|| সাহিত্য হৈচৈ – সরস্বতী পুজো স্পেশালে || গৌতম বাড়ই
by
·
Published
· Updated
দিদা
( স্মৃতিকথা অথবা নিছক একটি গল্প )
অনেক বড় হয়ে যখন পিছন ফিরে চাই, তখন ফেলে আসা সেইসব দিনের কথা খুব মনে পড়ে। মনে হয় এই তো সেদিন, অথচ ঠিকঠাক হিসেব করতে গেলে ফেলে আসা সেই দিনগুলি মানে অনেকগুলো দশক আগে, অনেকগুলো বছর। বাতাসে এখনও তার গন্ধ লেগে আছে। সরস্বতী ঠাকুর মানে আমাদের বিদ্যার দেবী। এখন তো প্রায় সবাই পড়াশোনা করে, গ্রাম-গঞ্জে কত সুন্দর সুন্দর স্কুলবাড়ি দেখতে পাই। কী সুন্দর রঙচঙে সেজে উঠেছে। তাদের স্কুলের ভেতর আরও সুন্দর সবুজ মাঠ। দেখেই একটা ফুটবল নিয়ে নেমে পড়তে ইচ্ছে করে। শহরেও তখন এত সুন্দর স্কুল দেখা যেত না। সেই বালকবেলায় ফিরে যাই যেন। তো হচ্ছিল সরস্বতী ঠাকুর নিয়ে কথা। সেখানেই ফিরে আসি।
জানতো, আমাদের সেইসময় বার্ষিক পরীক্ষা হত এই দুর্গাপূজা আর পুজোর ছুটি শেষ করে ভাইফোঁটার পর স্কুল খুলে গেলেই। একটা মাস-ও সময় পেতাম না। কী পড়বার ধুম পাড়ায়-পাড়ায় তখন। সারা পাড়াটা গমগমে সকাল আর সন্ধে পড়া মুখস্থ করবার তোড়জোড়ে। এখন তোমরা তো সবাই মনে-মনেই বইয়ের টেক্সট দেখ, তোমরা আশ্চর্য হবেই। আর ঐ সময়টা যদি কোন এক সময়ের যানে মানসলোকে ভেসে গিয়ে দেখতে পেতে, তাহলে বাবা-কাকা-মা- মাসি- পিসী- মামা ইত্যাদিদের পাগল ঠাওড়াবে। সারা পাড়া সরগরম! কোন ঘর থেকে ভেসে আসছে ” কুমোরপাড়ার গোরুর গাড়ির- হাট বসেছে শুক্রবারে বা কোথাও কাল ছিল ডাল খালি। ধনধান্যে পুষ্পে ভরা আবার কোনো এক ঘরের থেকে ভেসে এলো। কেউ পড়ছে- কোন দেশেতে তরুলতা, আবার কেউ পড়ছে- দূরে দূরে গ্রাম দশবারো খানি এইসব। কেউ সালোকসংশ্লেষ কাকে বলে? কেউ নিউরন কী? পড়ছে। কেউ মোগল সাম্রাজ্যের পতন আবার কেউ চন্ডাশোক কী করে ধর্মাশোকে পরিণত হলেন? ” সাহিত্য, ইতিহাস, ভূগোল, বিজ্ঞান সব মিলেমিশে একাকার হয়ে যেত পাড়ায়- পাড়ায় ঐ নভেম্বরের শীতের সন্ধ্যায়।
ডিসেম্বর শুরুতে বা নভেম্বরের শেষে বার্ষিক পরীক্ষা, তারই প্রস্তুতি চলছে। দুর্গাপূজার নবমীর রাত থেকেই বিখ্যাত কবি ও ছড়াকার সম্ভবতঃ নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর একটি ছড়ার দুটো লাইন খুব মনে পড়ত —–” সরস্বতীর দিকে যেই দৃষ্টি আমার পড়ে। বুকটা আমার তখন কেমন ধড়পড় করে”। স্মৃতির ঝাঁপি থেকে বললাম, তাই মূল জিনিসটা জানালাম, হয়ত কিছু ভুল থাকতেই পারে। কেউ পুরোটা জানালে খুব ভাল লাগত। এ প্রসঙ্গে মনে পড়ে গেল আরও একটা ছড়ার কথা, “মা দুর্গার ছেলেমেয়েগুলো বড্ড বেশি হ্যাংলা, একবার আসেন মায়ের সাথে, একবার আসেন একলা”। তো বিদ্যার দেবীও আসতেন সেই একলা আর একবার। জানুয়ারী মাসের শেষ থেকে ফেব্রুয়ারী মাসের মাঝ বরাবরের মধ্যে। মাঘী শুক্লা পঞ্চমী তিথিতে। তবে কিছু বিধিনিষেধ নিয়ে। টোপাকুল বা নারকেলী কুল কিছু খাওয়া চলবে না যতক্ষণ না বিদ্যার দেবীর পুজোর থালায় কুল দিয়ে পুজো হচ্ছে। খেলেই সর্বনাশ! বিদ্যার দেবী সরস্বতী সব দেখতে পান আড়ালে থেকেই আর তারপর পড়াশোনার বারোটা বাজিয়ে ছাড়বেন। আর এই কুল নিয়েই আমার বিলকুল এই স্মৃতিকথা।
তোমাদের যেমন বন্ধু আছে, ছোটোবেলায় আমারও ওরকম কত বন্ধু ছিল বা এখনও তাদের কেউ বন্ধু হয়ে আছে। খুব মনে পড়ে তাদের কথা। তা আমার এক প্রিয় বন্ধু নাম তার কমল। আমরা দুজনে প্রতিবার মা সরস্বতীর ঐ বিচ্ছিরি নিয়ম বা বিধিনিষেধ খুব গোপনে- গোপনে ভাঙ্গতাম। শীতের টোপাকুলের কাঁহাতক আর লোভ সামলানো যায়? আবার সেই টোপাকুল, গাছ- ঝাঁকিয়ে পাড়া। আমরা শহরে বড় হয়েছি কিন্তু তখনকার শহরগুলোতে প্রতিটি পাড়া গাছময় ছিল। প্রায় বাড়ি ছিল অনেকটা জায়গা নিয়ে। কারণ তোমাদের এখনকার মতন নয়, অনেক ভাইবোন, কোথাও জ্যাঠতুতো, খুড়তুতো ভাইবোনের মহা- পরিবার। সব একসাথে বড় হয়ে উঠত এই এক বাড়িতে। এই দেশলাই খোপের মতন বাড়ি তিনতলা- চারতলা অট্টালিকার মতন নয়। তোমরা যারা এখন মহকুমা শহর, জেলা শহর বা বড় শহরগুলোতে বড় হচ্ছ দেখতে পাও কিংবা বাস কর, তারা কল্পনাতেই আনতে পারবে না। আমাদের পাড়ায় একটা ভূতের বাড়িও ছিল। তবে এখানে নয়, পরে অন্য কোথাও বলব। পাড়ায় একটা সুন্দর কাঁচে ঘেরা, কাঠের আর টিনের চার- চালার বাড়ি ছিল। অনেক জায়গা ঐ বাড়িতে। ছোট্ট একটা পাঁচিল আমরা সুবোধ ছেলেরা অনায়াসে টপকে যেতাম। তবে আমি আর কমল ঐ বাড়ির পাঁচিল কোনদিনও টপকাই- নি। ঐ বাড়ির মালিক ছিল এক দিদিমা। আমরা তাঁকে দিদা বলে ডাকতাম। আমি আর কমল ঐ দিদার খুব স্নেহের পাত্র ছিলাম। দিদার বাড়িতে জাম্বুরা ( বাতাপি লেবু), কাঁচামিঠে আম, জাম, জামরুল, আঁতা এইসব ফলের আর আমাদের প্রিয় একটি টক- মিষ্টি ইয়াব্বড় সাইজের টোপাকুলের গাছ ছিল। শীতের শুরু থেকেই নজর। দিদা একমাত্র অনায়াসে এই বাড়ির সীমানার ভেতর ঢুকতে দিতো আমাদের দুই বন্ধুকে। কুল পেকে এলেই আমি আর কমল গাছ ঝাঁকিয়ে ব্যাগ ভর্তি কুল নিয়ে আসতাম। কিছু গুন্ডা আর মাস্তান টাইপের বন্ধু থাকেই, তোমাদেরও আছে। যাদের একটু সমঝে চলতে হয়, আড়ালে আবডালে দাঁড়িয়ে থাকত। ওদের তা থেকে গুন্ডা ট্যাক্স দিতে হত। তারপর যা থাকত খেয়ে-দেয়ে চুপিসারে বাড়ি নিয়ে যেতাম, মা কুলের ব্যাগ নিয়েই তিনসত্যি স্বীকার করাতো– সত্যি করে বল, কুল মুখে দিসনি তো? আমিও অবলীলা ক্রমে বলে দিতাম- না একদম মুখে দেইনি। মাথা খারাপ। সামনে সরস্বতী পুজোর অঞ্জলী দেব, তারপর খাব। তিনসত্যি করছি মা। আজও জানিনা ঐ তিনসত্যি কী কী? কমলও ওর মায়ের কাছে তাই করতো।
দিদা ঐ অত বড় বাড়িতে একলাই থাকতেন। আর বীরসা বলে একটা লোক থাকত। ঐ নাকি দিদার বাড়ি আর দিদাকে দেখভাল করত।
তবে মাঝে- মাঝে দেশে চলে যেতেন বীরসা, ছোটোনাগপুরে। তখন দিদা একলাই থাকতেন। দিদা আমাদের ডেকে নিয়ে গল্প করতেন কখনও। বলতেন- তোরা জানিস আমার ছেলে- মেয়েরা সবাই বড় বড় ডাক্তার, প্রফেসর। সবাই বিদেশে থাকেন। তোদের দাদু ছিলেন চা- বাগানের ডাক্তার। উনি মারা গিয়ে আমায় একলা এই বাড়ি পাহারা দিতে রেখে গিয়েছেন। আমার ছেলেমেয়েরা আমায় জানিনা কবে আমায় এখান থেকে না তুলে নিয়ে গিয়ে বিদেশে রাখেন! তখন তোরা দু- জনে আমার এই ফলের বাগানটা দেখবি। বাদবাকিগুলো সব বদমাশ। তোদের চোখমুখ দেখলেই মনে হয় তোরা খুব ভাল ছেলে। ঐ জন্যে তোদের আমার বাড়ির ভেতরে ঢুকতে দেই। দিদা আরও বলতেন তোদের মতন আমার নাতি নাতনীগুলো। এই বয়সী। দিদা আমাদের এক নাতির রঙীন ফটো দেখিয়েছিল। আমরা অবাক হয়ে দেখেছিলাম, কারণ তখনও আমাদের দেশে সাদাকালো ফটো। ডেভেলপড্ করা রঙীন ফটো আসেনি। কালার ফিল্ম আসেনি। তবে মনে- মনে বলতাম- দিদা চোখমুখ দেখে তোমার দেখাটা কিন্তু ভুল। ভাল ছেলেমেয়ে বা খারাপ ছেলেমেয়ে বলে আজও কোন সংজ্ঞা বেরোয় নি। আমরা সবাই ভালো ছেলেমেয়ে। তাই না? আমরা চুপিসারে ঘরের বাইরে দুষ্টুমি করতাম আর তোমরা ঘরের ভেতরে। একটু দুষ্টু- দুষ্টু না করলে ছোটোবেলা হবে না তো! তবে দিদার ঐ বিশ্বাস, আমাদের খুব মনে খুব আনন্দ দিত। আমরা যতটা পারি দিদার ফলগাছগুলো যত্ন করতাম। জল দিতাম, মাটি দিতাম,যতটুকু পারি পাহারা দিতাম। দিদাকে পাড়ার অন্য লোকেরা খুব দেমাকী অহংকারী ভাবতেন, উনি কারও সাথেই বেশি গা লাগিয়ে কথা বলতেন না। সারাদিন বই নিয়ে বসে থাকতেন বাড়ির ঘেরা কাঁচের বারান্দায়।
তারপর এক শীতের শুরুতে দেখলাম দিদার বাড়ির দরজা বন্ধ। মাঝে- মাঝে দিদার বাড়ি যাই, বাইরে দিয়ে ডাকি দিদা দিদা করে, কোন সাড়া পাইনা। কুলের রঙ সবুজ থেকে লাল হয়ে আসছে। টোপাকুলে ভরে উঠছে গাছ। বাড়িঘর অপরিষ্কার হয়ে গেল, কাঁচের ঝকঝকে ভাব কেটে গিয়ে ধূসর রঙা। জানালায় মাকড়সার জাল। গেটের কাছে দাঁড়াই দুইবন্ধু প্রায়। মনে প্রশ্ন জাগে, দিদা আমাদের কিছু না বলেই চলে গেল? কোথায় গেল? সেই বিদেশে, আমেরিকায়? কুল গাছের দিকে তাকাই আর ফিরে আসি।
এইভাবে একদিন দেখতে পেলাম বাড়িঘরদোর সাফাই হয়েছে। জানালা পরিষ্কার হচ্ছে। তবে দিদাকে দেখতে পেলাম না। কয়েকটা দিন পরে আমি আর কমল ঠিক করেই নিলাম আজ দিদার বাড়ি গাছ ঝাঁকিয়ে কুল পাড়বো। টোপাকুলে ভরে উঠবে গাছের তলা। আমরা কুড়িয়ে নেব সেই দেদার কুল। দিদার বাড়ির গেটে এসে দিদাকে ডাকলাম অনেক করে। তারপর সেই ছোটো পাঁচিল ডিঙ্গিয়ে যেই দুজনে ভেতরে ঢুকেছি, অমনি কোথা থেকে এক ষন্ডামতন লোক এসে আমাদের দুইবন্ধুকে পাকড়াও করল। বাপরে কী অসুরের শক্তি। মনে হচ্ছিল হাতগুলো ভেঙ্গেই যাবে। তিনি বলেই উঠলেন- বহু দিন ধরে খেয়াল করছি তোদের দুই বিচ্ছুকে। আমিও ঘাপটি মেরে ছিলাম। আমার এই কুলগাছে নজর করতে দেখেছি। দিদা দিদা- এই বলে ভেঙ্গিয়ে উঠলেন। কোনো দিদা- টিদা নেই। ওসব ভ্যানিশ। এখন এটা আমার বাড়ি।
আমরা নিজের কানমুলে এটা-ওটা বলে নিস্তার পেলাম ঐ রাক্ষসের মতন চেহারার লোকটি থেকে। পরে বড় হয়ে অস্কার ওয়াইল্ড- র “সেলফিস জায়েন্ট” গল্প পড়তে গিয়ে ঐ দৈত্যের মধ্যে এর চেহারা দেখতে পেতাম। আর ভাবতাম এক- একজনের দেখার চোখ কত আলাদা! দিদা আমাদের খুব ভালো ছেলে ভাবতেন, এ ভাবে আবার বিচ্ছু। আসলে শয়তান লোকেরা সবাইকে নিজের মতন ভাবেন। আমরা কাঁদতে বাকি রেখেছিলাম। কোনমতন ছাড়া পেয়ে বাড়ি ফিরে আসি।
তখন রাতের অন্ধকারে বাড়ি থেকে বসে, শিলিগুড়ি থেকে রাতের তিনধারিয়া আর কার্শিয়াং শহরের আলোর জোনাকি দেখা যেত। অদ্ভুত সেই মায়াবী জগত। হেড- লাইট জ্বালিয়ে গাড়ি নামত তাও বোঝা যেত। বাইরে কুয়োতলা থেকে তাই দেখছিলাম। মনে হচ্ছে আকাশ কাত করে তারারা মিটিমিটি জ্বলছে ঐ দূরে। আমার চোখ বেয়ে জলের ধারা নামছিল। ঐ কুলের জন্য নয়, দিদার জন্য আর দিদার ঐ বাড়িটির জন্য। আজ সেইসব বাড়ি আর নেই। নিজের শহরে গেলে দিদা আর তার বাড়ির কথা আজও মনে পড়ে। তবে মেলাতে পারিনা আর সবকিছু। ওখানে ঐ জায়গাতে আজ বহুতল দাঁড়িয়ে আছে। দিদার কথা খুব মনে পড়ে, আজও সরস্বতী পুজো যখন এসে পড়ে বছরে- বছরে এই শীতের কোন এক সকালে।