গল্পতে দেবাশীষ মল্লিক চৌধুরী

মাশুল
নন্দিনীর নিস্তেজ দেহ মাটিতে পরে । মনোময় বার বার ঝাঁকিয়ে প্রাণের সারা পেতে চাইছে । কিন্তু কোনো সারা নেই । পালস খুঁজেছে হাতে, গলায়, পায়ে । কোনো আশা খুঁজে পায়নি । নিথর দেহটা বুকে জড়িয়ে ফুফিয়ে কেঁদে চলেছে । গলা থেকে আওয়াজ বার করার উপায় নেই । আসে পাশে বাড়ির লোক জুটে যাবে। কি করবে দিশা পাচ্ছে না । নিছক মজা করতে গিয়ে এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে কল্পনাও করতে পারেনি ।
একটা নাটকের দলের অর্ডার ছিল , একটা মুসলিম অ্যাসিড ভিকটিম মেয়ের মডেল তৈরি করে দেওয়ার । মুখের একপাশ সম্পূর্ণ পোড়া । পুড়ে নষ্ট হয়ে যাওয়া চোখ । লম্বা চুলে মুখের পোড়া অংশ ঢাকা থাকবে । সিলিকনে মডেলটা তৈরি করেছে মনোময় । রিয়েলিস্টিক কাজে মনময়ের জুরি মেলা ভার । কালো একটা নাইটি পরিয়ে ওয়ার্কশপে একটা চেয়ারে মডেলটাকে বসিয়ে রেখেছিল মনোময় । ডেলিভারি নিতে দলটা দেরি করছে । কারণ মনোময়কে বাকি পেমেন্টটা দিতে পারেনি । ফুল পেমেন্ট ছাড়া ও কাজ কিছুতেই ছাড়বে না । কারণ, আগে অনেকবার ঠকেছে ।
ওয়ার্কশপের এক আলো আঁধারি কোনে মডেলটা রাখা । ওদিকে তাকালে মনোময়ের নিজেরই গা ছমছম করে ওঠে । ছাত্র ছাত্রীদের মারফত মডেলটার ভৌতিক চেহারার কথা রটে গিয়েছিল পাড়ায় । রোজ কেউ না কেউ দেখতে এসে , আঁতকে ফিরে গেছে । এসব দেখে মোনময়ের মাথায় এক দুষ্টু বুদ্ধি খেলে যায় ।
নন্দিনীর সাথে দীর্ঘ বছরের সম্পর্ক মনময়ের । তার শিল্পী হয়ে ওঠার পিছনে নন্দিনীর অবদান অনেকখানি । মনময়ের অগোছালো জীবনটা ছন্দে এনে দিয়েছে সে । অসাধারণ শিল্প প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও, মনময়ের বাড়ির লোক চায়নি ও শিল্পী হোক । নিজের ভালোবাসার তাগিদে , প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়া তিলে তিলে গড়ে তুলেছে নিজেকে । নন্দিনী জীবনে আসার পর , একজন দক্ষ মালির মত নিজের শিল্পী সত্তাকে বঞ্চিত করে, লালন করেছে মনমোয়ের প্রতিভাকে । তার জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্তি , দেশ বিদেশের স্বীকৃতি প্রাপ্তির তত্বতালাশ নন্দিনী জুগিয়েছে । আজ তাদের এতদিনের সম্পর্ক একটা পরিণতি পেতে চলেছে ।
নন্দিনী আজ আসবে ,মনোময়ের জানা ছিল । ঠিক ছিল , দুজনে এক সাথে পি সি চন্দ্রে গিয়ে, দুজনের বিয়ের আংটি আর কিছু গয়না কিনবে । বাড়ির কাছেই পি সি চান্দ্রের শোরুম । সারাদিন সব কাজ গুছিয়ে সন্ধেবেলায় যাওয়া ঠিক করেছিল মনোময় । সেই অনুযায়ী নন্দিনী এসে হাজির মনময়ের বাড়িতে । প্ল্যান মত , মনোময় ওয়ার্কশপের আলো নিভিয়ে, দরজা বন্ধ করে , বসার ঘরে অপেক্ষা করছিল নন্দিনীর। বাড়ির পিছনের বাগানে ওয়ার্কশপ । একটা কমজোরী আলো , সেখানে এক আলোআঁধারী পরিবেশ সৃষ্টি করে রাখে । সচারচর বাড়ির লোক কেউ খুব প্রয়োজন ছাড়া, বাগানের দিকে যায় না । সারা বাগান স্কাল্পচারের প্রয়োজনীয় , অপ্রয়োজনীয় জিনিস পত্রে ছাড়ানো ছিটানো । আজ আবার বাড়িতে কেউ নেই । একটা নিমন্ত্রণ বাড়ি গেছে সকলে ।
একটা প্রদর্শনীর জন্য নন্দিনী দিল্লী গিয়েছিল । কালই ফিরেছে । এ মডেল সম্পর্কে ওর কোনো ধারণা ছিলনা । দিল্লী থেকেই শরীরটা খারাপ নন্দিনীর । প্রচন্ড কাশি ,নিশ্বাসের কষ্ট । গলা ব্যাথা , মাঝে মাঝে জ্বর ও আসছে । নতুন ভাইরাসটা চেপে ধরেছে মনে হয় ! দশ দশটা দিন দেখা নেই দুজনের । অস্থির হয়ে পড়েছিল সে , একবারটি মনময়কে দেখার জন্য । তাই সব উপেক্ষা করে ছুটে এসেছে ।
নতুন কাজ দেখাবার অছিলায় , নন্দিনীকে এনে দাড় করিয়েছে ওয়ার্কশপের গেটের সামনে । দরজা খোলে মনোময় । লাইট কেটে গেছে জানিয়ে , নন্দিনীর মোবাইলের টর্চটা জ্বালাতে বলে । জ্বলে ওঠে নন্দিনীর মোবাইলের টর্চ । দুজনে এসে দাঁড়ায় ওয়ার্কশপের ভিতরে । নন্দিনীর হাত থেকে মোবাইলটা নিয়ে , দুটো একটা নতুন কাজ দেখায় নন্দিনীকে । কাজ দেখে নন্দিনী অভিভূত । আচমকা প্ল্যান অনুযায়ী আলো ফেলে আঁধার কোণে চেয়ারে বসে থাকা মডেলটা ওপর । নন্দিনীর চোখ যায় সেদিকে । নন্দিনী ভয়ে আঁতকে ওঠে !
নন্দিনীর ভীত সন্ত্রস্ত চিৎকার ওয়ার্কশপের ছাদ ভেদ করে ছড়িয়ে পরে আকাশে । প্রাণ পনে জাপটে ধরে মনোময়কে । হতভম্ব মনোময় জাপটে ধরে নন্দিনীর থর থর করে কাঁপতে থাকা দেহটাকে । প্রাণপণ চেষ্টা করে , ওটা ভুত নয় , মডেল বোঝাতে । নন্দিনীর কাঁপুনি হটাৎ থেমে যায় । দেহ এলিয়ে পরে মাটিতে ।