খুব ছোটবেলায় যখন ফোর কি ফাইভে পড়ি তখন ভাইফোঁটার দিন বেশ আনন্দই হতো। মিষ্টি আমার চিরকালের প্রিয়। তাই ভাইফোঁটার দিন হাতের কাছে একসাথে অনেক মিষ্টি পেয়ে মনটা আনন্দে ভরে উঠতো। কিন্তু একটু বড় হতেই মনে অনেকগুলো প্রশ্ন উঁকি দিতে শুরু করলো। প্রশ্নগুলো আমি নিজেকেই করতাম। আমার দিদিকে সামনে রেখেই আমি প্রশ্নবাক্য তৈরি করতাম।
যে দিদি আমাদের সংসারের জন্যে নিজের জীবনটাকেই উৎসর্গ করলো, যার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সাহায্য না পেলে আমি আজকের জায়গায় কখনই আসতে পারতাম না সেই মানুষটা একটা বিশেষ দিনে আমার মঙ্গল চাইবে —– এর চেয়ে হাস্যকর আর কিছু হতে পারে না। তাছাড়া এই অনুষ্ঠানকে আমি কিছুতেই মন থেকে মেনে নিতে পারি না। আমার দিদিকে আমি শ্রদ্ধা করি, আমার বোনকে আমি স্নেহ করি – দুজনেই আমার অন্তরের ভালোবাসার মানুষ। কিন্তু এই শ্রদ্ধা আর ভালোবাসাটা শুধু নিজের দিদি বা বোনের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। যদি তা না হতো তাহলে দেশের সব দিদি বা বোনের প্রতি আমরা শ্রদ্ধাশীল হতাম। আমার একবারের জন্যেও অন্তত মনে হতো আমার বাড়িতে যে বউটা আছে তারও ভাই দাদা আছে। সেও আজকের দিনে তার বাপেরবাড়ি যেতে চায়। কিন্তু উপায় নেই। কারণ আমি তাকে আগে থেকেই বলে রেখেছি, তুমি বাপেরবাড়ি যেতে পারবে না। তুমি বরং তোমার ভাইকে এখানে আসতে বলে দাও। অনেক দিন বাদে বোনেরা এখানে আসছে। তাই তারা আর বাপেরবাড়ি এসে রান্নাঘরে ঢুকতে পারবে না। সারা বছর তো রান্না করছে। এই একটা দিন অন্তত বোনেরা নিজের ইচ্ছামতো সময় কাটাক। আমার একবারও মনে হবে না, অন্য এক ভাই বা দাদা আমার বাড়ির বউটার দিকে আঙুল তুলে ওই একই কথা বলতে পারে।
যে দিদি ভালোবেসে তার ভাইকে ফোঁটা দিচ্ছে সে কি করে ভুলে যায় শাশুড়ির ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে – তার ছেলের বউটারও একটা বাপেরবাড়ি আছে এবং তারও ইচ্ছা করে ভাইয়ের কপালে ফোঁটা দিয়ে আসি। কিন্তু না, তুমি যেতে পারবে না। এই নিয়ে কত সংসারে কত অশান্তি যে হয় তা আর বলে শেষ করা যাবে না
বাঙালিদের এই অনুষ্ঠানের মধ্যে যদি সামান্যতম প্রাণও থাকতো তাহলে কাগজে টিভিতে আমাদের এতো মৃত্যু (অবশ্যই নারী) দেখতে হতো না। তাই বাঙালির আর পাঁচটা খাদ্যভিত্তিক অনুষ্ঠানের মতো এই ভাইফোঁটার নাটক যে পৃথিবী ধ্বংসের আগের দিন পর্যন্ত চলবে তা বলাই বাহুল্য।