সোনা ধানের সিঁড়ি
৫৯
রোজই ভাবি, আজকের রাতটা আর ঘুমাব না। সারাটা রাত লিখে পড়ে কাটিয়ে দেব। কিন্তু পারি না। ছ’টা বাজলে উঠতেই হবে। ছাত্রছাত্রীদের পড়ানো থাকে। রাত চিনেছি মায়ের কাছ। মাকে পড়ে কিছুতেই সন্তুষ্ট করা যেত না। পড়তে পড়তে কত রাত হয়ে যেত। মা তবুও রাতের খাবার দিত না। এইভাবে পড়তে পড়তে অনেক রাত হয়ে যেত। এই যে রাত জাগার অভ্যাস আজ পর্যন্ত তার সামান্যটুকুও কমে যায় নি বরং আরও অনেক বেড়ে গেছে। আসলে রাত হলে আমি নিজেকে যেন খুঁজে পাই। রাত আমাকে আমার কাছে এনে দেয়।
৬০
খুব ছোটবেলায় একা একাই সব জায়গায় ঘুরে বেড়াতাম। তার মানে এই নয় যে আমি কারও সঙ্গে মিশতে চাইতাম না বা মিশতে পারতাম না। আর পাঁচটা মানুষের মতো স্বাভাবিক সব গুণই আমার ছিল। তবু একা একা থাকতে হলে আমার খুব একটা অসুবিধা হতো না। ছোটবেলায় আমাকে একা রেখে কেউ বাইরে গেলে অথবা এখনও যখন প্রয়োজনে একা থাকতে হয় তখন আমার তো বেশ ভালোই লাগে। তখন কলেজে পড়তাম, ট্রেনের জন্যে স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছি, ট্রেন আসতে দেরি করছে ; কত মানুষ কত কি বলছে। আমার বন্ধুরাই কত কিছু বলত। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ উল্টো প্রতিক্রিয়া দেখা যেত। আমি একটুও বিরক্ত হতাম না। বরং ট্রেন আসতে দেরি হলে আমার বেশ ভালোই লাগতো। আমি বসে বসে কবিতা পড়তাম। তাই আমার কাছে কেউ ট্রেনের আসা নিয়ে বিরক্ত প্রকাশ করত না। কারণ ওরা জানতো, আমাকে বলে কিছু লাভ হবে না।
একা একা থাকলে আমি নিজেকে নিয়ে ভাবতে পারি। নিজের কোনো লেখা নিয়ে আরও গভীর চিন্তা ভাবনা করা যায়। সে যাই হোক, কোনো কিছু নিয়ে একবার ভাবনার গভীর জলে ডুবে গেলে আর দেখতে হবে না। তখন কে কোথায় আছে, আমিই বা কোথায় কি জন্যে বেরিয়েছি সব ভুলে যাই। তখন আমিই আমাকে সঙ্গ দিই। আমার কোনো ভালো লাগা নিয়ে আমিই আমাকে একটা বিশেষ উচ্চতায় নিয়ে যাই। এটা সম্পূর্ণ একটা ভিন্ন জগৎ। এই জায়গায় কারও সঙ্গে কারও দেখা হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই। তাই কারও জন্যে মনে কোনো অভাব বোধ জাগ্রত হয় না। আত্মমগ্নতার চূড়ান্ত স্তরে গিয়ে পোঁছানো যায়।