T3 || ঘুড়ি || সংখ্যায় গৌতম তালুকদার

ভোকাট্টা

আরে এতো দেখছি…. দেখ দেখ কেমন তাড়িয়ে নিয়ে ছুটছে,উড়ছে,যেনো ফাইটার বিমান।আশে-পাশে উড়তে থাকা সব কটাকে দেখে মনে হচ্ছে শক্র দেশের। সুযোগ পেলেই…..তারপরেও কেউ ওর হাত থেকে রেহাই পাবে না।
বলেছিলাম,এ তল্লাটের কেউ ছোটনের ধারের কাছে আসতে পারে না ঘুড়ি ওড়ানোর কৌশলে। গত বছর তো দেখলি। এক হাতে ব্যান্ডেজ থাকা সত্ত্বেও ছাদের কার্নিশে দাঁড়িয়ে একের পর এক ভোকাট্টা করে ছাড়লো সব ঘুড়ি। গণেশ দলবল নিয়ে যতোই দেখিয়ে দেখিয়ে ,গাবের লোদে কাঁচ গুড়ো মিশিয়ে কড়া পাকে জ্বাল দিক। মাঞ্চার সূতো তৈরী করে,চড়া রোদে শুকিয়ে,দীপনের তৈরী ঘুড়ি উড়িয়ে দিক আকাশে।তবু,ছোটনের কাছে ধরা খাবেই। দেখে নিস। আসলে ছোটনের ঝুনু কাকার খুব নাম ডাক ছিল ঘুড়ি ওড়ানোর।সে সময় বিশ্বকর্মা পুজোর দিন প্রতিযোগিতা হতো ক’ দিন আগে থেকেই ঝুনু কাকাকে হায়ার করে নিতেন বিশ্বকর্মা পুজো কমিটির লোক।
এ পড়া সে পাড়ার ভ্যান চালক সমিতি, রিক্সা চালক সমিতি,অন্য সব ক্লাব থেকে আসতো ঝুনু কাকাকে বায়না করতে।ছোটন ছিল ওর কাকার সাগরেদ।যাই বলিস না কেন ভাই,ওকিন্তু আজও বজায় রাখতে পারছে ওর কাকার মান।আসলে ঘুড়ি ওড়াতে বাতাসের গতিবিধি বুঝতে হবে।সেই সাথে সুতো ঢিল দেওয়া কখন কতটা কি ভাবে লাইট ঘুড়িয়ে টেনে নিয়ে সূতো গোটাতে হয় ছাড়তে হয় জানতে হবে তবেই না বাজিমাত করা।সে সব গুন ছোটনের আছে শিখে নিয়েছে
ওর ঝুনু কাকার সাথে থেকে।
-সত্যি তো সে সব দিন আজ আর নেই।আমরাও
অল্পবিস্তর ঘুড়ি উড়িয়েছি।খোলা মাঠে দাঁড়িয়ে শরৎতের আকাশে মুক্ত বাতাসে ঘুড়ি উড়তো ঝাঁকে ঝাঁকে। প্রচুর মানুষ ভিড় করে দেখতো ঘুড়ির লড়াই। সে কি টান টান উত্তেজনা।সে সব দিনের কথা মনে পড়ে যখন দেখি আশ্বিনের আকাশে রং বে রঙের ঘুড়ি উড়ছে, শত শত পাখির ঝাঁকের মতো ডানা মেলে। বাজারে দোকানে দোকানে লাইন দিয়ে ঘুড়ি লাটাই সূতো কেনার হুড়হুরি। স্কুল থেকে বাড়ি ফিরেই ছুটতাম মাঠের দিকে। হাতে থাকতো লম্বা বাঁশের কঞ্চি। শুধু অপেক্ষায় ভোকাট্টা হলেই ছুটবো ঘুড়ির পেছনে। ঢেউ খেলতে খেলতে আকাশ থেকে বাতাসের কাঁধে এলিয়ে পড়তো ঘুড়ি, সূতোর নাগাল পেলেই কঞ্চিতে জড়িয়ে নিতাম সূতো।কাড়াকাড়ি লেগে যেতো কে আগে ছিনিয়ে নিতে পারে। তখন তো বেশির ভাগ ঘুড়ি গাছের মাথায় এসে আটকে যেতে। লাফিয়ে উঠে ঘুড়ি নামিয়ে আনতাম।এখনো ঘুড়ি উড়তে দেখি বিশ্বকর্মা পুজোর দিনে এর আগে পরে খুব একটা দেখা। যায় না। বড় বড় আবাসনের ছাদে দাঁড়িয়ে।কেউ কেউ ঘুড়ি ওড়ায় ঠিকই তবে সেই বিস্তর মাঠে দাঁড়িয়ে গাছের মাথায়, একতলা দুতলা বাড়ির ছাদ থেকে ভোকাট্টা ঘুড়ি পেরে আনা তো আর হয় না‌।এখন তো শুধু আকাশ ছুঁয়ে আছে বড় বড় আবাসন। বর্তমান প্রজন্মের সেই অবকাশ কোথায় ‌!দিনে দিনে এসব হারিয়ে যেতে বসেছে। -আসলে মানুষ আজ নিজেই ঘুড়ি হয়ে ছুটছে উড়ছে জীবিকার জন্যে একটু সস্থির তাগিদে। কঠিন কঠোর এই বাস্তব আকাশে। আর কিছু ঝুনু কাকা ক্ষমতায়, লাটাই সূতো হাতের মুঠোয় নিয়ে খেলে চলেছে ভোকাট্টা খেলা।
চল তবু আজ আমরাও ঘুড়ি লাটাই হাতে তুলে নিয়ে ফিরে যাই শৌশবে। একবার চিৎকার করে বলে উঠি ভোকাট্টা।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।