সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে হেমন্ত সরখেল (পর্ব – ৭)

তাপ-উত্তাপ

পর্ব – ৭

‘কখন যেতে হবে ?’
‘সন্ধেবেলা | আমি আসবো তোকে নিয়ে যেতে |’
‘ আচ্ছা |’
দাওয়ায় দাঁড়ানো বাবা | হাত দুটো ছনচার বাঁশে | যেন একটানে পেরে ফেলবেন গোটা স্ট্রাকচারটা | বর্ফীলা স্বর, ‘ কই গেছিলি ?’
‘ খালেক…’
‘ মনে পড়ছে পরাণের সখারে ? তহন তো একবারডিও সুলুকসন্ধান লয় নাই! কী কইতেআছিল ?’
‘ কয়- কাইল যাওন যাইব না |’
‘ ক্যান, ওর বাপের রাজ নিকি ? ওগো কতায় ওঠন লাগবো, বসোন লাগবো ?’
‘ চ্যাতো ক্যান ? চেইত্য না, অ্যাহন মুণ্ডু হিম নাহান রাখন লাগবো | তোমরারগো অ্যাকবার লইয়া ফালাই কইলকাতায়, হ্যার পর দেহুমআনে | মোরে সামলাইতে দাও, সোচনের কাম নাই |’
দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বাবা ঘরে গেলেন | আমিও বিছানায় | ঘুম ভাঙলো যখন বেলা তখন রোদের দাপট সইছে | পাশে রতন নদারদ |
ব্রাশে পেস্ট লাগাচ্ছি এমন সময় মায়ের আওয়াজ পেলাম, ‘ উঠছস ? গিরি’র মায় আইছিলো | তোর লগে নাকি কী এট্টা ভারি দরকার | তুই উঠলে যাইতে কইছে তোরে |’
‘ হুঁ, যামুআনে, তুমি চা দাও |’
‘ হ্যাঁ রে বাপ, মোগো আইজ যাওনের কতা আছিল না ? চোখ খুইল্যা দেহি তর বাপেও নাই বিস্তরে | গ্যাছে জানি কোন দিক, অ্যাহোনও তো ফেরে নাই | রতনাডারেও দেহি না, তুই এই ব্যালা মাথায় নিয়া জাগলি, কিছু হইছে, বাপ ? কী হইছে ক’ না মোরে !’
উৎকণ্ঠিত মা জ্বলুনি, তোমারে কইলেই তো তুমি চিন্তা শুরু করবা, এইয়া কি তোমারে কওন যায় ? হ্যার পর তোমারে সামলাইতেই মোগো হাল খারাপ হইয়া যাইব | জবাব না দিয়ে নেমে এলাম উঠোনে |
চা খেতে খেতে রতন’দা ফিরলো | যথেষ্ট উত্তেজিত | এখানে নাকি কী এক সম্ভাবনা দেখে ফেলেছে, সেটাই বলার জন্য আঁকুপাকু প্রাণ | ইশারায় থামানো যাচ্ছে না আবেগ | বাবা ফিরলো মাছ নিয়ে | হেসে বলল, ‘ পার্টি তো দেবেশ’রে চায় না ! হগ্গলেই তোরে খুঁজতাছে | তুই আইছস, খবরখান আগ হইয়া ছড়াইছে |’
‘ তুমি শুনলা কই ?’
‘ পানু’র দোকানে | সব জমা হইতাছে, আমারে কইল, পোলা’রে বাইরাইতে বারণ করবা, মোরা আইতাছি | শুনছ’নি! হে দেহি বড়কা ন্যাতা, মুই তো ট্যারই পাই নাই এই ইস্তক !’
শেষের ডায়লগটা যার উদ্দেশ্যে তিনি চায়ের কাপ সামলাবেন না মাথার ঘোমটা, বুঝে উঠতে পারছিলেন না | রান্নাঘরের দরজায় টালমাটাল অবস্থার হাত থেকে মুক্তি পেতে নামিয়ে রাখলেন চায়ের কাপ-প্লেট | ঘোমটা টেনে হাসলেন, ‘ হেইডা মুই জানি পেরভাতেই, আপনেই মানেন না | লয়েন, মাছ রাইখ্যা হাত ধোয়েন | চা জুড়ায় |’
একটা পুরোনো দাবার চাল এটা | নিত্য’দা এসবে সিদ্ধহস্ত | নদী-নালায় বড়ো হওয়া মানুষটা খুব জানে বড়ো মাছকে ফুটে আটকে রাখতে | খেয়াল হল, রতন’দা কী যেন বলবে বলছিল | পাশেই বসা | বেরিয়ে এলাম দু’জনে সামনের রাস্তায় |
‘ কী হয়েছে ?’
‘ আরে কত্তো জমি ! কী দারুণ সব্জির চাষ ! আরও একেবারে রোডের পাশেই !’
‘ তো ?’
‘ ওরে কিনে ফ্যাল ! কিনে রাখ এখনই ! সময় আসছে, তখন মাটিই টাকা দেবে, শুনিসনি, টাকা মাটি মাটি টাকা ?’
‘ হ্যাঁ, তারপর এসব সামলাবে কে ? একদেশে চাষ অন্যদেশে বাস নির্বোধের |’
‘ বোকার মতো কথা বলিস না | মেসোমশাই সামলাবেন | এমন আর কী দূরত্ব ? সপ্তাহে দু’দিন থাকতেই পারিস | আর, ওদিকের কাজে তো আর তোকে গতরে খাটতে হচ্ছে না ! আমিও তো আছি তোর সাথে |’
‘ তুমি যদি কথা দাও থাকবে, তাহলে ভেবে দেখতে পারি |’
‘ না থাকলে আর তোর সাথে এলাম কেন ? তুই ই বা আমার কাছেই গেলি কেন ? অন্য কোথাও ও তো যেতে পারতিস ! যে ভরসাটা আমার জন্য তোর মনের মধ্যে ছিল, সেটাই তোকে পূর্ব পুঁটিয়ারি টেনে নিয়ে গেছিল | সেটা ভেঙে দিই কীভাবে ?’
‘ তাহলে দু’চারটে দিন চুপচাপ গ্যাঁট হয়ে পড়ে থাকো | এখানের সবটা তালুতে ঢুকিয়ে নিই আবার | মাথায় একটা অন্য প্ল্যান এসেছে | সব হয়ে যাবে, ভেব না |’
‘ আচ্ছা, কর | আমিও দেখি, আর কিছু চোখে পড়ে কিনা |’
চল্লিশের কম না সংখ্যাটা | সামনে নিত্য’দা, লিড করছে ভীড়’কে | আমার হাসি বেরিয়ে এল | রাস্তাটা সোজা | একবারে চাপে ফেলে দাও | এ জায়গাটা তৈরি করতে খাটতে হয়েছে আমায়, দিনকে দিন আর রাতকে রাত ভাবিনি | পার্টির ইশারা বুঝি, বলার প্রয়োজন হয়নি | প্রত্যেকটা ভোটারের সঙ্গে সম্পর্কের গভীরতা আজ এই ভীড় টেনে আনছে আমার কাছে | কাছে আসতেই বললাম, ‘অ্যাতো চায়ের কাপ তো নেই বাড়িতে ! খাওয়াবো কীসে ?’
‘ থাক থাক, আর নাটক করিস না | বাবুর পা ভারি হয়েছে চাকরি পেয়ে | যার একদিন এল.সি. না গেলে পেটের ভাত হজম হয় না, তার খবর আমার লোকের কাছ থেকে শুনতে হয়, এর থেকে বড়ো দুঃখের আর কী আছে ?’
‘ না গো নিত্য’দা | কারণটা অন্য, বলবো, এসো, আগে বসো তো !’
‘ না, এখানে নয়, এল. সি.-তে চল, ওখানে বসার জায়গাও হবে, পানু’র চা ও হবে |’
চায়ে চুমুক চলছে | ঘরে তিল ধারণের জায়গা নেই | টেবিলের এক পাশে নিত্য সমাদ্দার | দৃষ্টি খর, অন্তর্ভেদী | সমানে মেপে চলেছে আমায় | মিতভাষী আমি, এটা উনি জানেন | কাজ বেশি কথা কম | পার্টি ক্যাডাররাও উন্মুখ | আজ পার্টি এক্সপ্লানেশন শুনতে চায় তার মদ্দা গাছের মুখ থেকে | জানি, জানি কত গভীরে প্রোথিত এ মূল | কেন ছেড়ে দেবে এরা আমায় ? এদের সবটা যে জানে তাকে ছাড়া যায় না, হয় জুড়ে থেকে কিসমিস হওয়ার অপেক্ষা করো নয়তো পচে মদ হয়ে যাও | এক পেগ-এ খেল খতম |
‘ নতুন চাকরি, দুদিনের বেশি ছুটি পাইনি | তাই ভাবলাম, বাবা আর মাকে রেখে সামনের সপ্তাহে আবার…’
‘ এখানেই আপত্তিটা | কেন, আমরা তোকে কামড়াচ্ছি, নাকি তোর বাড়িতে চড়াও হয়েছি যে সবাইকে নিয়ে তোকে শিফ্ট করতে হচ্ছে ? যেভাবে দুম করে না বলে গাধার শিংয়ের মতো গায়েব হয়ে গেলি, পার্টির তো অনেক কিছুই ভেবে নেওয়ার ছিল ! তবুও দ্যাখ, তোকে ডেকে এনে কথা বলছি | তুই বুঝিস না পার্টি তোকে কতোটা চায়, কেন চায়?’
‘ বুঝি, সব বুঝি, বুঝি বলেই তো এখানে বসে আছি | বাবার বয়স হচ্ছে, পেট চালানোর তো দরকার ছিল, তারপর পরীক্ষার সময়…’
‘ থাক ওসব কথা | শোন, আমাদের শুধু একটাই চাওয়া তোর কাছে | তুই এ অঞ্চলটা ছেড়ে যাস না | প্রতিটা ক্যাডার তোকে চায় | কিরে, তোরা বল, চুপ করে আছিস কেন ?’
সমবেত আওয়াজ সকারাত্মক | প্যাঁচটা লেগেই গেল, এখান থেকেই রাস্তাটা গুছিয়ে নিতে হবে | তার জন্য দেখনদারির সময় চাই | বললাম, ‘ বেশ, একটু ভাবতে দাও, কীভাবে কী সেট করবো দেখে নিই, তবে একবার যেতে হবে অফিসে, আজ তো যাওয়াই হলো না |’
‘ যা, চাকরি যখন, তখন যেতে তো হবেই | তবে একা যা | তোর সাথে যে এসেছে, তিনি কে ?’
‘ আমার কলিগ, ওর ওখানেই আছি আপাততঃ | এবার একটা ঘর ভাড়া দেখেছি, তিনজনের মতো |’
‘ গিয়ে ক্যান্সেল করে আয়, তুই আমাদের ছেড়ে যাচ্ছিস না, এটাই ফাইনাল | তোর সুবিধা-অসুবিধা পার্টি দেখবে,ব্যাস্ |

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।