ছোটগল্প তে দেবাশীষ মল্লিক চৌধুরী

সেদিন মধুমন্তি

সওয়ারি মেয়েটা ঘুমে অচৈতন্য দেখে , ট্যাক্সি ড্রাইভার আর হেলপারের মধ্যে চোখে চোখে কথা হয়ে যায় । সাইন্স সিটি ব্রিজ পার করে বাইপাস ধরে সোজা গড়িয়া মহামায়াতলা যাবার কথা । কিন্তু ট্যাক্সি ব্রিজে না উঠে , খুব সন্তর্পনে , ধির গতিতে পি সি চন্দ্র গার্ডেনের পাশের রাস্তা ধরে নিল । উঠে পড়ল বাসন্তী হাইওয়েতে । শুনশান রাস্তা । চাকা হাইওয়ে ছুঁতেই , গতি বেড়ে গেলো লাফিয়ে ।
সেক্টর ফাইভের কলেজ মোড় । রাত পৌনে দশটা । আই টি সেক্টরে কাজ করা মেয়ে মধুমন্তি, আজ একটু দেরি করে ফেলেছে অফিস থেকে বেরোতে । সাধারণত , রাতে ট্যাক্সিতে ওঠার প্রয়োজন হলে ,ড্রাইভারের সাথে হেলপার থাকলে , সে গাড়ী এড়িয়ে যায় । আজ কোনো গাড়ী গড়িয়া যেতে চাই ছে না । অনেক গুলো ট্যাক্সি রিফিউজ করলো । এই ট্যাক্সিটা রাজি হওয়ায়তে উঠে পড়েছে ।

তীব্র একটা মদের গন্ধ নাকে আসছিল ঘুমন্ত মধুমন্তির । ঘুমের জন্য ব্যাপারটা তে আমল দিতে পারেনি । একটা গর্তে পরে গাড়িটা প্রচন্ড ঝাঁকুনি খেতেই ,ঘুম ভেঙে যায় । দেখে , অচেনা শুনশান রাস্তা দিয়ে ছুটে চলে চলেছে ট্যাক্সি । হেলপারের হাতে মদের বোতল । নিমেষে বুঝে যায় পরিস্থিতি । চিৎকার করে ওঠে,” এ আমায় কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন ? এটাতো আমার রাস্তা নয় ! ” হেলপারটা মদের বোতল দিয়ে দেয় ড্রাইভার এর হতে । মধুমন্তির দিকে তাকিয়ে বলে ।” চল মাগী , তোকে একটু হওয়া খাইয়ে নিয়ে আসবো ।” ড্রাইভারটা বিচ্ছিরি ভাবে হাসতে থাকে ।

শীতের কুয়াশা আর গাঢ় অন্ধকারে ছেয়ে আছে চারিদিক । দু একটা গাড়ী হুস হুস করে পাশদিয়ে চলে যাচ্ছে । জন মানুষের চিহ্ন নেই কোনোখানে । ভয়ে হাত পা কাঁপছে মধুমন্তির। আন্দাজ করতে পারে , সুবিধা মত জায়গা পেলে , গাড়ী থামিয়ে দুই পশুতে তার দেহ ছিঁড়ে খুঁড়ে খাবে । টাকা পয়সা গলার হার টা তো নেবেই , উপরি পাওনা হিসাবে । ঠিক করে গাড়ি থেকে লাফিয়ে পড়বে ! কিন্তু কিছুতেই গাড়ীর দরজা খুলতে পারে না । মিনতি করতে থাকে ,” দাদা আমার টাকা পয়সা গয়না সব নিয়ে নাও । দয়া করে আমায় সাইন্স সিটিতে নবিয়ে দাও গো ” । ড্রাইভার কোনো কথা বলে না । গলায় মদ ঢেলে ,গাড়ির গতি বাড়িয়ে দেয় আরো । মধুমান্তি কি করবে ভেবে পায় না । চিৎকার করে কেঁদে ওঠে ।

দুরন্ত গতিতে গাড়ি চলছে । মধুমন্তির চিৎকার বন্ধ জানালা ভেদ করে বাইরে পৌঁছচ্ছে না । কান্না বন্ধ করে ভাবতে থাকে কিছু একটা করতে হবে । হেলপার টা একটা বোতল শেষ করে, আরো একটা খুলে ড্রাইভার হাতে দেয় । মধুমন্তি বুঝে গেছে , এরা ওকে ভোগ করে , ধরা পড়ব ভয়ে কিছুতেই বাঁচিয়ে রাখবে না । ঠিক করে, ” আমি যখন নিজে বাঁচব না ,তখন এমন একটা কিছু করতে হবে যাতে এরা শিক্ষা পায় ।

মধুমন্তির তিনকুলে কেউ নেই । বর্ধমানের ভাতারের আদী বাসিন্দা । বাবা স্কুল মাস্টার ছিলেন । মা মন্দির জ্ঞানে সংসার লালন করেছেন । করোনা , এক সপ্তাহের মধ্যে একসাথে দুজন কে কেড়ে নিয়েছে ওর কাছ থেকে । সেই থেকে রক্তের সম্পর্কের ইতি পরে গেছে ওর জীবনে ! পাঁচকাঠা জমির ওপর তিন কামরার ছোট্ট একটা বাড়ি ছাড়া আর কিছু রেখে যেতে পারেননি , আদর্শ স্কুল শিক্ষক বাবা । ওরা চলে যাবার পর ও বাড়িতে কিছুতেই একা থাকতে পারেনি মধুমন্তি । এক বন্ধুর মাধ্যমে এই চাকরিটা পেয়ে ,পাশের বাড়ীর অনুপিসিদের ওপর বাড়ির দায়িত্ব দিয়ে চলে এসেছে কলকাতায় । মহামায়াতলায় এক বাড়িতে পেয়িংগেস্ট হিসাবে থাকে ।

মা , বাবা, আনুপিসি সবার মুখ ভেসে উঠছে চোখের সামনে । অফিস কলিগ ঋষির সাথে গভীর সম্পর্ক গড়ে উঠেছে । স্বপ্ন দেখেছে ঘর বাঁধার । অফিস থেকে বেরোবার আগেই ওর টেবিলে বসে চা খেয়ে এসেছে ! ওর সাথে আর হয়তো দেখা হবেনা কোনোদিন ! ও তো জানতেই পারবে না ওর সাথে কি ঘটলো ! বাবা মা চলে যাবার পর ওকে ঘিরেই সব স্বপ্ন গড়ে উঠেছে ! সব এভাবে শেষ হয়ে যাবে ? একটা ফোন করার ও উপায় নেই ! ফোনটা কোলের ওপর রেখে ঘুমিয়ে পড়েছিল , আগেই সেটা হাতিয়ে নিয়েছে শয়তান দুটো ।

বাসন্তী হাইওয়ে ধরে ট্যাক্সি ছুটে চলেছে । চৌবাগার পর কয়লাডিপো। একটা বিপদজনক বাঁকে, নিয়ন্ত্রণ হারাতে হারতে কোনো মতে গাড়িটাকে বাঁচিয়ে , পার হয়ে যায় বানতলা । জলপথ পার করে কাঁটা তোলার দিকে চলেছে ট্যাক্সি । এর পরই লেদার কমপ্লেক্স ।
মধুমন্তি বাঁদিকে দিকে থেকে ডান দিকে ড্রাইভার এর পিছনে চলে এসেছে । বাসন্তী হাইওয়ের বাঁদিক বরাবর বয়ে চলেছে কলকাতার নিকশী খাল। খলের ধার
ঘনো ঝোপঝাড় পূর্ণ ।
বামনঘাটা ,কাঁটাতলার মাঝবরাবর ট্যাক্সি এসেছে । ড্রাইভারের ডান হাতে স্টিয়ারিং ,অন্য হাতে মদের বোতল। মদের বোতলটা তুলে মুখে ঢালতে যাচ্ছে । এই অবসরে মধুমন্তি পিছন থেকে ঝাঁপিয়ে পরে ,সর্ব শক্তি দিয়ে স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে দিল
বাঁদিকে । ড্রাইভার হকচকিয়ে গিয়ে গাড়ির নিয়ন্ত্রণ আর ধরে রাখতে পারল না । আশি থেক একশো কিলোমিটারে গাড়ী ! হটাৎ স্টিয়ারিং ঘুরতেই, চাকায় বিকট আওয়াজ তুলে , ঝোপঝাড় ভেঙে ছুটে চললো খালের দিকে । খুব সম্ভবত ,একটা মাটির ঢিবিতে ধাক্কা খলো গাড়িটা । নিমেশে মাটি ছেড়ে উঠে গেলো আকাশে ! শূন্যে বাঁদিকে কাত হতেই মধুমন্তি ডান দিক ড্রাইভারের পিছন থেকে আছড়ে পড়লো,বাঁদিকের গেটের ওপর । ভারী দেহের আঘাতে ,আচমকা খুলে গেলো গেট । মধুমন্তি আছড়ে পড়লো খালের ঢালের ঝোপঝাড়ের ওপর । গাছের ডাল বা অন্য কিছুতে প্রচন্ড আঘাত পেলো পাঁজরে । যন্ত্রণায আর্তনাদ করে উঠলো । সব আঁধার হয়ে আসছে । মনে হলো ও সংজ্ঞা হারাচ্ছে । এ অবস্থায় হঠাৎ খুব ভারী একটা কিছু জলে পড়ার আওয়াজ কানে আসলো মধুমন্তির ।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।