সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে হরিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় (পর্ব – ৯২)

সোনা ধানের সিঁড়ি

গায়ে রোদ এসে পড়লে আরাম হওয়ার মতো সময় এটা নয়। এখন ভরা গ্রীষ্ম। রোদের তেজও ভীষণ। রোদ সরাসরি কাছে এসে দেখা দিলে এতক্ষণ কি হতো কে জানে! রোদ আসছে আম জাম কাঁঠালের ফাঁক দিয়ে জানলায়। আর জানলার কাছেই বসেছিলেন তিনি। মাথার ওপর পাখা ছিল। খোলা দরজা জানলা দিয়েও মাঝে মাঝেই ঢুকে পড়ছিল বাতাস। কিন্তু তবুও গরমের অস্বস্তি ভাব একটা ছিলই। এর মধ্যেই চলছিল কবিতা পাঠ।

তিনি বসেছিলেন একেবারে জানলার গায়েই। অনেকক্ষণ ধরে দেখছি রোদ তার গায়ে এসে পড়ছে। আমি তাঁকে চিনি। তিনি আমাকে চেনেন। একবার দুবার কথাও হয়েছে। গায়ে রোদ দেখার জন্যে এসব কিছুই লাগে না। সেখানে আমাদের তো অনেকখানিই এগিয়ে থাকা। তাঁর পাঠ এখনও হয় নি। ঠিক করেই রেখেছিলাম পাঠ চলাকালীন সময়ে তাঁর ছবি তুলব। এই ঠিক করাটা সেদিন তাঁর সঙ্গে দেখা হওয়ার অনেক পরে। তিনি পাঠ করলেন, আমি তাঁর ছবি তুলে ইনবক্সে পাঠিয়ে দিলাম। তিনি খুব খুশি হলেন তাঁর ছবি পেয়ে। দূর থেকে তাঁর হাসিমুখ দেখেই সেটা বুঝতে পারছিলাম। আমারও ভালো লাগছিলো তিনি এই ব্যাপারটা ভালো মনে নিয়েছেন। কারণ তাঁর ছবি আমি আগে কখনও তুলিনি। শুধু তাই নয় একসঙ্গে অনুষ্ঠান করাও এই প্রথম। তাই নিজে থেকে উপযাচক হয়ে ছবি তুলে সেগুলি ইনবক্সে পাঠালে কি দাঁড়াতে পারে সেটা না ভেবেই সমগ্র কাজটি করে ফেলি। একসময় আমার কবিতা পাঠও হল। তিনিও ছবি তুললেন। আমি যেহেতু তাঁর ছবি তুলেছি তাই তাঁর আমার ছবি তোলাটা স্বাভাবিক। আমি না তুললে তিনি একাজ করতেন কিনা বলা শক্ত।

অনুষ্ঠান শেষ হয়ে গেছে। বাড়ি ফেরার পথে তাঁর সঙ্গে আবার দেখা হয়েছে। কথাও হয়েছে। আসলে সেদিন তাঁকে নিয়ে মনের ভেতর অনেক নাড়াচাড়া হয়েছে। ফলস্বরূপ তাঁকে নিয়ে সেই রাতে বেশ কয়েক লাইন নয়, বেশ কয়েকটি কবিতাও লিখেও ফেললাম। একটি অনলাইন ম্যাগাজিনে কবিতাগুলি প্রকাশিত হলে তাঁকে পাঠালাম। তিনি আপ্লুত। কেন জানি না তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, এই কবিতা সেদিনের অনুষ্ঠানের ফসল। কবিতাগুলি পড়ার পর তাঁর বক্তব্য, এই সৃষ্টির মধ্যে তিনি যদি সামান্যতমও থেকে থাকেন তাহলে তিনি নিজেকে ধন্য বলে মনে করবেন। আমি বললাম, সামান্য কেন, পুরোটা জুড়েই তো আপনি। তিনি বললেন, এটা ঠিক নয়। আমি বললাম, ঠিক নয় কেন? সেদিন অনুষ্ঠানে আমি আপনি ছাড়া তো আর কেউ ছিলেনই না। তাই অন্য কারও আসার সম্ভাবনাই নেই। এতক্ষণ ঠিকঠাক চলছিল কিন্তু তিনি আমার মুখে এই বক্তব্য শুনে নিজেকে একেবারে গুটিয়ে ফেললেন। এটা এই কারণে বললাম, তাঁর সহজতা নষ্ট হয়ে গেল। তিনি ধরে নিলেন এটা পাগলামো। অথচ অদ্ভুত ব্যাপার তিনি কিন্তু একজন লেখক। একজন লেখকও বুঝতে পারছেন না, একজন যদি আর একজনের ভেতর ডুব না দেন তাহলে কিছু কুড়িয়ে পাওয়া যায় না। তাই সেদিনের অনুষ্ঠানে সত্যিই তো আমরা দুজন ছাড়া আর কেউ ছিলেন না। হয়ত তিনি বুঝতে পেরেছিলেন কিন্তু এই সহজ ব্যাপারটা মন থেকে মেনে নিতে পারেননি। হয়ত তিনি এই সৃষ্টির মধ্যে অন্য আরও কিছু খুঁজে পেয়েছিলেন। তাহলে আমরা যতকিছু আধুনিকতা দেখাই সেটা আমাদের সৃষ্টির মধ্যে কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে আমরা সেই চারদেওয়ালের মধ্যে আবদ্ধ সংকীর্ণ মানসিকতার।

একজন লেখকও একজন লেখকের কাছে সহজ হতে পারছেন না। আসলে আমাদের জীবন থেকেই স্বতঃস্ফূর্ততার জায়গাটা কমে আসছে। সেদিন তাঁর আচরণ দেখে মনে হয়েছিল, সবই তো ঠিক ছিল কিন্তু লেখালিখির দরকারটা কি ছিল —— এরকম যেন একটা মনের ভাব। কিন্তু কেন লিখলাম, লেখকরা কেন লেখে তা কি তিনি জানেন না? তাহলে ধরে নিতে হবে একজন লেখকের কাছেও, কাউকে নিয়ে কিছু লেখা মানেই তাঁকে মনে ধরা, তাঁর প্রেমে পড়ে যাওয়া। আধুনিক দুনিয়ার কথা বলতে গিয়ে আমরা যখন সাধারণ মানুষের দিকে আঙুল তুলে ঠোঁট ওল্টাই এবং শরীর ভাষায় এমন ভাব করি, এরা যেন মধ্যযুগের। এসব জায়গায় দাঁড়িয়ে আমরা তাহলে কি বলব?

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।