গারো পাহাড়ের গদ্যে এনাম রাজু

অমিত্রাক্ষর ছন্দ ও কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত

বাংলা সাহিত্যে কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত একটি নক্ষত্রের নাম। যে নক্ষত্রের পতন নেই। বাংলা সাহিত্যের যে শাখায় যখন হাত রেখেছেন সেখানেই ফলিয়েছেন সফলতার ফসল। সে কবিতা হউক আর নাটক হউক। তিনি সবকিছুকে ছাপিয়ে বাংলা সাহিত্যে সনেট কবিতায় নিজের কবি শক্তির নতুন সাক্ষর রাখেন। শুধু সনেট লিখেননি সেই লিখেছেন সার্থক সনেট। এতো বছরে বাংলা সাহিত্যে অনেক বিখ্যাত কবির আগমণ ঘটেছে। তারাও কাব্য চর্চা করে সফল হয়েছেন কবিতায়। আর তাদের শব্দের গাথুনি দিয়ে সাহিত্য ভা-ারকে সমৃদ্ধ করছেন। তবে সনেট লিখে কেউই তেমন সফল হয়নি কিংবা মাইকেলের মতো স্বার্থক সনেট হয়ে ওঠেনি। এটাও হতে পারে যে, সাহিত্য বিচারে এখনও তাদের লেখার গুরুত্ব পাঠক মহলে উচ্চ আসন পায়নি। সনেট কবিতা যদিও অনেক কবি লিখেছেন এখনও লিখেই চলছেন। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও অনেক সনেট কবিতা লিখলেও সমালোচকদের মন রাখতে পারেননি। এরপরে আরও অনেক কবি সনেট লিখেছেন। বর্তমানেও লিখছেন অনেকেই। কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত নতুন নতুন সৃষ্টির নেশায় বুদ হয়ে থাকতেন সাহিত্যে। তাইতো ইংরেজি সাহিত্য চর্চা বাদ দিয়ে তিনি যখন বাংলা সাহিত্য চর্চা শুরু করেন। তখনই যেনো বাংলা সাহিত্যও নতুন নতুন সৃষ্টি ও স্রষ্টা পেতে শুরু করে। তারই ধারাবাহিকতা আজও বহমান।
বিস্ময়কর বিষয় হচ্ছে সেই আদিকাল থেকেই কবিতায়, গানে ছন্দ ও অন্ত্যমিলের চর্চা খুব নিয়ম মেনেই হয়েছে। অথচ বলা যায়, বাংলা সাহিত্য তখনও নবীন। আর মাইকেল মধুসূদন দত্ত সেই কাজটি খুব দক্ষতার সাথেই করেছেন। কিন্তু এতোকাল পরেও আমরা কতোটা জ্ঞানহীনভাবেই সাহিত্য চর্চা করে যাচ্ছি। আধুনিকতার নাম করে ছন্দকে অস্বীকার করি কিবা ছন্দ জানার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছি। তাই তো অন্ত্যমিলকে এখনো কারো কারো কাছে ছন্দ বলেই শুনতে পাই। এজন্য হয়তো এখনো বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক ও বর্তমান সময়ের তথাকথিত সাহিত্য বোদ্ধারাও চৌদ্দ মাত্রার অক্ষরবৃত্তে লেখা মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘মেঘনাদ বধ’ মহাকাব্যের অন্ত্যমিলকে অমিত্রাক্ষর ছন্দ বলে। এর কারণ ছন্দ সম্পর্কে ধারণা না থাকা বা ছন্দকে অস্বীকার করার মতো ধৃষ্ঠতা দেখানো। তবে এখনও যারা কবিতা লিখে সুনাম অর্জন করে থাকেন তারা গদ্য কবিতা লিখলেও তা নির্দিষ্ট ছন্দে লিখে থাকেন। সেটাও আমরা কাব্যিক চোখে দেখি না। যাই হোক, কথা হচ্ছে আপনি যে কবিতাই লেখেন না কেনো তা ছন্দের মধ্যেই এগিয়ে নিলেই কবিতা শক্ত স্থানে দাড়ায়। এখন দেখে নেওয়া যায় অমিত্রাক্ষর ছন্দের সংজ্ঞা যে ছন্দে চরণদ্বয়ের অন্ত্যবর্ণের মিল থাকে না, তাকে অমিত্রাক্ষর ছন্দ বলে। অমিত্রাক্ষর ছন্দ বাংলা কাব্যের একটি বিশেষ ছন্দরূপ যা ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে মাইকেল মধুসূদন দত্ত কর্তৃক প্রবর্তিত হয়েছিল। চরণান্তিক মিল বাংলা পদ্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য; কিন্তু অমিত্রাক্ষর ছন্দে চরণান্তিক মিল থাকে না। এছাড়া অমিত্রাক্ষর ছন্দে রচিত কবিতার প্রতিটি পঙক্তিতে চৌদ্দটি অক্ষর থাকা আবশ্যিক । কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত অমিত্রাক্ষর ছন্দে প্রথম যে কাব্যটি রচনা করেন তা হলো তিলোত্তমা সম্ভব কাব্য; এটি ১৮৬০ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়। অতঃপর তিনি অমিত্রাক্ষর ছন্দে মেঘনাদবধ কাব্য রচনা করেন। যা ১৮৬১ সালে প্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। মেঘনাদবধ কাব্যের ষষ্ঠ সর্গের অংশ বিশেষ যা “মেঘনাদ ও বিভীষণ” নামে পরিচিত।
অমিত্রাক্ষর যে কোনো ছন্দ নয়, এই বাক্যটি বলার সাথে সাথেই অনেকেই তা খারিজ করে দেবেন। কিন্তু চৌদ্দ মাত্রার অক্ষরবৃত্তের মেঘনাদ বদ কাব্যে কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত শুধু অন্ত্যমিলের চিরায়িত নিয়ম থেকে বের হয়েছেন। এই যে অন্ত্যমিলের বর্জন করে তিনি নতুন ধরনের কবিতার সূচনা করেছিলেন সেটাই মূলত অমিত্রাক্ষর নামে পরিচিত। শুধু মিল বর্জনের জন্য নতুন কোনো ছন্দের সৃষ্টি হয়নি। সৃষ্টি হয়েছে অন্ত্যমিলহীন কবিতা লেখার সূচনা। তাই তো কবি ও প্রাবন্ধিক আবিদ আনোয়ার বলেছেন‘মিলের সাথে ছন্দের কোনো মিল নেই। ছন্দ হলো পঙক্তির অভ্যন্তরে পর্বের শৃঙ্খলা।’
আধুনিক কালে অধিকাংশ লেখকই অন্ত্যমিল ছাড়া কবিতা লিখছেন। যে কবিতাগুলো পাঠকপ্রিয়তাও পাচ্ছে। কবি ও প্রাবন্ধিক আবিদ আনোয়ার তাঁর ছন্দের সহজপাঠ গ্রন্থে বলেছেন, ‘পাঠক জেনে রাখুন অমিত্রাক্ষর কোনো ছন্দের নাম নয়, অক্ষরবৃত্ত বা পয়ার ছন্দে মাইকেল কেবল পঙক্তির শেষে মিল ব্যবহার করেন নি।’
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।