ছোটদের জন্যে বড়দের লেখায় গৌতম বাড়ই (ধারাবাহিক গল্প: পর্ব – ১)

ছুপুখরীর কোঠীবাড়ি

পাহাড়ী পথটা এঁকেবেঁকে পাইন আর পাহাড়ি ঝাউ কিছু,কিছু ধূপী গাছের জঙ্গল বেয়ে ঘাস লতা পাতায় শ্যাওলা স্যাঁতস্যাঁতে পায়ে হাঁটা পথে ছুপুখরীর চড়াইয়ে উঠে গিয়েছে।

আমার সাথে পুরন ছিলো।পুরনদের বাড়ি ঐ ছুপুখরীর মাথায়।পুরনদের বাড়ি আজ রাতটা থাকবো।পুরন আমার স্কুলের বন্ধু।এক শনিবারের সকালে কার্শিয়াং থেকে ওদের বাড়ি আসি।বেলা তখন দেড়টা দুটো হবে।জঙ্গলে শেষ বিকেলের অন্ধকার।পুরন বলেছে ফ্রেন্ড একটাই এ জঙ্গলে ডর আছে ভাল্লুর।তবে এখন দেখাই যায় না।আমার বুঢ্ঢাবাবা ভাল্লুকে চারবছর আগে এই জঙ্গলের কোঠীমোরে দেখেছিলো।তারপর আর শুনি নাই।

তবে ছুপুখরীর যে টানে এখানে আসা সেই কোঠীবাড়ির রহস্যরাত দেখবো বলে।পুরনের মুখ থেকে শোনা।যখন ব্রিটিশরা আমাদের দেশ শাসন করতেন তখন পাহাড়ের গায়ে অনেক সাহেব এমন বাড়ি করে থাকতেন।ইউরোপীয় আবহাওয়ার সঙ্গে এই দার্জিলিং পাহাড়ী অঞ্চল বেশ মানিয়ে যেতো ব্রিটিশদের কাছে আর হিমালয়ের বরফ ঢাকা পর্বত শৃঙ্গের অপরূপ দৃশ্যতো ছিলই।সোনাদার আপার জনসন হাট্টায় এরকম এক সাহেবের বাড়ি আমি দেখেছি পরে কোনো এক সময়।টুঙ কালিম্পঙ কার্শিয়াং পাহাড়েও আছে এরকম সাহেবদের ফেলে যাওয়া বাড়ি।আমরা যখন পায়ে হেঁটে উঠছি সেই জঙ্গলের ভেতর দেখলাম গাছের গায়ে সেঁটে রয়েছে দুটো লোক।লেদারের জ্যাকেট পড়া।হাতে দস্তানা।পায়ে জঙ্গলী বুট।পুরন কে নেপালী ভাষায় জিগ্গেস করলেন-কে তুমি?পুরন উত্তর দিলো।ওরা আবার বললেন-সঙ্গে কে?পুরন বললো।ওরা বললেন-বেলা হয়ে আসছে তাড়াতাড়ি যাও।
পুরনকে বললাম-চিনিস ওদের?

ও না বললো কিন্তু এও বললো খুব সন্দেহজনক ওরা।বাড়িতে আমার বাবা,বুঢ্ঢা বাবা আর মাকে বলতেই হবে।এমন সময় দূর থেকে ওদের চিৎকার করে কথার আওয়াজ পেলাম আমাদেরকে বলছে-তোরা বাড়িতে আমাদের কথা কিছু বলবি না।তাহলে বহুত খারাপ হবে।

আমরা পা চালিয়ে তাড়াতাড়ি চললাম।বাসরাস্তা থেকে এই পাহাড়ী পথে ছুপুখরী দুকিলোমিটার মাত্র তবে পুরোটাই খাড়াই উঠতে হয়।ঐ জন্যে আর সঙ্কীর্ণ দূর্গম পাহাড়ী রাস্তা বলে সময় লাগে খানিকটা।ছুপুখরী একটু বাদেই পৌঁছালাম।গুণে গুণে এখান ওখান মিলিয়ে গোটা দশ বারো বাড়ি।
পুরনের বাবা মা দাদু আমাকে জড়িয়ে ধরে অনেক আদর করলেন।পুরন ওর ঘরটা দেখালো ওখানেই আমরা দুজন থাকবো। ছোট্ট অথচ কী সুন্দর ওর ঘরটা ।একটা ডাবল খাটের সাইজের একটু বড়।স্বচ্ছ বড় কাঁচের জানালা।নিচে কার্পেট পাতা।একটু উপরেই বিকেলের শেষ আলোতেও ছুখুপরীর সাহেব কোঠী স্পষ্ট দেখলাম পুরনের ঘরের জানালা দিয়ে।রঙচঙ উঠে গিয়ে ঐ কোঠীবাড়ি আরও রহস্যময় লাগছে।

ছুপুখরীর অনেক গল্প শুনলাম।রাতে মোমো থুকপা খেলাম‌।কী সুন্দর করে ওদের ডাইনিং টেবিলে সাজিয়ে পুরনের মা আন্টি আমাদের খেতে দিলেন।সেইসময় কলকাতায় ওদের মতন ইওরোপীয় কালচার আমাদের মতন সাধারণ মধ্যবিত্তের বাড়িতে পয়সা থাকলেও চল ছিলনা।বাবা মায়ের কাছ থেকে অনেক কষ্টে কথা আদায় করে স্কুল থেকে পারমিশন নিয়ে পুরনের বাড়িতে আসা।এসে যে কী ভালো লাগছে,ভুল করিনি বুঝলাম।তবে ঐ কোঠীবাড়ির রহস্যই আসল।

ঘুমোতে গেলাম দুই বন্ধু।আন্টি আমাদের লেপ চাপা দিয়ে গেলেন।সেপ্টেম্বরের শেষ।কলকাতায় হয়তবা লোক তখন খালি গায়ে ফুলস্পীড পাখা চালিয়ে ঘুমাচ্ছে।বেশ ঠাণ্ডা।রেডিয়ামের আলোয় আমার সদ্য পাওয়া HMT বাহাদুর হাত ঘড়িতে দেখলাম এগারোটা বাজে।গভীর রাত তখন পাহাড়ে।বাড়ির সবাই গভীর ঘুমে।আমরা দুই বন্ধু পায়ের দিকে জানালার পর্দাটা খানিকটা সরালাম।পুরন বললো ফ্রেন্ড ঐ দেখ কোঠী বাড়িতে আলো জ্বলছে।হলদে টিমটিমে আলো।কান পেতে রইলাম হাঁ, একটা অদ্ভুত আওয়াজ ভেসে আসছে ওপর থেকে।কোঠীবাড়ির সামনেটায় কিছু ঝোপঝাড় ছিলো।রাতের অন্ধকারে লাল নীল সবুজ আলোর ঝলকানি দেখলাম ওখানে।তারপর কিছুক্ষণ চুপচাপ।কতক্ষণ জানিনা কিন্তু এবারে পাহাড়ের ঝোপঝাড়ে ধুপধাপ দৌড়ে যাওয়ার আওয়াজ পেলাম।আমরা একটু খানিক পর্দা সরিয়ে দেখছি।ভয়ে পুরনের হাত শক্ত করে ধরে আছি আর ও আমার হাত।কী করি!

এতো কিছু ঘটছে পুরনদের বাড়ির কাছেই আমার বিস্ময় জাগছে ওদের বাড়ির বড়রা কেউ কি কিছু টের পাচ্ছেন না?কোঠীবাড়ি তো মেরেকেটে সোজাসুজি গেলে এই বাড়ি থেকে এক দেড়শো মিটার হবে।তবে?এবারে জানালা দিয়ে দেখলাম সব আলো নিভে গেল।পৃথিবীর অন্ধকারের হাল্কা আলোয় দেখলাম কিছু সাদা সাদা ছায়ামূর্তি কোঠীবাড়ির ওপর থেকে পাহাড়ি পথে নেমে আসছে এদিকে।আমরা দুজনে ভয়ে লেপমুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লাম আর কান পেতে রইলাম।আমাদের কলকাতার বাড়িতে জানালায় যেমন গ্রীল রয়েছে এখানে তো তার কিছু নেই।অনায়াসে যে কেউ জানালার কাঁচ ভেঙ্গে ঘরে ঢুকতে পারবে।সত্যি ঐ বয়সে বেজায় ভয় করতে লাগলো।আমার চিরদিন সাহস খুব কম আবার রহস্য টানেও বেশি।
কী করতে যে এলাম এখানে!

এখানের কোন বাড়িতেই পাঁচিল নেই।কোঠীবাড়ির রাস্তা পুরনদের বাড়ির পাশ দিয়েই গিয়েছে।একটা খিনখিনে গলায় মনে হলো কেউ যেন বলছে জানালার পাশ দিয়ে–আমি ডরপুক বাচ্চাদের খু-উ-ব ভালোবাসি।ভয়ে আমি কাঁটা।আমি ক্লাস ইলেভেনে পড়ি তাই আমাকে বাচ্চা কিন্তু বলা যায়না।পুরন চাপা স্বরে আমায় বলছে–আমাদের জানালা পর্যন্ত ওরা চলে এসেছে।আমি কথা না বলে চুপটি করে আছি।পুরন মা মা করে চেঁচিয়ে উঠলো।

সারাঘরে এক এক করে আলো জ্বলে উঠলো।পাহাড়ের উঁচুতে হলে কী হবে সেইসময় বিদ্যুত ঠিক চলে এসেছিল এই ছোট্ট জনপদে।মা,ওর বাবা, বুঢ্ঢাবাবা, বাইরের দিকে ঘরে ছিলো এক কাকা।সব পরিবারের সদস্য ঐ রাতে হাজির। হঠাৎ দেখলাম ঘরের আলোতে সেই কোঠীবাড়ির রাস্তার দিকে ওর কাকা সাদামতন একটা কুকুরকে তাড়া করলো লাঠি নিয়ে।দৌড়চ্ছে ওর পেছনে।আমরাও ছুটে বাইরে এলাম।কাকা পেছনে আর সামনে কুকুরটি।আস্তে আস্তে দুজনে অন্ধকারে মিলিয়ে গেলো।সবকথা বড়দের বললাম।ওরা বললেন-এই কোঠীবাড়িতে আজ প্রায় এক বছর হতে চললো একটা কিছু রাতে ঘটছে।তবে পুরনের চোখে বেশি ধরা পড়ছে এই রহস্যময় কোঠীবাড়ি কারণ ওর ঘরের জানালা দিয়ে তাকালে কোঠীবাড়ি বেশি নজরে পড়ে।ছুপুখরীর জঙ্গলেও দুজন বদমাশ লোককে এখানকার কয়েকজন দেখেছে।তবে কেউই তো আর জঙ্গলের ভেতর দলবেঁধে যায়না।তাই ওরাও ঐ এক দুজনের চোখে ধরা পড়েছে আর পালিয়ে গিয়েছে।পুরন আর আমি এ ওর দিকে চাইলাম।

হঠাৎ দুর থেকে ভয়ানক আওয়াজ ভেসে এলো- তোমরা সবাই এদিকে এসো জলদী।কোঠীবাড়ির অন্দরে আদমী আছে।পুরনের কাকা কোঠীবাড়ি থেকে ডাকছে বাড়ির লোকেদের।দেখলাম বুঢ্ঢাবাবা খুকরী নিয়ে আর পুরনের বাবা লাঠি নিয়ে ওদিকে ছুটে গেলো।আমরাও ছুটলাম পেছনে।

তারপর যা দেখলাম ওখানে গিয়ে তার জন্যে আমরা কেউ প্রস্তুত ছিলাম না।

ওর কাকা ভয়ে জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।সামনের দিকে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে আমাদের।একজন বিদঘুটে লোক গা দিয়ে জঘন্য গন্ধ বেরুচ্ছে ঐ সাদা কুকুরটার পেট চিরে খাচ্ছে নাড়িভুড়ি রক্ত।কোঠীবাড়ির বারান্দায়।ছুপুখরির অন্যান্য বাড়ির লোকেরা আর সেই দু’জন বদমাশ লোক যারা জঙ্গলের মধ্যে দেখা দিয়েছিল, আমাদের প্রত্যেক কে কোঠীবাড়ির ভেতর থেকে অজ্ঞান অবস্থায় উদ্ধার করে। বেঁচে ফিরি বাড়িতে।

এবারে দু-একটা ধোঁয়াশা তোমাদের মনে থাকবেই।আমাদের ভয় দেখালো কে?জানালাতে।ঐ দুজন বদমাশ লোক কে?কোঠীবাড়িতে হঠাৎ করে ঐ রহস্যের আবির্ভাব হলো কী করে? শয়তান আসলে কে?

সবকিছুর উত্তর পরে আমি জেনেছিলাম।তোমাদের ভালো লাগলে জানিও।আমিও তোমাদের জানাবো।
আজও সেই কোঠীবাড়ি আমার মনে সেই রহস্যের জাল বোনে!

চলবে

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।