শ্রাবণ মাসের এক বৃষ্টির সন্ধ্যা- জয়দের বাড়ির দোতলার ঘরে সুকুমার স্যারের কাছে টিউশন পড়তে হাজির আমরা জনা দশেক ছাত্র। গ্রামে কারেন্ট এলেও বৃষ্টি হলেই নিশ্চিত লোডশেডিং তাই হ্যারিকেনের টিমটিমে আলোয় বসে আছি সবাই, আর বাইরে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টির একটানা আওয়াজ আসছে। যাই হোক, স্যার বোধ হয় বৃষ্টির জন্যই কোথাও আটকে গেছেন, এখনও এসে পোঁছায় নি। আর আমরা মোটেও সুবোধ বালক না হওয়ায়, স্যার আসতে দেরি হচ্ছে দেখে নিজেদের পড়াশুনা সব ডকে তুলে দিয়ে জমিয়ে আষাঢ়ে গল্প জুড়ে দিলাম। আলোচ্য বিষয়-ভূতের গল্প, কে বা কার কাকা, জেঠা, মাসি, পিসি, ঠাকুমা, দাদু বা দিদা কোথায় কবে কি কি ভুতুরে ঘটনার সম্মুখীন হয়েছিলো তারই আজগুবি রং চড়ানো সব বর্ণনা।
গল্পের আসর এমন জমে উঠেছিল যে, এমনকি ব্যাচের সবচেয়ে স্টুডিয়াস আর ভালো ছাত্র শুভও পরাশুনা ছেড়ে সেই দলে যোগ দিলো! শুভ ক্লাসে ফার্স্ট হয়, স্কুল আর টিউশনের সব স্যারেরাই খুব ভালোবাসে ওকে। তাই, পড়াশুনা ছাড়া অন্য বিষয়ে যেন ওর ঢুকত না। সেই শুভই কিনা আমাদের এই আষাঢ়ে ভূতের গল্পের আসরে যোগ দিলো? আমাদের ব্যাপারটা কেমন যেন বেমানান লাগলো।
অবশ্য শুভ মুখ খুলতেই বুঝতে পারলাম আমার ধারণা অভ্রান্ত। এইসব ছেঁদো আজগুবি গল্পে ডুবে যাওয়ার পাত্রই নয় ও। সবারই নিজের নিজের প্রথম গল্প বলা শেষ হলে, শুভর পালা এলো। কিন্তু শুভর মুখ থেকে যা বেরোলো তাতে সন্ধ্যার অমন জমাটি আসরটাই আর একটু হলেই পুরোটাই মাটি হতে যাচ্ছিলো! শুভ একবার বেরসিকের মত আসরের তাল কেটে দিয়ে বললো-ওসব ভূত প্রেত বলে কিছু হয় না বুঝেছিস, ওসব আনসাইন্টিফিক চিন্তাধারা। যত সব আজগুবি গলগল্প, মিথ্যা চিন্তা ভাবনা যাদের মাথা খায়, তাদের মগজেই এই সব ভূত প্রেতেরা বাস করে, আর কোথাও তাদের টিকিটিও দেখা যায় না। ওসব বাজে আলোচনা বন্ধ করে চল এবার পড়াশুনা শুরু করি, নইলে সুকুমারদা এসে সবার গল্প করা বের করে দেবে।
এমন সময় সুকুমার স্যার ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বললেন-না না, এমন পরিবেশে তো ভূতের-প্রেতের গল্পই জমে রে। পড়াশুনা তো রোজই হয়, আজ বরং একটু গল্প গুজবই করা যাক। শুভ, কিসের গল্প করিছিলি রে? বলতে বলতে দরজার পাশের আসনটায় বসে পড়লেন সুকুমার স্যার! আমি বেশ অবাক হলাম দেখে যে, এত বৃষ্টিতেও এক ফোটা ভেজন নি স্যার! একবার ভাবলাম তাঁকে জিজ্ঞেস করি, তারপর মনে হলো আজকাল ঐ যে রেনকোট, টেনকোট সবাই পরছে না, হয়তো সেটাই পরে এসেছেন স্যার, তাই বৃষ্টির জলে গায়ে লাগে নি!
এমন সময় জয় স্যারকে বললো-আমরা ভূতের গল্প করছিলাম স্যার, জানেন তো আমার বড় মামা না একবার …তাকে থামিয়ে দিয়ে সুকুমার স্যার বললেন-আর শুভ কি বলছিলো, ওসব ভূত প্রেত বলে কিছু হয় না? সুকুমার স্যারের গলায় এমন একটা তাচ্ছিল্য ছিল যে, শুভও মিনমিন করে বললো -হয় নাই তো। তার গলার স্বভাবসুলভ জোরটা যেন শোনা গেলো না কথাটার মধ্যে। সুকুমার স্যার বললেন-হয় রে হয়, বিশ্বে যে কিছু নিয়ে মানুষ আলোচনা করে, ভাবনা চিন্তা করে, পড়াশুনা করে, রীসার্চ করে তা অবশ্যই আছে। বিশ্বাস না হয় তো, আমার আজকের অভিজ্ঞতার কথাটাই তবে শোনাই তোদের, শোন।
সুকুমার স্যার এরপর নিজের কাহিনী শুরু করলেন, আর আমি আবাক হয়ে দেখতে থাকলাম-কাল পর্যন্ত এইসব আজগুবি বিষয় নিয়ে ফিসফাস করতে শুনলেও যে সুকুমার স্যার কানমোলা দিয়ে এক্সট্রা পড়া চাপিয়ে দিয়ে বলতো-পাঁচ মিনিটের মধ্যে এই পাড়াটা দিবি, নয়তো তোদের সব আজগুবি গুল্প আজকেই তাড়িয়ে ছাড়বো। -সেই তিনিই কিনা আজ সবাইকে ভূতের গল্প বলছেন? বিষয়টা আমার সত্যিই কেমন যেন আবার বেমানান ঠকলো! বুঝতে পারলাম, কিছু একটা গড়বড় তো কোথাও না কোথাও হচ্ছেই, যদিও আমার কাছে সেটা এখন স্পষ্ট নয়।
সুকুমার স্যার বলতে শুরু করলেন, আজ যখন তোদের পড়াতে আসার জন্য বাড়ি থেকে বের হয়েছি মাঝ রাস্তার আচমকা বৃষ্টি শুরু হল। তুমুল বৃষ্টির মধ্যেই সাইকেল চালাচ্ছি, ঝোড়ো হওয়ার জন্য কিছুতেই তাড়াতাড়ি চালিয়ে যেতে পারছি না। এদিকে পাশ দিয়ে দেখছি আমায় ওভার টেক করে হেঁটে হেঁটে চলে যাচ্ছে বাচ্চা বাচ্চা ছেলেগুলো! বেশ অবাক লাগলো ভেবে যে-আমার মত রোজ ব্যায়াম করা এমন স্বাস্থ্যবান যুবক যে সাইকেল নিয়ে হাওয়া ঠেলে আগে যেতে পারছে না, ঐ বাচ্চা ছেলেগুলো হেঁটে কিভাবে যাচ্ছে?
ভালো করে খেয়াল করে দেখতেই আবাক হয়ে গেলাম দেখে যে, ওদের পা যেন মাটি না ছুঁয়েই এগিয়ে যাচ্ছে! ভালো করে নজর দিতেই বুঝলাম, একাটাই ছেলে বারবার আমার পাশ দিয়ে যাচ্ছে! আশ্চর্যের বিষয় না? সে সব সময়ই আমাকে পিছন থেকে ওভার টেক করছে, কিন্তু তাকে একবারও উল্টো দিক থেকে ফিরে আসতে তো দেখলাম না? অনেকবার চেষ্টা করলাম বুঝতে যে ছেলেটা কে, কিন্তু অন্ধকারে ঠিক দেখতে পাচ্ছিলাম না। তবে চিনতে না পারলেও, এটা বুঝতে পারছিলাম যে সে আমার খুব চেনা কেউই।
তাই, তাকে ঠিকমত দেখবো বলে সাইকেলটা থামিয়ে রাস্তার ধারেই একটা তালগাছের গায়ে ঠেস দিয়ে দাঁড় করিয়ে রেখে তার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। একটু পরেই দেখলাম ছেলেটা যথারীতি জোরে পা চালিয়ে আমার দিকেই আসছে। আমি তাকে থামার জন্য হাত দেখাতে, সে আমায় এগিয়ে যাবার জন্য হাতে করে ইশারা করলো! কিন্তু আমি তখন স্থির করেই ফেলেছি, তাকে ভালো করে আগে না দেখে আর ছাড়ছি না! তাই রাস্তার মাঝখানে গিয়ে দুহাত ছড়িয়ে দিয়ে তার পথ আগলে দাঁড়ালাম। সে একবারে আমার গায়ের ওপরে এসে দাঁড়ালো!
আমি তার মুখের দিকে তাকাতেই যাচ্ছিলাম, এমন সময় তীব্র আলোর ঝলকানি দিয়ে সশব্দে বাজ পড়লো পাশের সেই তালগাছটার ওপর, দাউদাউ করে জ্বলে উঠলো গাছটা আর আমি জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়লাম রাস্তায়! এই পর্যন্ত বলে সুকুমার স্যার থামলেন।
অনি বললো- ছেলেটা কে ছিলো, চিনতে পারলেন না, না স্যার? সকুমার স্যার বললেন –কি করে চিনবো, আমি তো ঐ রাস্তাতেই ব্জ্রাঘাতে মরে পড়ে আছি! শুভ বললো-ওটা আমি ছিলাম স্যার, আমিই চাইছিলাম ঐ বজ্রাপাত থেকে আপনাকে বাঁচাতে। তাই বারবার আপনার পাশ দিয়ে জোরে হেঁটে আপনাকেও জোরে চালাতে উৎসাহ দিচ্ছিলাম। যতই হোক, আপনি আমার সবথেকে প্রিয় মাস্টার মশাই বলে কথা!
নাইলে আর কি, আমি তো ওখানেই আগেই বজ্রাঘাতে মরে পড়েছিলাম! তাই চাইছিলাম অন্তত আপনাকে আজ ঐ অপঘাতে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাতে। চলুন না আমার সঙ্গে, আমার বডিটাও আপনার বডির পাশেই এখনও পড়ে আছে ওখানে, আপনাকে দেখাচ্ছি। বলতে বলতেই শুভ আর স্যার হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো!
শুভ আর স্যারের ঐ অশরীরী আত্মাকে দেখে আমরা ওখানেই জ্ঞান হারালাম।