সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে হরিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় (পর্ব – ৪০)

সোনা ধানের সিঁড়ি

৭৩
শরৎকাল মানেই আমার কাছে শিউলি, কাশ, নীল আকাশ, সোনার মতো রোদ আর দুর্গাপুজো। এই দুর্গাপুজো আমার কাছে খুব বড় হয়ে দেখা দেয় নি। খুব ছোটবেলা থেকেই দুর্গাপুজো আমার কাছে শরৎকালের একটা অংশ ছাড়া আর কিছু নয়। তাই দুর্গাপুজো নিয়ে বাঙালির যে বাঁধভাঙা আনন্দ তা আমার কোনোকালেই ছিল না।
তখন তো ভরা বর্ষা। কুমারটুলির এক শিল্পী সুরেশ পাল আমাদের দোকানতলার মোড়ের বারোয়ারি ভাড়া করে মূর্তি তৈরির ব্যবসা করত। চোখের সামনে দেখতাম মূর্তি তৈরির জন্যে খড় বাঁধা হচ্ছে। তারপর সেই খড়ের ওপর একমেটে, দোমেটে (মাটি চাপানো) হতো। তারপরে চলত রঙের পর্ব। নবাদা বলে একজন চোখ আঁকতো। তার কাজ ছিল শুধু চোখ আঁকা। খুব কম কথা বলতো। আমার মনে হতো ও যেন কোনো ভাবনার মধ্যে ডুবে আছে। মূর্তি তৈরির সবটুকু চোখের সামনে দেখতাম বলে পরে কখনও মূর্তিগুলোকে আমার ঠাকুর বলে মনে হতো না।
আসলে ছোটবেলায় আমাদের কাছে পুজোর অনেক আগেই শরৎকাল চলে আসতো। শিউলি আমাকে সবার আগে শরতের খবর এনে দিত। প্রথম যেদিন ভোরে উঠে দেখতাম শিউলিতলা সাদা হয়ে গেছে সেদিন সে কী আনন্দ! দু’হাত ভরা শিউলিতে নাক ডুবিয়ে প্রথম শরতের গন্ধ নিতাম। আজ ভাবলে অবাক হই, ওই বয়সে ছোট ছোট ছেলেরা ভোরে উঠে আমগাছতলায় ছোটে আম কুড়ােনোর জন্যে। আমার শিউলির প্রতি একটা অদম্য টান ছিল। কেন জানি না। বাড়ির রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে অন্ধকার থাকতে শিউলিতলায় পেতে (আগের দিন রাতে ধুয়ে একটা নির্দিষ্ট জায়গায় রেখে দিতাম) নিয়ে হাজির হয়ে যেতাম। রাস্তার ধারেই গাছটা ছিল তাই অনেক ফুল রাস্তার ওপর এসে পড়ত। আমি এসেই রাস্তার ফুলগুলো আগে কুড়িয়ে নিতাম যাতে একটা ফুলকেও কেউ মাড়িয়ে যেতে না পারে।
ফুল কুড়োতে কুড়োতে দেখতাম অন্ধকারের দরজা খুলে বেরিয়ে আসছে ভোর। হাতে শিউলি, নাকে তার প্রাণজুড়ানো গন্ধ আর সেই সঙ্গে পায়ে পায়ে ভোরের এগিয়ে আসা —– এই স্বর্গীয় আনন্দ আমি প্রতিদিন পেতাম। পেতে ভর্তি ফুল নিয়ে যখন বাড়ি ঢুকতাম তখন মনে হতো কী বিরাট সম্পদ নিয়ে বাড়ি ফিরছি।
বিকেলে নদীর ধারে কাশের বনে লুকোচুরি খেলতাম। বিকেলে নদীর বুকে যখন সূর্য ডুবতো তখন এক অদ্ভুত বিষন্নতা আমাকে গ্রাস করত। হ্যাঁ ওই বারো তেরো বছর বয়সেই। এক একদিন জোর করে সকলের সঙ্গে অন্ধকার নেমে আসার আগে পর্যন্ত খেলা চালিয়ে যেতাম। কিন্তু বেশিরভাগ দিনই সূর্য ডোবার মুহূর্তে খেলা থেকে সরে এসে নদীর পারে বসে বসে বিকেলের আলো নিভে আসা দেখতাম।
পুজোর দিনগুলো ঝড়ের গতিতে পার হয়ে যেত। দেখতে দেখতে চলে আসতো দশমী। সকল মানুষের মধ্যেই দেখতাম একটা মনখারাপের ভাব। আসলে আবার সেই থোড় বড়ি খাড়া। কাজের পরিবেশে ফিরে যেতে হবে। তাই আরও বেশি করে মনকষ্ট। দেখতাম আমার শরৎ তখনও আমাদের সারা উঠোন জুড়ে নিজেকে ছড়িয়ে রেখেছে। দুর্গা চলে গেলেও এখন তো আছে কাশ শিউলি আর সোনা রোদ। তাই মনকষ্ট তো দূরের কথা বরং আরও আনন্দের সঙ্গে নিজেকে শরতের মধ্যে ডুবিয়ে দিতাম।

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।