T3 || স্বাধীনতার খোঁজে || বিশেষ সংখ্যায় দিলীপ কুমার ঘোষ

উন্মাদনা

স্বাধীনতা দিবসের আর বেশি দিন বাকি নেই। গত বছর স্বাধীনতা দিবসের সকালে যে অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হয়েছিল তাতে এ বছর ১৫ অগস্ট যে বাধ্যতামূলকভাবে স্কুলে যেতে হচ্ছে না, সেটা অনেকটা আশীর্বাদ বলতে হবে। তবে প্রত্যেক বছর স্বাধীনতা দিবসের মাসখানেক আগে থেকেই অন্তর্জগতে যে আলোড়ন শুরু হয়ে যায়, সেটা এ বছরেও শুরু হয়ে গেছে। সেই আবেগকে বকে-ঝকে ঠেকিয়ে রাখতে কিন্তু বেশ বেগ পেতেই হচ্ছে।
দিনকাল এখন এমনই দায়িত্ব না-চাপলে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে কেউ আর কিছু করতে চায় না। অবশ্য দায়িত্ব চাপলেও সেটাকে কীভাবে পাশ কাটিয়ে যেতে হয় সেটাও অনেকেই ভাল রকম রপ্ত করেছে। সাধারণ মানুষের কথা আর কী বলব, জাতি গড়ার কারিগর যে শিক্ষক সমাজ, তারা পর্যন্ত আজ কেমন গা এলিয়ে দিয়েছে! দায়িত্ব যাতে না নিতে হয়, তার জন্য তারা সদা সচেষ্ট। নিজে আটত্রিশ বছর শিক্ষকতা জীবন কাটিয়ে এসেও সহকর্মীদের সম্পর্কে যে এমন মন্তব্য করতে হচ্ছে, সেটা আমার নিজেরই খুব খারাপ লাগছে, কিন্তু কথাগুলো যে সবসময় মাথার মধ্যে ঘুরছে না— সে কথা আর অস্বীকার করতে পারছি কই!
“কী এত ভাবছ বলো তো?” কল্যাণীর জিজ্ঞাসায় সচকিত হয়ে ওর দিকে ফিরলাম।
“কল্যাণী, তুমি কখনও স্বাধীনতা দিবস পালন করেছ?”
হঠাৎ এমন প্রশ্নে হতচকিত হয়ে কল্যাণী বলল, “স্বাধীনতা দিবস…! পালন…! সত্যি কথা বলব, আমার অধিকাংশ সময় মনেই থাকে না স্বাধীনতা দিবস কবে? শুধু অন্যদিনের তুলনায় তুমি সকাল সকাল স্কুল বেরোও বলে আমার মনে হতে থাকে আজকে হয়তো স্বাধীনতা দিবস! তবে অনেক সময় স্বাধীনতা দিবসকে ২৩ জানুয়ারি, প্রজাতন্ত্র দিবস অথবা স্কুলের প্রতিষ্ঠা দিবসও ভেবে বসি! কারণ এই দিনগুলোতেও তুমি সকালের দিকে স্কুলে যাও।”
“তুমি স্কুলে পড়ার সময় কখনও ১৫ অগস্ট স্কুলে যাওনি?”
“না।”
“না! কিন্তু আগেকার দিনে তো ছেলেমেয়েরা প্রায় প্রত্যেকেই স্বাধীনতা দিবস পালনের জন্য স্কুলে যেত! তুমি কোনও দিন যাওনি কেন?”
“কেন যাইনি, তা কী আর ছাই মনে আছে! তবে শুধু আমার কথা কী বলছ, তোমার ছেলেমেয়েরাও কি কোনওদিন স্বাধীনতা দিবসে স্কুলে গেছে নাকি!”
“কী বলছ, ইমন-কল্যাণ কখনও ১৫ অগস্ট স্কুলে যায়নি!”
“তা’লে আর বলছি কী! তবে শুধু স্কুলে পড়ার সময়ই নয়, ওরা কোনও দিনই কোথাও স্বাধীনতা দিবস পালনের জন্য উপস্থিত হয়নি।… দিনটা ছুটির দিন হিসাবেই আমরা সকলে দেখেছি এবং ছুটির মেজাজেই কাটিয়েছি। সকাল থেকে সময় নিয়ে ভালমন্দ রান্না করেছি, দুপুরে জমিয়ে ঘুমিয়েছি, বিকালে বা সন্ধ্যাবেলায় মন চাইলে একটু কোথাও ঘুরেও এসেছি। তুমি অবশ্য সঙ্গে কখনও যাওনি। চুপচাপ তোমার পড়ার ঘরে বসে দেশাত্মবোধক গান শুনে কাটিয়েছ।”
এমন নিদারুণ বাস্তব জেনে আমি বেশ অবাক হয়েই গেলাম। যে-আমি জ্ঞান হওয়ার পর থেকে এই ষাট বছর বয়স পর্যন্ত কখনও স্বাধীনতা দিবস পালনের কোনও না কোনও অনুষ্ঠানে উপস্থিত হওয়া থেকে নিজেকে বিরত রাখিনি, তার স্ত্রী-সন্তানেরই কিনা এই অবস্থা! আমি সহকারী শিক্ষক হিসাবে প্রত্যেক বছর স্কুলে স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকেছি। আর যেদিন থেকে প্রধান শিক্ষক হিসাবে স্কুলের দায়িত্বভার চেপেছে নিজের কাঁধে, আমার সহকর্মী এবং প্রিয় ছাত্রছাত্রীদের ১৫ অগস্ট বিদ্যালয়ে উপস্থিত হওয়ার জন্য উৎসাহিত করেছি। সেই উৎসাহ অবশ্য অনেকাংশে আমাতে শুরু হয়ে আমাতেই শেষ হয়ে গেছে! সে অবশ্য স্বতন্ত্র প্রসঙ্গ। কিন্তু আজ আমি এ কী জানলাম! আমার নিকটাত্মীয়রাই কিনা স্বাধীনতা দিবস এইভাবে পালন করে! একেই বোধহয় বলে ঘরামির ঘর ছ্যাঁদা।
গতবছর সকাল আটটায় যখন স্কুলে গিয়ে উপস্থিত হয়েছিলাম, পরিতোষ এসে উপস্থিত হয়নি। যদিও ওকে আগের দিন রাতে ফোন করে জানিয়েছিলাম আমি অবশ্যই আটটার মধ্যে পৌঁছে যাব। গুইরামদা যতদিন ছিল, আমাকে আর আলাদা করে কিছু বলতে হত না। নিজের গরজেই সকাল সাতটাতেই স্কুল খুলে সব জোগাড় করে রাখত। অবসরগ্রহণের পরও যতদিন স্কুলে আসার মতো সুস্থ ছিল গুইরামদা ঠিক হাজির হত। এমনকি মারাত্মক অসুস্থ হওয়ার আগে গত বছরও এসেছিল। গুইরামদারা আসলে স্কুলকে ভালবেসে নিজের বাড়ির মতো ভাবত। আর নিজেরাও অজান্তে স্কুলের অংশ হয়ে যেত। ভুলে যেত যে, তারা স্কুলে চাকরি করতে আসে। কাজের দায়িত্ব সাংসারিক কর্তব্যের মতো পালন করত। স্কুলকে কর্মস্থল হিসাবে দেখার হিসেবি ভাবনা কখনও মাথায় চেপে বসতে দিত না।
আমি মিনিট পাঁচেক স্কুলের বাইরে অপেক্ষা করার পর পরিতোষকে ফোন করলাম। পরিতোষ বলল, “ওহ্ স্যার, আপনি এসে গেছেন! আমি পাঁচ মিনিটের মধ্যেই যাচ্ছি। আসলে ছুটির দিন বলে একটু দেরি করে ঘুম থেকে উঠেছি!”
ওর বাড়ি স্কুল থেকে হাঁটাপথে পাঁচ মিনিট, সাইকেলে মিনিট দুয়েক। সেখানে আধঘণ্টা মোটরবাইক চেপে আমি স্কুলে পৌঁছেছি।
পরিতোষ মিনিট দশেক পরে এল। কিন্তু আর কারও পাত্তা নেই। কোভিড পরিস্থিতিতে আমি কোনও ছাত্রছাত্রীকে আসার জন্য বলিনি। তবে আধঘণ্টার মধ্যে নিজস্ব যানে স্কুলে পৌঁছতে পারবে, এমন অন্তত আটজনকে আসার জন্য বলেছিলাম। তাদের মধ্যে পাঁচ-ছ’জন কোভিডের দোহাই দিয়ে সরাসরি জানিয়ে দিয়েছিল, তারা আসতে পারবে না। দু’-তিনজন অনুরোধ-উপরোধ ঠেলতে না-পেরে নিমরাজি হয়েছিল। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে দেখা গেল তারাও অনুপস্থিত।
সাড়ে আটটা বাজতেই দেখলাম পরিতোষ উশখুশ করছে। আর থাকতে না-পেরে বলেই বসল, “স্যার, পতাকাটা এবার তুলে ফেলুন। আমি ন’টার সময় পাশপুকুরে মাছ ধরতে যাব।”
“পতাকা তো তুলব, কিন্তু তুমি তো দেখছি জোগাড়পাতি কিছুই করোনি! এই জন্যই তো আমি তোমাকে আমার আসার আগে পৌঁছে সব গুছিয়ে রাখতে বলেছিলাম। নিদেনপক্ষে ইট দিয়ে বেদি বানিয়ে, বাঁশটা তো অন্তত পুতে রাখতে পারতে!… পতাকাটাও তো বের করোনি দেখছি। ফুল-বাতি-ধূপ-মালা সেসবই বা কোথায়!”
“আপনি তো স্যার এসব জোগাড় করার কথা আমায় কিছু বলেননি।”
“ওহ্, এসব আবার আলাদা করে বলার দরকার হয় নাকি! কবেই বা আমি এসব বলেছি। গুইরামদাই তো নিজে থেকে এতদিন সব জোগাড়পাতি করে রাখত। আমি শুধু কত খরচ হয়েছে জেনে ওকে টাকাটা দিয়ে দিতাম।… কী হল, দাঁড়িয়ে রইলে কেন? সব জোগাড়পাতি করে ফেলো।”
বললাম বটে, কিন্তু পরিতোষের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ দেখে মনে হল এসব ওর দ্বারা হওয়ার নয়। ও কেমন ভেবলে দাঁড়িয়ে আছে। যখন ভাবছি নিজেকেই হাত লাগাতে হবে, ঠিক সেই সময় স্কুলের মাঠে এসে হাজির ভবাপাগলা। ভবাপাগলাকে সকালের ঝকঝকে রোদের মধ্যে দেখে অদ্ভুত লাগল। ওর গায়ে একটা ময়লা লুঙ্গি আর মুখে কাপড়ের মাস্ক। আমি আর পরিতোষ অফিস রুমের বাইরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে কথা বলছিলাম। জাতীয় পতাকার বাঁধানো ফটোটা আনব বলে আমার রুমে গেলাম। বেরিয়ে দেখি ভবাপাগলা অনান্য বছর যেখানে পতাকা তোলা হয় সেখানে গোটা কুড়ি ইট ইতিমধ্যে এনে হাজির করেছে। তারপর তিন ধাপের একটা বেদিও ও দেখতে দেখতে তৈরি করে ফেলল।
আমি পরিতোষকে বললাম, “যাও,শাবলটা দিয়ে গর্তটা খুলে ফেলো। তার আগে বাঁশটা আর পতাকাটা বের করে আমাকে দাও। আংটার মধ্যে পতাকার দড়িটা আমি ঠিক করে লাগিয়ে দিচ্ছি।”
শাবল নিয়ে পরিতোষকে আর যেতে হল না, ভবাপাগলা ওর হাত থেকে শাবলটা নিয়ে গর্ত খুলতে লেগে গেল। তারপর আমার হাত থেকে পতাকা লাগানো বাঁশটা নিয়ে পুততে শুরু করল। আমি একটা দু’শো টাকার নোট বার করে পরিতোষের হাতে দিয়ে বললাম, “তুমি চট করে জিনিসপত্রগুলো এনে ফেলো।”
আমরা তিনজন বেদির সামনে দাঁড়ালাম। বেদির উপর বাঁশে ঠেস দিয়ে বাঁধানো ফটোটা রেখে কিছু ফুল বেদি এবং বেদির সামনে ছড়িয়ে দিয়ে বীর শহীদ ও স্বাধীনতা সংগ্রামীদের স্মরণ করে ‘বন্দেমাতরম’ ধ্বনি উচ্চারণের মাধ্যমে পতাকা উত্তোলন করলাম। আমি পরিতোষকে মাল্যদান করতে বললাম। ভবাপাগলার হাতে ফুল তুলে দিতে ও বেদিতে ফুল ছুঁড়ে দিল। পতাকা উত্তোলনের পুরো সময়টা ও অবশ্য কপালে ডানহাত ঠেকিয়ে স্যালুটের ভঙ্গি করে দাঁড়িয়েছিল।
বাড়ি ফেরার সময় খুব খারাপ লাগছিল। এমন স্বাধীনতা দিবস পালন আমার জীবনে প্রথম। কষ্ট হলেও কিছু করার নেই ভেবে নিজেকে সান্ত্বনা দিলাম।
জুনে অবসরগ্রহণের পর আমার আর স্কুলে গিয়ে স্বাধীনতা দিবস পালনের দায়িত্বভার সামলাতে হবে না। ভাগ্যিস! নাহলে এবছরও অতিমারীর কারণে গত বছরের পুনরাবৃত্তি ঘটত, যা আমার পক্ষে মর্মবেদনার কারণ হয়ে উঠত।
এ বছর আমি কী করব ঠিক করে ফেললাম। ইমনকে শ্বশুরবাড়ি থেকে স্বাধীনতা দিবসের আগের দিন আসতে বললাম। একটা মেডিক্যাল ক্যাম্পে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হিসাবে যাওয়ার কথা দেওয়া আছে বলে ও আসার ব্যাপারে গাঁইগুঁই করছিল। কিন্তু আমার কথা ফেলতে পারল না। অফিস ছুটি আছে বলে কল্যাণ বাড়িতেই থাকবে জানতাম।
স্বাধীনতা দিবসের সকালে কল্যাণী-ইমন-কল্যাণের সহযোগিতা এবং উৎসাহ-উদ্দীপনায় সব উদ্যোগ-আয়োজন সুচারুরূপে সপন্ন করেও যেন কিসের অভাব অনুভব করছিলাম! মোটরবাইক চেপে বেরোলাম ভবাপাগলার খোঁজে। স্কুলের কাছে পৌঁছে দেখি স্কুলগেটের বাইরে বেদি সাজিয়ে একা দাঁড়িয়ে পতাকা উত্তোলন করছে ভবাপাগলা। দেখে আমার এমন ঘোর লাগল যে, স্কুলগেট বাইরে থেকে তালাবন্ধ কি না সেটা খেয়াল করতে ভুলে গেলাম।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।