স্বপ্নে দেখা মন্দিরের অনুরূপে নবাবাহাটে ১০৮ মন্দির স্থাপন করেছিলেন মহারাণী বিষ্ণু কুমারী
সময়ের সাথে সাথে বিলীন হয়ে যায় জনপদের গরিমা, কিন্তু বাংলার লোক-সংস্কৃতির প্রভাব এবং ঐতিহ্যের পটভূমিতে আজও সে সব জনপদের অনেক ঘটনা বা ইতিহাসকে অস্বীকার করা যায় না। আঞ্চলিক জনজীবনের সেই সব কিংবদন্তিকে ঘিরে আজও মানুষের মনে আসংখ্য প্রশ্ন। সেই রকমই একটি বিখ্যাত জনপদ রায় গুনাকর ভরতচন্দ্রের ‘আটহাত সোরগোল বত্রিশ বাজারের অন্যতম ‘নবাবহাট’। এখানেই অবস্থিত বর্ধমানের মহারাণী বিষ্ণুকুমারী প্রতিষ্ঠিত ১০৮ শিব মন্দিরটি। বর্ধমান রাজ বংশের অষ্টম পুরুষ মহারাজ তিলক চাঁদের পত্নী। বর্ধমানের রাজ মহিষীদের মধ্যে বিদুষী কলজয়ী প্রজ্ঞাশীল রাজ মহিষী ছিলেন মহারাণী বিষ্ণু কুমারী।
মহারাজ তিলকচাঁদের রাজত্বকালে একদিকে যেমন মোগল সাম্রাজ্যের আবসান ঘটেছিল, অন্যদিকে তেমনি ইংরেজ শক্তির অভ্যুদয়, সেই সঙ্গে মহারাষ্ট্র থেকে বার বার বর্গীদের আগমণ ও লুন্ঠন রাজ্যে নানা অশান্তির উদ্ভব হয়েছিল। তার রাজত্বকালেই দেশে দুর্ভিক্ষের সূচনা হয়েছিল। কোন কোন লেখক রাঢ়ভূমি বর্ধমান রাজ বাড়ীর রাজ কাহিনী লেখার সময় তিলক চাঁদকে ক্লান্ত দুর্বল, হীণ পৌরুষের অধিকারী বলে চিহ্নিত করতে চাইলেও সেই তত্ত্ব ও তথ্য যুক্তি গ্রাহ্য নয়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির তথ্য থেকে জানা যায় তৎকালীন বঙ্গদেশে তাঁর মত পরাক্রমশালী বড় ভূস্বামী আর কেউই ছিলেন না। তিনি ছিলেন ৭৫ টি পরগণার ভূপাল। বার্ষিক রাজস্ব দিতেন ৪৩,৫২,৫৫২ টাকা। তিনি প্রজাবর্গের হিত সাধনের জন্য রাজ্যের চরম পরিস্থিতির মধ্যেও রাজ্যকে রক্ষা, সেই সঙ্গে প্রজাদের হিত সাধনের জন্য সমানভাবে আত্ম সচেতনার সঙ্গে রাজকার্য করে গেছেন।
মহারাজ তিলক চাঁদের পরামর্শ দাতৃরূপে সব সময়ের জন্য তার পাশে পাশে থাকতেন মহারাণী বিষ্ণু কুমারী। আক্ষরিক অর্থে মহারাণী বিষ্ণু কুমারীকে শুধুমাত্র রাণী বলে চিহ্নিত করলে আদর্শ পরায়ণা, তেজস্বিনী রাজ মহিষী বিষ্ণু কুমারীর প্রতি অবিচার করা হবে। কোন রকম অন্যায়ের সঙ্গে মহারাজ তিলক চাঁদ যেমন আপোষ করেন নি, তেমনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়া লড়াই করে গেছেন মহারাজ তিলকচাঁদের পত্নী রাণী বিষ্ণু কুমারী। স্বামীর পাশে পাশে থেকে রাজ্য পরিচালনার কূটকৌশল আয়ত্ব করেছিলেন বলেই তিলক চাঁদের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে সবরকম শোক ও বিহ্বলতাকে ভুলে বর্ধমানের শাসনভার পুত্র তেজচাঁদের অভিভাবিকা হয়ে নিজের হাতে তুলে নিয়েছিলেন নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী বাদশাহের সঙ্গে কোনরকম যোগাযোগ করার আগেই তিনি এলাহাবাদে কোম্পানীর মাসিক বৃত্তিভোগী বাদশাহ শাহ আলমের আজ্ঞাবহ তাঁর প্রধান সেনাপতি সরফত উদৌলা মীর খাঁর মোজরফর জঙ্গ মোহর সহ ফরমান পুত্র তেজ চাঁদের অনুকুলে নিয়ে এসে বর্ধমানের রাজ সিংহাসনের ভিতকে শক্ত করেছিলেন বাদশাহকে এককালীন দশ সহস্র টাকা নজরানার বিনিময়ে।
মহারাজা তিলকচাঁদ পরলোক গমন করেছিলেন মাত্র ৩৭ বছর বয়সে। মহারাণী বিষ্ণু কুমারীর বয়স তখন বাইশ। মহারাজা তিলক চাঁদ যেভাবে লর্ড ক্লাইভকে সামরিক সাহায্যদানে অস্বীকার করেছিলেন, এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীকে তার এলাকাতে সব ব্যবসা বন্ধ করে দিয়েছিলেন, সেই পথ অনুসরণ করে নিজ রাজ্য রক্ষার জন্য মহারাণী বিষ্ণু কুমারী মহারাজ নন্দ কুমারের পরামর্শ গ্রহণ করে ১৭৭২ খ্রীষ্টাব্দে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর গর্ভণর ওয়ারেন্ট হেষ্টিংস এর সর্বগ্রাসী ক্ষুধার লালসা থেকে স্বীয়ধীশক্তি ও বুদ্ধিমত্তা দিয়ে বর্ধমানকে রক্ষা করেছিলেন।
এরপর পুত্র তেজচাঁদ রাজ্য ভার গ্রহণের পর দারুণভাবে উচ্ছৃঙ্খল হয়ে উঠেন। কোম্পানীর রাজস্ব বাকী পড়ায় ১৭৮৯ খ্রীষ্টাব্দে বাকী খাজনার জন্য ১৭৮৯ খ্রীষ্টাব্দে বরদাচিতুয়া প্রাকাশ্য নিলামে বিক্রি হয়ে যায়। রাজ্যের মধ্যে বিশৃঙ্খলা দেখা দিলে শান্তি রক্ষার জন্য সদগুরু বিচক্ষণ পণ্ডিতের উপদেশ গ্রহণের জন্য নদীয়ার প্রসিদ্ধ পণ্ডিত শ্রীকান্ত তর্কলঙ্কারের কাছে উপদেশ ও নির্দেশ প্রার্থনা করেন। শ্রীকান্ত তর্কলঙ্কার মহারাণী বিষ্ণু কুমারীকে সঙ্কট মচোনের জন্য নিত্য শিব পূজা সহ একশত ন’টি শিবের একটি সংস্কৃত প্রার্থনা স্তোত্র পাঠিয়ে পাঠ করার পরামর্শ দেন।
খাজনা বাকীর দায়ে প্রাকাশ্য নিলামে বেশ কয়েকটি মাহাল বিক্রি হয়ে যাওয়ায় মহারাজ তেজচাঁদের সম্বিতও ফেরে। বিরাট রাজপ্রাসদে তিনি বন্দী হয়ে রয়েছেন বলে নিজেকে মনে করতে থাকেন। চিন্তিত তেজচাঁদের বিষন্ন মুখের দিকে তাকাতে পারেন না মহারাণী বিষ্ণু কুমারী। এরই মাঝে মহারাণী বিষ্ণু কুমারী একদিন স্বপ্ন দেখেন সুন্দর একটি রমনীয় স্থানে বহু মন্দিরের সমাবেশে তিনি যাগযজ্ঞ সহ মন্দিরে মন্দিরে শিবের পূজার্চ্চনা করছেন।
ধর্মপরায়ণা, তেজস্বিনী, নীতিজ্ঞান সম্পন্না বিদূষী মহারাণী নবাবহাটে স্বপ্নে দেখা মন্দিরের অনুরূপ শ্রীকান্ত তর্কলঙ্কারের শ্লোক মত ১০৯ টি শিব মন্দির স্থাপন করে লক্ষাধিক ব্রাহ্মণকে বর্ধমানে সমবেত করেছিলেন। পুত্রের সুবুদ্ধি কামনার জন্য ব্রাহ্মণ পণ্ডিতগণের কাছে আর্শীবাদ কামনা করেছিলেন। পুত্র তেজচাঁদকে তিনি নির্দেশ দিয়েছিলেন- রাজ সম্মান ও ঐতিহ্যকে রক্ষার জন্য শিব মন্দির প্রতিষ্ঠার দিন মন্দিরে অবস্থান করে শুদ্ধচিত্তে ব্রাহ্মণ আপ্যায়ণ ও পদধুলি গ্রহণ করে সমবেত ব্রাহ্মণগণের কাছ থেকে আর্শীবাদ কামনা করতে। ১০৯ শিব মন্দির নির্মিত হয়েছিল ১৭৮৯ খ্রীষ্টাব্দে। মহারাজ তেজচাঁদ মায়ের নির্দেশ পালন করেছিলেন। মন্দির প্রতিষ্ঠার দিন আগত লক্ষ ব্রাহ্মণের পদধূলি যত্ন সহকারে রাজ অন্তঃপুরে রেখে দিয়েছিলেন মহারাণী বিষ্ণু কুমারী। পরবর্তীকালে বর্ধমানে সংস্কৃত পণ্ডিতগণের একটি মহামণ্ডল প্রতিষ্ঠার জন্য ভারত বিখ্যাত একটি চতুষ্পাঠী গড়ে দিয়েছিলেন মহারাজ তেজচাঁদ। সেই চতুষ্পাঠীতে কর্ণাট, মহারাষ্ট্র, মিথিলা থেকে অনেক বিদ্যার্থী অধ্যায়ণের জন্য আসতেন।