আমার সারা ঘর জুড়ে এক অদ্ভুত গন্ধ। দুপুরের গন্ধ। মনে হচ্ছে অনেকটা দূর থেকে সে আসছে। ভাসতে ভাসতে। হেঁটে হেঁটে আসবে কেন? কোথাও যাওয়ার থাকলে কেউ বুঝি হেঁটে হেঁটে যায়? যাওয়ার কথা শুনলেই তো মন ভাসে। মন ভাসতে ভাসতে মনে মনেই কতদূর চলে আসে। এইভাবেই দুপুর একদিন আমার ঘরের চৌকাঠ পেরিয়ে ঘরে ঢুকে আসে। তাকে তো আসতে বলতে হয় না। তার সঙ্গে কতদিনের মুখ চেনা। চেনা মুখ আরও চিনতে চিনতে আরও অনেক কাছে। এখন শুধু তাকে চিনি না, সেও আমাকে অনেক দিক থেকে অনেকটাই চিনে ফেলেছে। সেই চেনা আজ ঘরের চৌকাঠ পেরিয়ে ঘরের ভেতর।
দুপুরের গন্ধে বিভোর হয়ে আমি সুরের প্রদেশে ডুবে যাই। কুড়িয়ে পাই এই বছরের নোবেল পুরস্কার বিজয়ী কাজুও ইশিগুরোর একটি কবিতা —–
“আমার ঘরের ভেতর ঢুকে পড়েছিল
একটা তারা
ডানাওয়ালা একটা তারা
আশ্চর্য এক গন্ধে
ভরে গিয়েছিল আমার ঘর
আর কেমন যেন এক মিহি মেঘ
তার তুলোর মতো নরম রঙ
ছড়িয়ে দিয়েছিল সারা ঘর
আমি ভাবছিলাম
কেন এল এই তারা
কেন বেছে নিল আমারই ঘর ;
তারপর দেখলাম
সে আর কেউ নয়
আমারই মত একটা বোকা আর
হেরে যাওয়া লোক
যে আসলে ভুল করে
আমাকেই
তারা ভেবে বসেছিল ।”
সত্যিই তো সে এলে সারা ঘর গন্ধে ভরে যায়। গন্ধ নিয়ে মনে হয়, এর জন্যই তো সারাটা সময় দুয়ার খুলে বসে থাকা। গন্ধের সমগ্রতায় থাকে এক প্রশান্তির বাতাবরণ। এখানে তো “তারা”, কিন্তু আসলে তো সেই মানুষ যে আমৃত্যু অন্বেষণে মত্ত। এই অন্বেষণের নেশাই তাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়।
এখন প্রশ্ন, আমার ঘরেই সে এল কেন? আমার ঘরেই কেন হল তার দাঁড়াবার জায়গা? আমার ঘরে তো তেমন বিশেষ কিছুর আয়োজন নেই। তাহলে কি আমার মুখে এমন কিছুর প্রকাশ ঘটেছিল যা তাকে আমার ঘরের দিকে টেনে নিয়ে এসেছিল?
সত্যিই কি সে বোকা, হেরে যাওয়া লোক? একপক্ষে কিন্তু তাই। কারণ প্রচলিত দুনিয়ার সঙ্গে সে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে নি। তাই সে আজ বাতিল। অনেক যুদ্ধ সে করেছে। কিন্তু পেরে ওঠেনি। তাই তো সে আজ এসে দাঁড়িয়েছে রাস্তায়। এটা হেরে যাওয়া নয়। বরং নিজ বৈশিষ্ট্যে অবিচল থাকা।
জীবনপাত্র ভরে উঠুক বা নাই উঠুক এরকম এক অস্তিত্বের মুখোমুখি হওয়া সত্যি ভাগ্যের ব্যাপার। এত কিছুর মধ্যেও কেউ একজন মানুষের সন্ধানে ঘুরে চলেছে। প্রাত্যহিকতার এই অতৃপ্তিই তো মূল চালিকাশক্তি। এই অতৃপ্তিই তাকে ছুটিয়ে নিয়ে বেড়ায়। তার নিশানায় আমার অবস্থান আমাকে যেন একটা পরিপূর্ণতা দেয়।