সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে দেবদাস কুণ্ডু (পর্ব – ৫)

লড়াইয়ের মিছিল

পর্ব – ৫

‘আমার বয়স আশি। কল্যাণ বাবু বললেন,’ আমি শুধু ভাবতাম আমার চেয়ে কম বা বেশি বয়সের মানুষের নানা রোগ হচ্ছে। কারো কিডনি অসুখ কারো লিভারের অসুখ কারো হার্টৈর অসখ কারো ডায়াবেটিস। শালা আমার কোন অসুখ নেই। কেন? আমি কি মানুষ না?
‘এই রকম অদ্ভুত কথা কেউ ভাবে নাকি?’
‘আমি ভাবতাম। গরীব বড় লোক ফুটপাথের মানুষ সবার হচ্ছে। আমার কেন হচ্ছে না।
‘ আপনি তাহলে মনেপ্রানে চাইছিলেন আপনার একটা কিছু হোক।
‘সত্যি আমি চাইছিলাম। একদিন আমার এক বন্ধু তার বাবাকে আর জি কর হাসপাতালে ভর্তি করতে নিয়ে গেছে। ওনার পেচ্ছাব আটকে গেছে। সেদিন আমি সংগে ছিলাম। দেখলাম অসুস্থ মানুষ পোকার মতো কিলবিল করছে।
এই এতো মানুষের মধে আমি নেই। কেন নেই?
‘ আপনি মশাই অদ্ভুত মানুষ। কোন মানুষ চায় নাকি আমার অসুখ হোক।
‘ আমি চাইতাম। কেন জানেন?
‘কেন?
‘ এক সময় আমার মনে হয়েছিল আমি বেঁচে আছি তো?
‘কি আশ্চর্য কথা! তখন কি করলেন?
‘ স্ত্রীকে বললাম। ‘
‘ তিনি কি বললেন’
‘ পাগলামি শুরু করেছো না? ‘
‘ একদিন শুনলাম দও বাড়ির ছোট ছেলেটা আত্মহত্যা করেছে। তখন মনে হলো ও কেন
আত্মহত্যা করলো। ওর কি কোন অসুখ ছল?
নাকি কোন একটা কাইসিস ছিল। যেটা সে ওভারকাম করতে পারেনি। আমার কেন কোন কাইসিস নেই। সে কি আমি বড় লকের ছেছেলে বলে। পড়াশুনা করে প্রফেসর হয়েছি। সেই অর্থে আর্থে আমি অভাব কি কোনদিন বুঝিনি। তাই? তা হলে বড়লোক গুলো নার্স হোহোমে ভর্তি হচ্ছে। আশি পার করলাম। একদিন কোন একটা রোগ হলো না। জীবনটাকে তো বুঝতে পারলাম না। এইসব ভাবনা নিয়ে দিন কাটছিল। যাকে বলতাম সেই বলতো পাগল। হ্যাঁ ।একটা অসুখের জন্য আমি পাগল হয় গেলাম। গত সপ্তাহে আমি বাথরুমে পড়ে গেলাম।
‘আপনার বেন এত চাপ নিতে পারেনি। তা এখন কি মনে হচ্ছে আপনি বেঁচে আছেন তো?
‘ অবশ্যই। এবার বলি গিন্নি কেন বলেছিল তার দিকে আমি মনোযোগ দেই নি।
‘কেন?’
‘গিন্নি একদিন বললো দেখ আমার বুকে একটা ছোট্ট টিউমার হয়েছে। আমি টিপে টুপে বলি ব্যাথা হচ্ছে? সে বলল হচ্ছে। খুব হচ্ছে। আমি বললাম, তুমি নিশ্চিত থাকো। ওটা নন ম্যালিগন্যাট।সে বলল, মানে? আমি বলেছি, তুমি যে ভয় পাচ্ছে তা নয় এটা। সে বলল, তুমি কি ডাক্তার? আমি পরীক্ষা করতে চাই। আমি বলি, করো পরীক্ষা। কে বার্ন করেছে। পরীক্ষা হলো পনের দিন পর রিপোর্ট এল, ননম্যালিগন্টান। আমি বলি, কি হলো তো আমার কথা সত্যি?
গিন্নি বলল, এক জায়গায় রিপোর্টে আমি ভরসা করতে পারছি না। আমি অন্য এক জায়গায় করবো। আমি বলি, আরো অনেক জায়গায় করতে পারো। রিপোর্ট সেই একই আসবে। করলো পরীক্ষা। রিপোর্ট এল।
‘থামলেন কেন? সেই রিপোর্ট কি ছিল?
‘ ম্যালিগন্টান।’
‘ বলেন কি? তারপর কি করলেন?
‘নিয়ে গেলাম ডাক্তারের কাছে। ডাক্তার বলল, ওটা কি আপনাকে ডিসটাব করছে?’ না”
‘তাহলে আপনি ওটাকে ডিসটাব করবেন। ও থাক।’ ঐ যে ছোট্ট টিউমারটা বুকে থেকে গেল। আমি ওর বুক থেকে আউট হয়ে গেলাম। ‘
‘ সেটা কি রকম? ”
‘একদিনে সব গল্প বললে পরে তো আমাদের ঝগড়া করতে হবে’
‘কেন ঝগড়া করবো?’
‘গল্প করার বিষয়ের অভাব আছে নাকি?’
‘তার মানে আপনার স্টকে অনেক গল্প আছে বলুন।’
‘জানি না সেটা গল্প না জীবন যুদ্ধ?’
‘শুনুন কবি লেখকরা যে গল্প উপন্যাস লেখে সে
গুলি কি? জীবন যুদ্ধের গল্প। ‘
‘ আমি বলতে পারবো না। আমি তো পড়াশুনা করি নি করে বলি? আপনি প্রফেসর মানুষ। ‘
‘ আপনি সব সময় পড়াশুনা কথা বলেন কেন?
আপনাকে একটা গল্প বলি। এক পন্ডিত নৌকোয় উঠেছে। সে মাঝিকে জিগ্যেস করছে তুমি এই বইটি পড়েছো? মাঝি বলছে, না। আমি পড়িনি।আবার পন্ডিত জিগ্যেস করছে, এই বইটা পড়েছো? মাঝি উওর দিলো না। পন্ডিত একটা বিয়ের নাম বলে যাচ্ছে আর মাঝি না
না করে যাচ্ছে। পন্ডিত রেগে গিয়ে বলল, তোর
জীবন বৃথা। এদিকে আকাশে মেঘ করেছে। হাওয়া দিচ্ছে। নৌকো তখন মাঝ নদীতে। এখুনি ঝড় উঠলো বলে। মাঝি তখন পন্ডিতকে বলল, আপনে বাবু সাঁতার জানেন তো? পন্ডিত বলল, না। মাঝি তখন বলল, আমার থেকে আপনার জীবন বড় ব়থা। তখন পন্ডিত বলল, এখন আমার বাঁচা মরা তোমার হাতে। তুমি সাবধানে নৌকো পার করো। তাড়াতাড়ি। ঝড় আসার আগে। মাঝি তখন হাসছে। বুঝলেন কিছু?
‘বুঝলাম। তবে মানুষের জীবনে লেখাপড়াটা দরকার। খালি হাতে যুদ্ধ করে হেরে গেলে মনে হবে যদি পড়াশোনা জানতাম, তাহলে হেরে গেলে কষ্ট থাকে না? যুদ্ধের মাঠে অনেক সময় ধরে লড়াই করা যায়। আর খালি হাতে যুদ্ধ করতে যাওয়া হেমলক পান করার মতো।
‘ কথাটা আপনি ভুল বলেন নি। ছাতা ছাড়া বর্ষা র দিনে বের হলে পুরো ভিজতে হবে। আর ছাতা থাকলে ভিজতে ভিজতে অনেকটা পথ হাঁটা যাবে।

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।