।। ত্রিতাপহারিণী ২০২০।। T3 শারদ সংখ্যায় দেবব্রত রায়
বৃদ্ধাশ্রম
মেডিকেল থেকে বেরিয়েই তমোঘ্ন দ্রুত পথ হাঁটতে শুরু করলো। শীতের ম্লান বিকেল। একটু পরেই সন্ধ্যা নেমে যাবে ! তমোঘ্ন দ্রুত হাঁটতে হাঁটতেই ভাবছিল, অটো-স্ট্যান্ডটা ক্রস করে কলেজস্কোয়ারের ঘিঞ্জি রাস্তাটায় ঢুকে যেতে পারলেই ও নিশ্চিন্ত হতে পারবে ! কিছুক্ষণ হাঁটার পর তমোঘ্ন এবার যেন সত্যিসত্যিই নিশ্চিন্ত হলো। ভাবলো,যাক, আজ অন্তত,মেয়েটা আর রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে নেই ! সপ্তাহখানেক হলো একটা মেয়ে তমোঘ্নকে খুব জ্বালাতন করছে! গতকালও সে ভীড়ের মধ্যেই ওকে” রন্তু! রন্তু! ” বলে ডাকাডাকি করছিল ! তমোঘ্ন-র দিদি বার বার সাবধান করেছে। বলেছে, রাস্তায়-ঘাটে অপরিচিত কারোর সঙ্গেই কথা বলবি না, আসার হলে হোস্টেল থেকে বেরিয়ে সোজা এখানে চলে আসবি ! হাঁটতে হাঁটতেই তমোঘ্ন ভাবছিলো, আজ বরং মেয়েটার সঙ্গে ওর দেখা হলেই ভালো হতো ! সে পরিস্কারভাবে বলে দিতে পারতো ওর ঐ রন্তু না, সন্তু সে ও নয় কিন্তু, ঐ-যে কথাই আছে না, যাকে যেদিন বেশি প্রয়োজন হয় ঠিক সেইদিন-ই নিজের ধারেপাশেও তাকে পাওয়া যাবেনা! তমোঘ্ন এইসব ভাবতে ভাবতে কলেজস্কোয়ারের রাস্তাটা ধরে কয়েক-পা এগোতেই শুনতে পেল, ” রন্তু! রন্তু! ” বলে সেই মেয়েটা ভীড়ের ভিতর থেকেই ওকে ডাকছে! তমোঘ্ন মনেমনে প্রস্তুতি নিয়েই রাস্তার একপাশে সরে দাঁড়ালো। আজ মেয়েটাকে ও বুঝিয়ে দেবে যে ও কোনো রন্তু নয় এবং দ্বিতীয়দিন যেন এইধরনের চালাকি তমোঘ্ন-র সঙ্গে তিনি না করতে আসেন ! তমোঘ্ন লক্ষ্য করলো একটা ক্ষীণকায় মেয়ে ভীড়ের ভিতর থেকে প্রায় দৌড়াতে দৌড়াতেই বেরিয়ে এল তারপর, তমোঘ্ন-র সামনে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বললো, কী-রে, এতক্ষণ ধরে ডাকছি তবু, দাঁড়াচ্ছিস না যে ! একে তো মেয়েটাকে তমোঘ্ন চেনেই না তারপর আবার, তুই-তোকারি ! চোয়াল শক্ত করে সে বললো, আমি রন্তু নই, তাই দাঁড়াইনি ! মেয়েটা এবার যেন একেবারেই ভেবড়ে গেল ! চোখগুলো বড়োবড়ো করে তমোঘ্ন-র দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে সে বললো, বিশ্বাস কর মানে, বিশ্বাস করুন, আপনার হাইট, হাঁটা-চলা…. এমন কি টু-ফিট ডিসট্যান্স থেকেও আপনি আর, আমার ছোটো মামার ছেলে রন্তু হুবহু একইরকম দেখতে ! তমোঘ্ন যেন এতক্ষণে একটু হালকা হলো। সে মনে মনে ভাবলো, মেয়েটি তাহলে ওর এক আত্মীয়-র সঙ্গে তাকে গুলিয়ে ফেলেছে! কিন্তু,নিজের হালকা ভাবটা বাইরে প্রকাশ না করে তমোঘ্ন গম্ভীর গলাতেই বললো, হতে পারে। মেয়েটির বিষ্ময়ের ঘোর যেন তখনো কাটেনি! সে তমোঘ্ন-র দিকে একটা অদ্ভুত-দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হটাৎ-ই দূরের একটা সাদা রঙের বাড়ি দেখিয়ে বললো, ওইটা আমাদের বাড়ি ! একদিন আসুননা আমাদের বাড়িতে ! মা আপনাকে দেখলে খুব খুশি হবেন ! তমোঘ্ন বললো, আপনাকে আমি চিনিনা তাই, যাওয়ার কোনো প্রশ্ন-ই ওঠেনা ! তমোঘ্ন-র কঠিন কথাতে মেয়েটার ম্লান মুখখানা যেন আরোই ম্লান হয়ে গেলো ! তমোঘ্ন ভাবলো, মেয়েটাকে হয়তো একটু বেশিই কঠিন কথা বলে ফেলেছে সে ! একজন মেডিকেল-ছাত্র হিসেবেও এরকম ব্যবহার করা তার একদমই উচিত হয়নি ! মেয়েটা খুবই বিব্রত ভাবে ধীরে ধীরে ভীড়ের মধ্যে মিশে যেতে চাইছিল! তমোঘ্ন পিছন থেকেই তাকে ডাকলো । বললো , “শুনুন ! ” মেয়েটা সঙ্গে সঙ্গেই উজ্জ্বল মুখে ওর দিকে ফিরলো । তমোঘ্ন বললো, “দেখুন, আমি তো এখানে পড়াশোনা করতে এসেছি তাই, বিশেষ কোথাও যেতে পারিনা তবে, আপনি যখন আমন্ত্রণ করেছেন একদিন নিশ্চয় যাওয়ার চেষ্টা করবো !” কথাটা শোনামাত্র -ই, রাস্তার সমস্ত আলো যেন মেয়েটির মুখের উপরে এসে জড়ো হলো ! একটা ছোট্ট মেয়ের মতো-ই খুশিতে প্রায় নেচে উঠল সে । বললো , সত্যিই আপনি যাবেন ! তমোঘ্ন বললো, কথা দিতে পারছি না তবে, অবশ্য-ই যাওয়ার চেষ্টা করবো ! মেয়েটি যেন ওই টুকুতেই খুশি হয়ে গেল। সে বললো , আপনি চেষ্টা করলেই হবে !
একটা ছুটির দিন দেখে তমোঘ্ন সত্যিসত্যি-ই সেই বাড়িটার উদ্দেশ্য রওনা দিল ! দূর থেকে যতটা সহজ মনে হয়েছিল পৌঁছানোটা কিন্তু, তত সহজ হলো না তমোঘ্ন-র ! অনেক গলিঘুঁজি পেরিয়ে একটা নোংরা বস্তির মধ্যে এসে দাঁড়াতে বাড়িটা সামনের থেকে দেখতে পেল সে। দূর থেকে বাড়িটাকে যতটা পুরানো মনে হয়েছিল কাছে এসে তমোঘ্ন বুঝতে পারল বাড়িটা যেন তারচেয়েও কয়েকশো বছরের বেশি-ই পুরানো ! একসময় বাড়িটার মূল ফটকে গৃহস্থের আব্রু রক্ষার জন্যে যে কপাট লাগানো হয়েছিল এখন ডিএনএ টেস্ট করালেও বোধহয়, তার আর অরিজিন খুঁজে পাওয়া যাবেনা ! কেরোসিন কাঠ, ভাঙাচোরা তক্তা,টিন পাত, প্লাস্টিক-সিট দিয়ে সেটির সর্বাঙ্গেই তাপ্তি মারা হয়েছে ! বাড়িটার দেয়ালে একটা রঙচটা সাইনবোর্ড ভাঙা অবস্থায় ঝুলে রয়েছে । তাতে যে কী-যে লেখা ছিল অনেক চেষ্টা করেও তমোঘ্ন পড়তে পারলো না ! ভাঙা দরজাটা-র সামনে দাঁড়িয়ে ভেতরে ঢুকবে কী-না ভাবছিল সে। এমন সময় একটা ছেলে হটাৎ-ই এগিয়ে এসে বললো , “আরে, তমোঘ্ন-দা, আপনি এখানে ! কাউকে খুঁজছেন ? ” তমোঘ্ন চমকে পিছন ফিরতেই দেখল ওদের ক্যান্টিনে যে ছেলেটি দুধ সাপ্লাই দেয় সে ওর কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়েছে ! তমোঘ্ন বললো, হ্যাঁ মানে, এই বাড়িটি যাদের তাদেরই একজন আমাকে আসতে বলেছিলেন !
ছেলেটি একটু অবাক হয়েই বললো , এখন তো এ বাড়ির মালিক কেউ নেই দাদা! যারা ছিল তারা সবাই রাজস্থানে, নিজেদের দেশে ফিরে গেছে । আর, এই বাড়িটা চন্দ্রমল আগরওয়ালা-র কাছ থেকে ভাড়া নিয়ে একসময় যারা এখানে একটা বৃদ্ধাশ্রম করেছিল তারাও লসটস খেয়ে যে-টুকু জিনিসপত্তর বেঁচে ছিল সেসব নিয়ে কবেই পালিয়েছে ! এদের কোথাও যাবার জায়গা নেই বলেই কয়েকজন বুঢঢি এখনও রয়ে গেছে ! তমোঘ্ন সামান্য ইতস্তত করে বললো , তাহলে, সেই রোগা-পাতলা মতন ভদ্রমহিলা ! ছেলেটি এবার হেসে বললো, ওহোঃ, বুঝতে পেরেছি , আপনার সঙ্গে তাহলে সুতপাদি-র দেখা হয়েছিল ! ও ঐরকমের-ই ! রাস্তায় কারোর সাথে যেচেই আলাপ করে নিয়ে এখানে আসার জন্য নিমন্তন্ন করে! আসলে, বুড়িগুলা খুবই একা একা থাকে তো তাই, কিছুক্ষণের জন্যও কেউ বেড়াতে এলে ওদেরো সময়টা ভালো কাটে ! তমোঘ্ন-র রাগ হওয়ার পরিবর্তে কেন জানিনা, ওদের উপর তার মায়া হলো ! সে বললো , তাহলে বরং একবার ভিতরে গিয়ে সুতপাদি-র সঙ্গে দেখা করেই আসি ! ছেলেটি বললো, তাকে এখন কোথায় পাবেন! ও তো সেই সাতসকালেই ভিখ মাঙতে বেরিয়ে গেছে ! সে চাউল, ডাল নিয়ে এলে তবেই এরা সব খেতে পাবে!ঐ সুতপা-দি আছে বলেই বুঢঢি-মানুষগুলা তবুও দু-মুঠো খেয়েপড়ে বেঁচে আছে ! তমোঘ্ন-র কানে আর কোনো কথা-ই পৌঁছাই না! সে ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে ভাঙা দরজাটা দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ে । দেখে, একজন কঙ্কালসার বৃদ্ধা একটি শতচ্ছিন্ন সায়া বুকের কাছে কোনোক্রমে মুঠো করে ধরে প্রাচীরে বসা একটা কাকের দিকে হাত নেড়ে নেড়ে গান গাইছেন , ওরে, কালা কেষ্ট, আর জ্বালাসনে তো ! তোর বাঁশিতে পাগল আমি……