নিঝুম রাতে গা ঢাকা দিয়ে চলতে হয়ে আমায়। আত্মীয়স্বজন এমনকি স্ত্রী-পুত্রকে ছেড়ে নিরালায় একান্তে সংগোপন করে থাকতে হয়। বাড়ির ছাদের চিলে কোঠায় ইদানিং আশ্রয় নিয়েছি আমি। কিন্তু আগে তো আমি এমনি থাকতাম না। একটা সুন্দর জীবন ছিল আমার। আজকাল লোক চক্ষুর অন্তরালে জীবন-যাপন আমার। এ অন্তরাল আমার কাছে অসহ্য। আপনি আমায় লোক সমাজে মেলামেশার ব্যবস্থা করে দিন ডাক্তারবাবু। মানুষ দেখলে কেন আমার ভয় লাগে? দয়া করে আমাকে আমার আগের সুন্দর দিনগুলো ফিরিয়ে দিন।
কথাগুলো বলতে বলতে আমি হাঁপিয়ে উঠলাম। একটা সামান্য ঢোক গিলে বললাম, “ জল খাব”। এক বোতল জল এল । বোতল থেকে খানিকটা জল খেয়ে সামান্য জিরিয়ে নিলাম।
“হ্যাঁ হ্যাঁ বলে যান, বলে যান আপনি। আপনার সমস্যার কথা আমাকে জানতে হবে। তবেই চিকিৎসা করতে পারব”।
ডাক্তার অনির্বান বন্দ্যোপাধ্যায় একটা দামি সিগারেট ধরালেন। বাইর অবিশ্রান্ত ঝড় বৃষ্টি পড়ছে। মেঘ ডাকছে। বাজ পড়ছে।বিদ্যুতের ঝলকে দেখা যাচ্ছে বাইরের গাছগুলোকে। ঝড়ে নুইয়ে পড়ছে গাছগুলো। একটা কুকুরের ডাক শোনা যাচ্ছে। ঝড়ের ঝাপটার সাথে সাথে জানলার কপাট দুটো সজোরে জড়ো হল এক সাথে। ডাক্তার অনির্বান বন্দ্যোপাধ্যায় উঠে খিল এঁটে দিলেন। স্বল্প আলো আর সিগারেটের ধোঁয়ায় ঘরের মধ্যে এক মায়াবী পরিবেশের সৃষ্টি করেছে।
আমি তখন ও সি। স্কুলের বেড়া ডিঙাবার পরই দারিদ্রের নিদারুণ কশাঘাতে অতি অল্প বয়সেই জীবিকা নির্বাহের পথ বাছতে হয়েছিল আমায়। স্বাস্থ্য আর শক্তির অভাব আমার ছিলো না কোন দিনই।কলেজ পাশ করে পুলিশের চাকরিটা পেলাম। পুলিশের চাকরিতে সারা জীবন পেয়েছি বিস্তর অভিজ্ঞতা। তখন আমি সবে কিছুদিন হলো কুমারপুর থানার চার্জ নিয়েছি। মফসস্ল শহর, নতুন জায়গা, নতুন পরিবেশ। কিছুতেই নিজেকে খাপ খাইয়ে উঠতে পারছিলাম না। সারাদিন থানার নানা রকমের কাগজ পত্র নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করে দিনান্তে অফুরন্ত পরিশ্রম আর ক্লান্তি নিয়ে বাড়ি ফিরতাম। নতুন এসেছি। প্রাক্তন ও সি তখনও বাড়ি ছাড়েননি। কাজেই ফ্যামিলি নিয়ে আসতে পারিনি একাই থাকতাম তখন। প্রাক্তন ও সি’র কোয়ার্টারের নিচের তলায় একটা রুমে থাকতাম।
সেবার … এমনি একটি বর্ষণমুখর রাতে আমার রুমে এসে হাজির হল আই বি প্রদীপ বিশ্বাস। আমার কানে কানে বলে গেল কয়েকটি কথা। শিকারি কুকুরের মতো শিকারের সন্ধান পেয়ে টর্চ- রিভালবার নিয়ে সেজে গুঁজে প্রস্তুত হয়ে কনস্টেবল ঊমেশ শিংকে সঙ্গে নিয়ে চললাম আসামি ধরতে। রাতের অন্ধকারে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে বিপদ বাধা তুচ্ছ করে ছুটলাম আমরা হায়েনার মতো শিকারের সন্ধানে।
ঝম ঝম করে বৃষ্টি পড়ছে। একটা বন্ধ ঘরের কাছে দাঁড়ালাম আমরা। রাতের অন্ধকারে মূর্তিমান প্রেতের মতো দেখাচ্ছে সারাটা বস্তি। ঊমেশ শিংকে ইশারা করে আমি সজোরে দরমার বেড়ার দরজায় লাথি মারলাম। হুড়মুড় করে দরজা ভেঙে পড়ে গেল। টিমটিমে নাইট ল্যম্পের আলোয় দেখলাম খোঁচ খোঁচা দাঁড়িওয়ালা লম্বা মোটা চেহারার একটা লোক মেঝেতে বসে পয়সা গুনছে।আর তার পাশে তার স্ত্রী ঘুমন্ত একটা একটা বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছে। আমাদের দেখে ভয় পেয়ে লোকটা পয়সা গোনা বন্ধ করে একপাশে সরে বসল। বাচ্চাটা আচমকা কোকিয়ে কেঁদে উঠল। স্বামী স্ত্রী উভয়েই আমাদের দিকে হতভম্বের মতো তাকিয়ে ছিল।
ঊমেশ শিং পুলিশি কায়দায় বলে উঠল, “এই শালা, থানায় চল”।
“কেন”, অস্ফুট স্বরে বলে উঠল লোকটার স্ত্রী। ঘুমন্ত শিশুটা তখনও কেঁদে চলেছে। চারিদিকে কেমন একটা ভ্যাপসা গন্ধ। ঊমেশ ধৈর্য্য হারিয়ে লোকটাকে এক হ্যাচকা টানে বাইরে নিয়ে এল। পয়সা রাখার বাটিতা উল্টে গেল। ঝন্-ঝন্ আওয়াজে শিশুটি চুপ করে গেল। তবে এবার কেঁদে উঠল স্বামী-স্ত্রী দুজনেই। ঊমেশ শিং বিপুল বিক্রমে সেই লোকটাকে টেনে নিয়ে গেল গাড়ির দিকে।
রাত তখন অনেক। থানায় এসে ঊমেশ শিং’কে হুকুম দিলাম, “ওকে ভিতরে নিয়ে যাও। জিজ্ঞাসবাদ কর”।
ঊমেশ শিং বুট ঠুকে লোকটাকে টানতে টানতে নিয়ে গেল ভিতরের ঘরে। মুখে তার প্রেতের মতো হাসি। চোখে তার কি এক হিংস্রতার আভাস। লোকটার হৃদয় বিদারক চিৎকার আর অসহ্য গোঙানি ভেসে আসছিল ভিতর থেকে। সারাটা থানা যেন কেমন একটা প্রতেপুরীর মতো লাগছিল। বারান্দায় শোয়া কুকুরটা যেন উঠে চলে গেল কোনদিকে। কাগজ-পত্র নিয়ে বসে ছিলাম। খানিকটা অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলাম। আচমকা সম্বিত ফিরল কনস্টেবল ঊমেশের ডাকে।
“স্যার, ও বলছে ওর নাম আলিম উদ্দীন। আর ও কোন দিন নাকি চোলাইয়ের ব্যবসা করে নি।ঠিকে শ্রমিকের কাজ করে ও”।
রাগে ফেটে পড়লাম আমি। নিজেই চললাম জিজ্ঞেসাবাদের জন্য। দেওয়াল ঘড়িতে ঢং করে একতা বাজল। ঘরে গিয়ে দেখলাম লোকটা পড়ে আছে। যন্ত্রণায় গোঙাচ্ছে, পাশের ঘরের লাইটের আলো ঠিকরে এসে পড়েছে এই ঘরটায়- এ ঘরে আলো নেই, শুধু একটা আলো আঁধারের খেলা।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “ কিরে তুই চোলাই মদের ব্যবসা করিস না”।
“না স্যার”
“ফের মিথ্যা কথা”।
“কয়েক ঘা বসিয়ে আবার জিজ্ঞেস করলাম, “মেছো বাজারের রাজু, মিজান, বাদল, সেলিম আলী ওরা রোজ তোর ঘরে এসে মদ খায় আর তোর বউকে নিয়ে…।
লোকটা ঢুকরে কেঁদে উঠল।
“না স্যার, সে আমি নই স্যার”।
ঊমেশ পাশে ছিল। আসামির এতবড় দৃষ্টতা তার সইলো না। সে আসামীর পিঠ লক্ষ্য করে পা চালালো। কিন্তু হঠাৎ আসামী পাশ ফিরতেই পিঠে না লেগে বুটের লাথি সোজরে গিয়ে আঘাত করল ওর বুকে।গল গল মুখ নাক দিয়ে বেরিয়ে এল রক্ত। লোকটা হুমড়ি খেয় মাটিতে পড়ে গেল।
“তারপর”
তারপর খানিকক্ষণ দম নিলাম আমি। বোতলের বাকি জলটুকু খেয়ে একটা সিগারেট ধরালাম। ডাক্তারবাবুকে সিগারেট শেষ হয়েছ। আমি ডাক্তারবাবুকে ‘অফার’ করলাম। তিনি নিলেন না। আমি আবার বলতে শুরু করলাম।
তারপর খাতাপত্রে আসামির নামধাম লিখে পরের দিন কোর্টে চালান করে দিলাম। কোর্টে বিচার হলো প্রায় দিন পনের পরে । আসামি কোন উকিল রাখতে পারেনি। আমার কাগজপত্রের জোরে আর বিপক্ষের উকিলের জেরায় জেল হলো তিন বছরের।
এরপর মাস খানেক পরে একদিন সকালে প্রদীপ বিশ্বাস এসে হাজির। কানে কানে বলল, “স্যার একটা ভূল হয়ে গেছে।
জিজ্ঞেস করলাম, “কি রকম?”
“হ্যাঁ স্যার এর নামই আলিম উদ্দীন। এ চোলাই মদের ব্যবসা করতো না। করতো ওর পাশের বস্তির কলিম উদ্দীন। আপনারা ভূল করে ধরে নিয়ে এসেছিলেন। কলিম উদ্দীনের খোঁজ আমি নিয়েছিলাম। আলিম উদ্দীন “অ্যারেস্ট’ হওয়ার পর থেকে ওকে আর পাওয়া যাচ্ছে না। ওর বউও উধাও। আসলে কলিম উদ্দীন ছিলো আসামি কিন্তু জেল হলো আলিম উদ্দীনের। কি করা যায় বলুন তো?”
মিনিট পাঁচেক গুম হয়ে বসেছিলাম আমি। তারপর প্রদীপকে কানে কানে বললাম, “কুছ পরোয়া নেই, তুম আপনা জবান বন্ধ রাখনা”।
হেঁ হেঁ হেঁ করে বিনয়ে গদগদ হয়ে প্রদীপ হেসে চলে গেল। তারপর অনেকদিন কেটে গেছে। থানা পুলিশ আসামি ফরিয়াদির ঘেরা টোপের জীবন আমার শেষ হয়েছে আজ। আজ আমি জীবন্মৃত অবস্থায় আছি। “ডাক্তারবাবু আমাকে ভালো করে পরীক্ষা করে বলে দিন-এ রোগ কি আমার সারবে না?” মৃদু হেসে ডাক্তারবাবু পুরু কাঁচের চশমাটা এঁটে আমার নাক, কান, চোখের পাতা, আঙুল, পায়ের গোঁড়ালি, হাঁটুর গিট খুব ভালো করে পরীক্ষা করতে লাগলেন।
বাইরে অবিশ্রান্ত ঝড় থামেনি এখনও। ওয়ালক্লকটা টিক্ টিক্ টিক্ টিক্ শব্দে প্রহর গুনে চলছে। আর আমার হৃদপিণ্ডটা কোনো এক আজানা আশঙ্কায় কাঁপছে।
ডাক্তারবাবু গলা ঝেড়ে বললেন, “মিঃ বন্দোপাধ্যায়, এ রোগ আপানার ফ্যামিলির কারও আছে”।
“না”। গলাটা সামান্য কেঁপে উঠল আমার।
ডাক্তারবাবু কি একটা কাজে ঘরের ভিতরে গেলেন। আমার সারা দেহ কাঁপছে। হঠাৎ চোখে পড়ল ওই দূরে দেয়ালে টাঙানো একটা বিভৎস চেহারার কুষ্ঠ রোগীর ছবি দেখতে ঠিক যেন আলিম উদ্দীনের মত। খোঁচা খোঁচা দাঁড়ির মাঝে ক্রুর চাহনি। নাক কান গলা সব ফুলে সারা। আমার কেমন ভয় করতে লাগল। আমার মনে হলো ছবিটা যেন জীবন্ত হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে হাঃ হাঃ হাঃ… আমি চিৎকার করে উঠলাম।