|| শাম্ভবী সংখ্যা ২০২১ || শারদ সংখ্যায় ধ্রুবজ্যোতি মিশ্র

নতুন জামা
দৃশ্য -১
অনিমেষের হাতে ক্যামেরার ফোকাসটা স্থির করে ধরা।মহালয়ার পড়ন্ত বিকেলে শহরের ব্যস্ত কালো রাস্তায় পুজোর বাজারের ভিড়ের মাঝখান দিয়ে একটি মেয়ে ছুটে চলেছে। আজ অনেকদিন পর তার মুখে হাসির রেখা—- এক হাতে কিছু টাকা, অন্য হাতে একটা নতুন জামা।পিছনে একটা ট্রাম আসছে খটাং খটাং আওয়াজ করে। পরিচালক দত্তবাবু হঠাৎই কাট কাট বলে চিৎকার করে ওঠে। অনিমেষ মুখ সরিয়ে নেয় ক্যামেরার লেন্স থেকে।আশেপাশে লোকে লোকারণ্য, বস্তির মানুষেরা অবাক নয়নে চেয়ে দেখছে শ্যুটিং, কত বড়ো বড়ো গাড়ি, কত আলো। ছোট্ট রাখি পথের মাঝখানে বসে হাঁপাতে থাকে, অস্ফুট স্বরে বলে,” কি, এবারও হলো না? “
দত্তবাবু এগিয়ে যায় গুটিগুটি পায়ে। হাতে জলের বোতল আর গ্লুকোজের প্যাকেট।বসে পড়ে রাখির পাশে। জলের বোতলটা এগিয়ে দেয় রাখির দিকে,জলটা পেয়েই হাসি মুখে রাখি তৃষ্ণার্ত পথিকের মতো ঢকঢক করে জল খায়, কিছুটা চোখেমুখেও দেয়।দত্তবাবু এবার রাখিকো বোঝাতে শুরু করে, “রাখি, মুখের অভিব্যক্তিটা আরও ফুটিয়ে তুলতে চেষ্টা কর, ভাবো তুমি আবার কতদিন পর একটা নতুন জামা পেয়েছ।” রাখি মাথা নাড়ে, বলে ঠিক আছে। শুরু হয় আবার সেই দৌড়। অনিমেষের হাতের ক্যমেরায় রেকর্ড হতে থাকে সেই দৌড়।
এবার কিন্তু কাট কাট না বলে রেকর্ডিং শেষে দত্তবাবু ওয়ান্ডারফুল বলে ছুটে এসে রাখিকে জড়িয়ে ধরে। হাতের ইশারায় সবাইকে প্যাক-আপ করতে বলে।রাখি সহ দত্তবাবু এবার অন্যান্য সকলকে বলে আগামীকাল কিন্তু কফি হাউসের সামনে।সকাল ন’টায় বেরতে হবে, সবাই তৈরি থেকো। এক এক করে সকলে বেরিয়ে যায়।
দৃশ্য – ২
অনিমেষের ক্যামেরার ফোকাসটা এবার হাড় কঙ্কালসার কিশোরের শরীরের দিকে।রবিবার কলেজস্ট্রীটের ফাঁকা রাস্তায় প্রেসিডেন্সি কলেজের ফুটপাতে।এক কিশোর ল্যাম্পপোস্টে লাগানো পুজোর স্টীকারগুলো তুলে নিয়ে নিজের অস্থিচর্মসার শরীরে লাগিয়ে চলেছে একমনে, আর চোখের কোনায় জলের রেখা দেখা দিয়েছে। সেটাও নিখুঁত ভাবে ধরা পড়েছে ক্যামেরার লেন্সে।দত্তবাবু অ্যাকশন বলতেই শুরু হয় রেকর্ডিং।
অনিল- এই কি নাম রে তোর?
শিশু – রাজু।
অনিল- কোথায় থাকিস?
রাজু- ঐ যে ফুটপাতে, দেখতে পাচ্ছ না ঐ যে ছেঁড়া ত্রিপলটা, ওটাই আমার বাড়ি গো।
অনিল(গুরুগম্ভীর গলায়)- হুম্ বুঝলাম, তো এইগুলো গায়ে লাগাচ্ছিস কেন?
রাজু কান্না মাখানো গলায়- নতুন জামা প্যান্ট কোথায় পাব? কেউ তো দেয় না গো।কিছুটা আমি নিলাম আর কিছু টা বোনকে দিলাম। এবার ঠাকুর দেখতে যাব।অনিল বাকরুদ্ধ হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে।
রাজু- কাকু তুমি দেবে গো আমাকে আর বোনকে একটা নতুন জামা প্যান্ট কিনে? কতবছর নতুন কিছু পড়িনি।
ছেঁড়া প্যান্টটা দেখিয়ে বলে,” এবার এই প্যান্টটা ছিঁড়ে গেছে, বর্ষার সময় একজন দিয়েছে তাও পুরনো।
অনিল রাজুকে জড়িয়ে ধরে বলে, ” হ্যা রাজু চল, আজ তোকে একটা নতুন জামা প্যান্ট কিনে দেব।”
এরপরই গল্প অনুযায়ী ক্যামেরার ফোকাস ঘুরতে থাকে শহরের ফুটপাতের দিকে।আশেপাশে উলঙ্গ শিশুদের করুণ মুখ, শতছিন্ন কাপড়ে মেয়েরা নিজেদের লজ্জা ঢাকতে ব্যস্ত। এবার পরিচালকের ইশারায় অনিমেষ রেকর্ড করতে থাকে এই তিলোত্তমা কোলকাতার নীল আকাশে পুজোর আগে বড়ো বড়ো সারিবদ্ধ হোর্ডিং আর হাজারো কাপড়ের দোকানের মনভরা পোস্টারের রংবেরঙের ছবিগুলোকে আর কফি হাউসের গেট থেকে বেরিয়ে আসা কুন্ডলী পাকানো মুখ থেকে ধোঁয়া বের করা দামী পোশাক পরিহিত ছেলেমেয়েরা।শ্যুটিং শেষে নীলাঞ্জনা প্রোডাকশন হাউসের প্রধান নন্দিতাদি ফুটপাতের শিশুদের জন্য একলাখ টাকার একটা চেক তুলে দেয় নিবেদিতা ফাউন্ডেশনের প্রধান সুশান্ত রায়ের হাতে, এক বৃদ্ধ এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করে “আবার কবে আসবি তোরা? তোদের জন্য আজ একটু খেতে পেলাম, নতুন জামা কাপড় পেলাম, নয়তো এই দিকে তো কেউ ফিরেও চায় না।” এসব শুনে সবার চোখের পাতাটা কেঁপে ওঠে। একে একে কালোরাস্তার বুক চিরে এগিয়ে যেতে থাকে গাড়িগুলো।
পরদিন বিকেলে পরিচালক দত্তবাবু উদাস মনে এক দৃষ্টিতে ছোট্ট জানালা দিয়ে নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। হাতে গরম চায়ের কাপ, আর মিউজিক প্লেয়ার থেকে ভেসে আসছে শানের গলায় রবীন্দ্র সঙ্গীত
“শুধু যাওয়া আসা, শুধু স্রোতে ভাসা,
শুধু আলো-আঁধারে কাঁদা হাসা।।
শুধু দেখা পাওয়া, শুধু ছুঁয়ে যাওয়া,
শুধু দূর যেতে যেতে কেঁদে চাওয়া,
শুধু নব দুরাশায় আগে চলে যায়–
পিছে ফেলে যায় মিছে আশা।।”
আপনমনে দত্ত বাবু বলে ওঠে, জানতো গিন্নি, এই সিনেমার গল্প লেখা আর রাস্তায় নেমে সেটাকে বাস্তব রূপ দেওয়া আকাশ পাতাল ফারাক।লেখক তো লিখেই খালাস, তারপর ঝামেলা যাত পরিচালকদের। আগামীকাল বতুন অনুচ্ছবির মহড়া, কি যে হবে ঈশ্বরই জানেন।
পরদিন মহড়া শেষে সভাগৃহে দত্তবাবুর জয় জয়কার, সাংবাদিকরা ঘিরে ধরেছে তাঁকে, দত্তবাবুর পাশে দাঁড়িয়ে ছোট্ট রাখির মুখে আজ একরাশ হাসি। এক এক করে খ্যাতনামা পরিচালক, প্রযোজক, অভিনেতা, অভিনেত্রীরা শুভেচ্ছা জানাচ্ছে। চারিদিক থেকে শুধু ক্যামেরার ঝলকানিতে ঠিকরে পড়ছে চোখ।
বেশ কিছুদিন পরে নন্দনের সভাগৃহে কোলকাতা ফ্লিমফেয়ার অনুষ্ঠানে অনু ছবির শ্রেষ্ঠ পুরস্কার হাতে নিয়ে দুহাত শূন্যে ছুঁড়ে দত্তবাবু রাখিকে বলেন, আজ আবার অনেকদিন পর রাখি শুধু তোর জন্য, শুধু তোর জন্য —–
পিছনের পর্দায় তখন চলছে পড়ন্ত বিকেলে শহরের ব্যস্ত কালো পিচঢালা রাস্তায় পুজোর বাজারের ভিড়ের মাঝখান দিয়ে একটি ছোট্ট মেয়ে ছুটে চলেছে। আজ তার মুখে হাসির রেখা।।