T3 || ১লা বৈশাখ || বিশেষ সংখ্যায় গৌতম তালুকদার

প্রতিদান
লি-ও শোনা ও লি-ও শোনা কোথায় দুদু’টা কই বলতে বলতে ঘরে ঢোকে অমল।আজ অফিস থেকে বাড়ি ফিরতে অন্য দিনের তুলনায় প্রায়
ঘন্টা খানেক দেরী হয়ে গেল।রাস্তায় যানজট অফিসে কাজের চাপ। তবু যতোটা তাড়াতাড়ি
সম্ভব আসা যায় বাড়ির মুখ। মিষ্টির দোকান থেকে একপিস কালাকাঁদ সন্দেশ নিয়ে আসে। ও জানে আজ মান করে আছে চেঁচিয়ে বাড়ি
মাথ করেছে।সন্ধ্যা ছয়টার মধ্যে ওকে নিয়ে বেড়তেই হয় প্রতিদিনের এটাই রুটিন।
আমল একটি কুকুর পোষে পমেডিয়ান। লি-ও
ওর নাম । লি-ও যখন দেড় মাসের তখন থেকে ওদের বাড়িতে এখন ছ বছরের বেশী।
স্যারালাক ওয়ান জলে গুলিয়ে ফিডিং বোতলে খাইয়ে স্যারালাক টু, থ্রী শেষ হয়।ছোটো বেলায় কাঁচা শাক সবজি বেশ পছন্দ করতো।পাঁচ মাস বয়স হতেই দুধ খেতে পছন্দ করে।
ডাক্তারের কথা অনুযায়ী চিকেন আর চাল এক সাথে সেদ্ধ করে দুপুর,রাতে দিতে শুরু করে সেদিনের পরে কাঁচা শাক সবজি আর খায় না।
সকাল বিকেল একবার করে ওকে বাইরে থেকে ঘুরিয়ে আনতেই হবে এটাই ওর আবদার তখন পটি বাথরুম বাইরে সেরে নেবে।ঘরের একটি দেশলাই কাঠি ও নষ্ট করে না। সারা দিন ওর পছন্দের যায়গা বেছে নিয়ে নিজের মতো থাকে গরম একে বারেই সহ্য করতে পারে না আবার শীত কাতুরে।
সকালে ঘুরে এসে একটু দুধ বিকেলে ঘুরে এসে একটু দুধ এর বাইরে কোনো কিছুই খাওয়ানো
সম্ভব না, তবে ছানার সন্দেশ আইসক্রিম পেলে আনন্দে আত্মহারা লেজ ঘুড়িয়ে ঘুড়িয়ে নেচে নেচে দেখাবে কতো খুশি। আবার ভীষন মুডিও।
বাড়িতে আত্মীয় স্বজন কেউ এলে ওর জন্য ছানার সন্দেশ তাকে আনতেই হবে।ও যাদের চেনে তারা কেউ যদি ভুল করে না আনে তাকে
পাগল করে ছাড়বে তার ব্যাগ ঘেটে গায় উঠে এমন বকতে থাকবে কেনো ভুল হলো। মন খারাপ করে বসে থেকে ড্যাব ড্যাবিয়ে চেয়ে থাকবে অথবা মুখ গুঁজে। ডাকলেও নড়বে না সারা দেবে না।
বাড়ির মধ্যে কিছু একটা শব্দ হলো অপরিচিত লোক বাড়িতে ঢুকলো এমন চিৎকার শুরু করে দেবে চোর বদমাস পালাতে বাধ্য। তবে কাউকে
কামড়ায় না সে যদি ওকে দেখে কোনো প্রকার বিরক্ত,আঘাত বকা না দেয়।
ও থাকাতে যেমন অমলদের অনেক সুবিধা হয়
মাঝে মাঝে বিরক্ত লাগে ও একা ঘরে রেখে এক পা বেড়তে পারে না আবার ও থাকাতে পুরো বাড়ি তে যেনো একজন দক্ষ কেয়ার টেকার দেখভাল করার ভুমিকা পালন করে।তবে অমল অফিস যাবার সময়ে ও ঠিক বুঝতে পারে তখন
কোনো কথা নেই আসলে বুঝতে পারে পোষাক পরতে দেখেই। অফিসের কাজে কোলকাতার বাইরে থাকলে ভিডিও কল করলে ছুটে আসে
ফোনটা ওর কানের কাছে ধরে বাড়ির কেউ, অমনি কান নেড়ে আমলের কথার শুনছে সেটা
বোঝায় আসলে সমস্ত রকম অনুভুতি আছে সব বুঝতে পারে। অমলের বৃদ্ধ মায়ের সময় কেটে যায় লি-ওকে ঘিরে।বেশ মিষ্টি স্বভাবের কিছুটা চঞ্চল আবার অভিমানিও। ওর সময় জ্ঞান খুব প্রকট। ঠিক সময় মতো খেতে না দিলে ওকে খাওয়ানো খুব মুস্কিল । অমল অফিস থেকে যে টাইমে বাড়ি ফিরে ও ঠিক সে টাইমে অমলের আসার অপেক্ষায় সদর দরজার কাছে ঘুরঘুর
করতে থাকে। অমল যে আসছে বেশ কিছুটা দুরে আছে বুঝতে পারে। আর তখন থেকেই ব্যাস্ত হয়ে ওঠে বাইরে যাবে বলে কিন্তু আজ
ফিরতে বেশ দেরী হওয়াতে চেঁচিয়ে বাড়ি মাথায় করে অভিমানে মুখ গুঁজে কোন ঘরের কোনায় ঢুকে আছে সেটা অমল বুঝে উঠতে পারছে না।
কোনো ঘরে মুখ গুঁজে বসে আছে অভিমান করে তাই অমল সন্দেশটা হাতে নিয়ে ডাকা বাকি করছে কিন্তু ওর কোনো সারা শব্দ নেই।
অন্য দিন সামান্য সময় দেরী হলেই অমলকে ঘরে ঢোকার অবকাশ দেবে না। ব্যাগটি রেখেই ওকে নিয়ে বেড়তে হয়। সকাল বিকেল যখনি ঘুরতে বেড়বে ও কিন্তু বাড়িতে ফিরে এসেই ঘরে ঢুকে পরবে না।নিজেই গিয়ে দাঁড়াবে বাথা রুমের কাছে। ভালো করে পা ধুইয়ে পটি যায়গা ধুইয়ে মুছিয়ে দেবার পরে ঘরে ঢুকে যাবে। অমলদের বাড়ির কোনো সদস্য যদি রাতে ফিরতে দেরী করে তাহলে ও তার না ফেরার জন্য অস্থির হয়ে
ওঠে এমনকি বার বার ঘর বারান্দা করতে থাকে সে এলে তবেই ওর শান্তি। পরিবারের যদি কেউ কারো সাথে তর্কবিতর্ক করে অথবা বড় কেউ ছোটদের দুষ্টুমির জন্য তাকে বকে শাষন করে লি-ও তার প্রতি ভীষণ রেগে গিয়ে তাকে তাড়া করবে। বিশেষ করে ওর সামনে কোনো বাচ্চা বা
ছোট ছেলে মেয়েকে কিছু বলা যাবে না। ছোট
ছোট বাচ্চাদের খুব পছন্দ করে।বেশ কিছু দিন
আগের কথা।অমলের পাশের বাড়ির একজন তার ছেলেকে খুব মেরেছিলো দুষ্টামি,পড়াশোনা না করার কারণে, লি-ও দেখেই ভীষন চিৎকার
করতে থাকে পারলে ছুটে গিয়ে ভদ্রলোক কে কামড়াতে যায় যেন ওর নাগালে পেলে দেখিয়ে
দেবে মজা।সেই থেকে যখনি লি-ও ভদ্রলোককে
দেখে তখনি চেঁচিয়ে ওনার দিকে তেড়ে যায়। অবশ্য অমলরা ওনাকে দেখামাত্রই লি-ওকে আড়াল করে।
আমলদের পাড়া এবং বাজারের বেশীর ভাগ মানুষ লি-ওকে খুব পছন্দ করে ভালোবাসে।বিশেষ করে সকালে যখন বাজার করতে যায় ওতো অমলের সাথেই থাকে দুধওয়ালা থেকে মাছ,সব্জি ওয়ালা একদিন ওকে না দেখলেই জানতে চাইবে জিজ্ঞাসা করবে,সে কোথায় আজ এলো না কেন? ভালো আছে কিনা।
লি-ও সাইজে ছোট এবং খুব সুন্দর আর্কষনীয় ।অমলদের আসে পাশে লি-ও র মতো আর একটি দেখা যায় না। বিশেষ করে অল্প বয়সী ছেলে মেয়েদের খুব পছন্দের।এমনো দেখা যায়
সকালে বিকেলে পার্কে মাঠে ঘুরতে গিয়ে যাকে ভালো লাগে সে অপরিচিত হলেও ও তার সাথে ভাব জমায় আবার কাউকে পছন্দ না সে কাছে এসে দাঁড়াতেই বিরক্ত প্রকাশ করবে। আসলে যারা ডগ লাভার তারা ভালো ভাবেই জানেন যে এদের ঘ্রাণশক্তি এতোটাই প্রক্ষর যে মানুষের চোখের দিকে তাকিয়ে শরীরের গন্ধেই বুঝতে পারে তার মতলব।বিশেষ করে যারা ডগী পোষেন তাদের গায়ের গন্ধ পেয়ে ও তার সাথে মিশতে চায় আবার অনেকে ক্ষেত্র এর বিপরীত দেখা যায়। অবশ্য এর ব্যাতিক্রম ও কিছু পোষ্য
আছে যে গুলো হিংস্র স্বভাবের।যে গুলোকে শুধু বিশেষ বিশেষ কাজের জন্য পোষা হয় এবং সেই ভাবে প্রশিক্ষণ দিয়ে তৈরী করে নেওয়া হয়।যাই
হোক অনেকের এদের অপছন্দ, আড়ালে বলে, বলতে শোনা যায় মানুষ খেতে পায় না আর এরা কুকুর পোষে বড়লোকি চাল চেলে ঘুরে বেড়ায়
ফুটানি দেখায় অথচ অসহায় মানুষের পাশে
দাঁড়ানোর এতো টুকুও মন মানষিকতা নেই। সহযোগিতাও করে না। কুকুরের জন্যে কতো দরদ যত সব আদিক্ষ্যতা। মানুষ হয়ে মানুষের উপকারে নেই স্বার্থপর পাষন্ড লোক সমাজের ।
তবে এসব কথায় কুকুর প্রেমিদের কিছুই এসে
যায় না।ওদের হিংসে,জেলাস বলা যেতে পারে।
অমলের চেনা জানা একজন নিঃসন্তান দম্পতী তাদের একটি বিদেশী কুকুর আছে।কুকুরটি ওদের স্বামী স্ত্রীর এতোটাই প্রিয় যে নিঃসন্তান হবার যন্ত্রণার অনুভূতি কষ্ট কিছুটা হলেও ভুলে থাকতে পারেন।ওদের একমাত্র সান্তানের অভাব ছারা কোনো কিছুর অভাব নেই বলেই একটি
অসহায় গরিব প্রতিবেশী একজনের ছেলেকে
নিজের ছেলের ভেবে ওর পেছনে সমস্ত রকম খরচ বহন করেছেন ছেলেটির স্কুলের সময় থেকে এমনকি ছেলেটির চাকরির পাবার পেছনে ভদ্রলোকের অনেক অবদান। ছেলেটি এখন
সরকারি কর্মচারি বিয়ে করে সংসার করছে মাহা আনন্দে। অমল লি-ওকে সংগ্ৰহ করে ওনার
মাধ্যেমেই । ওরা স্বামি-স্ত্রী বার্ধক্য জনিত কারনে বিছানায় ওদেরকে একটু দেখার মতোও কেউ
নেই।ছেলেটি বা ওর বাড়ির কোনো লোক একটু ডেকেও খোঁজ খরব নেয় না ঝামেলা মনে করে।
কুকুরটির এখন অনেক বয়স হয়ে গেছে। তবুও ওদের টেক কেয়ার করেই চলছে এমন কি সারা
রাত ওদের বিছানার পাশে বসে রাত জাগে।কোনো কোনো দিন কুকুরটির খাবারও জোটে
না ঠিক মতো। স্বামী-স্ত্রী দুজনের শরীর খারাপ লেগেই আছে।বেশ কিছু দিন হলো ভদ্রলোকের স্ত্রী বিযোগ হয়েছেন।কুকুরটি ওর পালিত মায়ের শোক ভুলতে না পেরে খাওয়া প্রায় ছেড়ে দিয়ে
বিছানা নিয়েছে। ভদ্রলোক চেষ্টা করেছিলেন কুকুরটিকে কোথাও রেখে দিতে যাতে করে ওর খাওয়া দেখাশোনা ঠিক মতো হয়। একজন মহিলা রাজিও হলেন বেশ কিছু টাকা পাবার আশায় কিন্তু জোড় করে কিছুতেই ওকে রাখা গেল না। শেষে মহিলা বাধ্য হয়ে একদিন পরেই টাকা সমেত ফিরত দিয়ে গেলেন।
ঘরের দেয়ালে টানানো ভদ্রমহিলার ছবির দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে রিজু দু’চোখে
অনবরত জলের স্রোত।ভদ্রলোক ভাবে ওনার আগে যদি রিজু চলে যায় তাহলে মৃত্যুর কাছে
কৃতজ্ঞ থাকবেন মানুষ নামের দু’পেয়ে জীবের কথা মনে রেখে।
অমল এর মধ্যেই একদিন ভদ্রোলোকের খোঁজ
নিতে যায় ওর বাড়িতে বাইরে থেকে ডাকাডাকি করেও কোনো কোনো সারা শব্দ না পেয়ে দরজা
ধাক্কা দিতেই দরজা খুলে যায় দেখে রিজু আর ভদ্রলোক একে অপরের গায়ে গা লাগিয়ে পড়ে আছে ঘরের মেঝেতে।অমল দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে ডায়াল করে একশত নাম্বারে।