাড়া হইছস্ !’ হেসে ঘরে চলে গেল জননী আমার | ‘শেষ ভালো যার, সব ভালো তার’- বুদবুদ করলো রতন’দা |
চলে যাবো | হয়তো আর ফিরে আসা হবে না তেমন ভাবে | ঘোষদের দিঘি, সবুজদের আমবাগান, কালিখোলার মাঠ দূরতিক্রম্য হবে এবার | জীবনবাবু দেখা হলেই আর জিজ্ঞেস করবেন না,’এ প্লাস বী-এর ফর্মূলা ক’টা, বল তো!’ অসিতবাবুকে দেখে লুকিয়ে পড়বো না আর, বলতে হবে না কারক কয় প্রকার ও কী কী | রাধেশ্যামের মা জি.আর. না পেয়ে ভোরবেলা আর উঠোনে বসে ফেলবে না নিঃশব্দ চোখের জল, হয়তো ফেলবে,শুধু আমি দেখবো না | রাতের বেলায় খালেক চুপচাপ এসে শিস দিয়ে ডাকবে না, দিলেও শুনতে পাবো না | এক নয়া পরিবেশে, যেখানে আর কাপড়ের ব্যাগের ফিতে বাবার কাঁধে শনির মতো চেপে বসবে না, মা নাকের জলে চোখের জলে হয়ে লোহার পাইপটায় নাজেহাল ফুঁ দিয়ে কাঁচা বাবলার ডাল ধরানোর চেষ্টা করবে না | একটা ছিমছাম সংসার, যেখানে মিহি পাড়ের ধুতি, সাদা কোঠারীর ফতুয়া পড়ে, সিদ্ধেশ্বরী মন্দিরে পুজো দিয়ে বাজার করে ফিরবেন কর্তা, শুরু করবেন হাঁক-ডাক, ‘কই গ্যালা ? খোকা উঠছে নি ? আইজ সাইটে বালু পড়বো, বাবু ভুইল্যা ই গ্যাছেন। রতইন্যা হইছে আইরেক কুইড়্যা, দুইখান মইষ লইয়া আর পারি না | ডাইক্যা দাও ওগো, আমারে এট্টু চা দিও |’
‘চিল্লাইয়ো না, হগলডি উঠছে | ফেরেস হইতাছে, বও, তিনজনারেই চা দিমু অ্যাকলগে |’ গৃহকর্ত্রী বলবেন | ব্রাশ করতে করতে মনে হবে, স্বর্গ বলে যে জায়গাটা, সেটা কি সত্যিই ঐ আকাশে ?
ক্রমশ…