সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে হরিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় (পর্ব – ৮৭)

সোনা ধানের সিঁড়ি
১২৬
আজ সকালে দেখলাম রামপুরহাটে পুলিশের লোক আগুনে পুড়ে যাওয়া মানুষগুলোকে তুলে নিয়ে এসে একটা কাপড়ের ওপর জড়ো করছে। দেখা যায় না কিন্তু তবুও এই বয়সে এসে কত কিছু দেখতে হলো। না জানি আরও কত কিছু দেখতে হবে। অথচ ঠিক এইসময়ে চারদিকের উৎসবে মানুষ তার নিজের আসনকে টিকিয়ে রাখার কি প্রাণান্তকর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এসবে কার কি যায় আসে! আসলে এ শিক্ষা আমরা শৈশব থেকেই পেয়ে এসেছি। বিয়েবাড়ির পাশ দিয়ে যখন হরিবোল তুলে কোনো মৃতদেহ চলে যায় তখন আমরা কতটুকু সেদিকে মন ঘোরাতে পারি? জানি এটাই পৃথিবীর নিয়ম কিন্তু তবুও কি মানুষ হিসেবে এসব নিয়ে আমরা কিছুমাত্র ভাবব না?
মনে পড়ে খুব ছোটোবেলায় মা বারবার বলতো পড়াশোনার কথা। তখন ভাবতাম পড়াশোনা করলেই বোধহয় অনেক কিছুতে জিতে যাওয় যায়। পড়াশোনায় কোনোদিন ফাঁকি দিই নি। আসলে পড়াশোনাটা করতে ভালোবাসতাম। বড় হয়ে দেখলাম, সত্যিই তাই। পড়াশোনা করলে অনেক কিছু জিতে যাওয়া যায়। চাকরি জেতা যায়, বাড়ি গাড়ি জেতা যায় এবং আরও অনেক কিছু। সবটুকুই অর্থের অঙ্কে পরিমাপ করা যায়। আর বাকি সব শূন্য। যে শিক্ষার জন্য অভিভাবকদের এত দৌড়ঝাঁপ তার মূল উদ্দেশ্য নিজের সন্তানকে একটা ভালো আর্থিক কাঠামোর ওপর দাঁড় করানো। তা না হলে প্রতিটা ফল প্রকাশের পর কেন অভিভাবকরা সন্তানকে সামনে রেখে একবারও বলেন না, তিনি তাঁর সন্তানকে আগে মানুষ করতে চান। আসলে বলেন না একটাই কারণে, এই চাওয়া তাদের কাছে হাস্যকর। কারণ এখনও তাঁদের কাছে মানুষ মানে রক্তমাংসের মানুষ। এই চাওয়ার ফল তো আমাদের পেতেই হবে।
আজ বুঝতে পারি পুঁথিগত শিক্ষাটা কিছুই নয়। পুঁথিগত শিক্ষা দিয়ে কিছুই প্রমাণ করা যায় না। তা না হলে একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে মানুষ মানুষকে পুড়িয়ে মারতে পারে! সংখ্যাটা যতই হোক, মৃত্যুর কারণ একটা মানুষ আর একটা মানুষের গায়ে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। শুধু এইটুকু মনে এলেই রাতের ঘুম ছুটে যায়। শুধু কি তাই, এর থেকেও ভয়ঙ্কর কেউ বিষয়টাকে গুরুত্বই দিচ্ছে না। এ ওর গায়ে দোষ চাপাবার চেষ্টা করছে। রাজনীতিকে কোনোদিনই আমি আমার বিচরণের জায়গা বলে মনে করি নি। অথচ এমন একটা জায়গায় আমার জন্ম সেই ধনিয়াখালি হল রাজনীতির আখড়া —— একসময়ের লাল দূর্গ। কিন্তু যৌবন থেকেই আমি এর আঁচ থেকে দূরে থাকতাম। আজও সেই সিদ্ধান্তের কোনো রদবদল হয় নি। বরং ঘৃণাটা আগের থেকে অনেক বেড়ে গেছে। সেই কোন ছেলেবয়েস থেকে শুনে আসছি, ভোটপর্ব মেটার পর শাসক দল সাংবাদিক সম্মেলন করে জানাচ্ছেন, ভোট মোটামুটি শান্তিতেই হয়েছে। একটি জায়গায় এক সংঘর্ষে একজনের মৃত্যু হয়েছে। এই বাক্যটি এমনভাবে উচ্চারিত হলো যেন এটা কোনো ব্যাপারই নয়। এত বড় একটা রাজ্য তথা দেশে দু’একজন তো মরতেই পারে। আশ্চর্য! ওই মৃত্যুটা যদি ওনার পরিবারে হতো তাহলে কি উনি এই নির্লিপ্ততা দেখাতে পারতেন?
মানুষ হিসেবে খুব লজ্জা হয়! অথচ ভাবুন তো, শুধু মানুষ কত কিছুই না পারে! গোটা রাজ্যের মানুষ যদি একসঙ্গে রাস্তায় নেমে সবকিছু অচল করে দেয়! অথবা একটা গোটা দেশ! কে কোথায় পালাবে তার ঠিক নেই। কয়েক ঘন্টায় সব জব্দ হয়ে যাবে। কি সাহস গুটিকয়েক মানুষের! মানুষকে পাত্তাই দিচ্ছে না। কিন্তু কোন মানুষেরা নামবে? পুঁথিগত শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষের ডিগ্রি ডিপ্লোমা আছে কিন্তু মেরুদণ্ড তো নেই। তাছাড়া অনেকেরই তো আবার অনেক কিছু আগলে টাগলে রাখার ব্যাপার আছে। কিছু বলতে গেলে যদি আবার তারা রেগে টেগে যান!
কয়েকদিন অন্তর অন্তর এক একটা ঘটনা ঘটে আর মনে হয়, আমাদের দেশের অভিভাবকরা কবে বলবেন, কোনো কিছু হওয়া অনেক পরে। আগে তাঁর সন্তান মানুষ হোক।