সম্পাদকীয়

পড়াশোনা করাও অন্যান্য নেশাগুলোর মতো একটা নেশা। অন্যান্য নেশারা শরীর এবং অর্থ দুটোই ক্ষতি করে। কিন্তু বইয়ের নেশা অর্থের ক্ষতি করে ঠিকই কিন্তু জ্ঞানের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করে। বই পড়ে নিজেকে উন্নত করা যায়, অজানাকে জানা যায়। তাই সৈয়দ মুজতবা আলী বলেছিলেন- বই কিনে কেউ কোনোদিন দেউলিয়া হয় না।
একটা সময় ছিল যখন আমাদের একমাত্র বিনোদন ছিল বই পড়া। মা উপন্যাস পড়তে ভালোবাসতেন। তাঁর পড়া উপন্যাস লুকিয়ে লুকিয়ে পড়তাম। যদিও এখন বুঝি কেন আমাকে সেই উপন্যাসগুলো লুকিয়ে পড়তে হয়েছিল। বড়দের লেখা আর ছোটদের লেখা আদালা হয়- তার তফাৎ এখন লেখালেখি করতে এসে ভালো বুঝতে পারি। সেদিনকার বইয়ের নেশা মা ভুলে গেছেন। এখন বই দেখলে তাঁর কোনো আনন্দ হয় না। তাঁর আনন্দ এখন টেলিভিশন কেন্দ্রিক হয়ে গেছে। এই চিত্রটা এখন প্রতিটি ঘরের চিত্র।
আমাদের কিছু বন্ধু ছিল যারা বই পড়তে খুব ভালোবাসত। এই সপ্তাহে কে কোন বই পড়েছে তাই নিয়ে আলোচনা হত। ভালো বিষয় হলে আমরাও সেই বইটি বইপাড়ায় গিয়ে কিনে আনতাম, অথবা লাইব্রেরি থেকে সংগ্রহ করতাম। একবার তো চয়নের একটি বই চারদিনের কথা বলে বিপুল পড়তে নিয়ে যায়। কিন্তু সে আর কোনোদিন বইটি চয়নকে ফেরত দেয়নি। এই নিয়ে ওরা দুজন মারামারি পর্যন্ত করেছিল। তবু বিপুল ওই বইটি তাকে ফেরত দিতে নারাজ। দেবেইবা কেমন করে! ওর এক নতুন ক্রাশকে বইটি উপহার দিয়েছিল। বই নিয়ে এই পাগলামি আমরা আর করি না। আমাদের সেদিনের সেই সুস্থ নেশার মুক্তি হয়েছে। আমরা নষ্ট হয়ে যাচ্ছি নেশা ছেড়ে- বইয়ের নেশা ছেড়ে।
সম্পাদকীয় লিখতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ি। কত বিষয় আছে যা লিখে শেষ করা যাবে না, অথচ তা মরমি হৃদয়ে দরদ জাগিয়ে যায়। তবু বলতে ইচ্ছে হয়- নেশা লাগুক তোর, এই নেশায় মরে যা। বইয়ের পৃষ্ঠায় লুকিয়ে রাখ সুলেখাদির গায়ের ঘ্রাণ।
হৃদয় মালাকার