স্মৃতিকথায় দেবযানী ঘোষাল

ঝাড়খণ্ড সফর

রাত সাড়ে দশটার ট্রেন যাত্রা ইয়োগা হাওড়া থেকে। আগের দিন আর সেদিন দুই জায়ের কেক কেটে জন্মদিন পালন দিয়ে শুরু যাত্রা। কখনো ধীর কখনো দ্রুত গতিতে চললো আমাদের রাঁচীগামী ট্রেন। ডিনারে লাচ্ছা পরোটা আর কাশ্মীরী আলুরদম উদরস্থ করে এসি থ্রি টায়ারে সাদা চাদরমুড়ি দিয়ে আধা ঘুম নিয়ে একসময় পৌঁছালাম রাঁচী স্টেশন। তখন ভোর পাঁচটা দশ। ভোর বলা যায় না। আকাশ বেশ ফরসা। স্টেশন ভর্তি মানুষ। ওয়েটিং রুমে বসার জয়গা হল অনেক পরে। খানিক্ষন বিশ্রামের পর আমাদের দুটো স্করপিও রওনা দিল নেতারহাটের পথে। শহর থেকে বেশ কিছুটা আসতেই পাহাড়ি পথ। দুদিকের পাথুরে সবুজ পাহাড়ের কোলে সবুজের তাজা শ্বাস আহরণ করে আমাদের তখন গন্তব্য প্রভাত বিহার হোটেল। ছিলাম আর্টিফিশিয়াল তাঁবুতে। যেখানে ছিল বড় মাকড়সা ছাড়াও নাম না জানা বড় বড় পোকামাকড়। স্নান সেরে দুপুরের খাবারের প্রতীক্ষা করতে করতে কখন যে ক্লান্ত দু’চোখ ঘুমে আচ্ছন্ন হল বুঝিনি। ছেলের ভিক্ষা মায়ের ডাকে ঘুম ভাঙলো। গেলাম ডাইনিং এ। সাদামাটা ভাত ডাল আলু ভরতা আর আলুভাজা সেবন করেই আবার ঘুরুঘুরু। কান্তির ঘুম নিষেধ। ঘুরতে গেছি। ঘুম কিসের? আমাদের স্করপিও চললো নেতারহাটের বিভিন্ন ঝরনা উপভোগের উদ্দেশ্যে। পথ চলতে দুপাশে কখনো ঘন জঙ্গল কখনো সারি সারি সুন্দরী গরানের অপরূপ শোভা। আবার কখনো সবেদা বাগান। কখনো ধুধু প্রান্তরের সুদূরে ধূসর পাহাড়। অনেকটা নীচে নেমে ছোট্ট একখানি ঝরনা দেখলাম এই প্রথম ঝাড়খন্ড সফরে। ফিরে এলাম প্রভাত বিহারের তাঁবুতেই একটু সন্ধ্যে নামতেই। উঁচু পাহাড়ের নীচে ও ওপরে সুসজ্জিত হোটেল। এইবার ওপরের হোটেলে সিঁড়ি বেয়ে ঝরে পরা গোলাপী কাগজফুলের অমূল্য আদরের আশ্বাস পেতে পেতে সেরে নিলাম ডিনার। ফ্রায়েডরাইস আর চিলি চিকেন। ভয়ে ভয়ে রাতটা কাটালাম যদি পোকা মাকড় আক্রমন করে! নাহ ভালই ঠান্ডা ঠান্ডা ওয়েদারে ঘুমটা হল। বৃষ্টি হয়েছিল যে! সকালে উঠেই সূর্যোদয় উপভোগ ও ফটোশ্যুট। তারপর ব্রেকফাস্ট। ডিমটোস্ট আর দুধ চা খেয়ে তল্পি তল্পা গুটিয়ে রওনা দিলাম লাদাখ ফলসে। অসাধারণ সৌন্দর্যে মোহিত হলাম। প্রচুর ভিডিও আর ফটো তুললাম। বেশ খানিক্ষন ওখানে থেকে আবার গন্তব্য অন্য হোটেল। যেখানে বিশালাকার লেক। তাই হোটেলের নাম সরোবর বিহার। প্রবল বৃষ্টি। বোটিং করা হল না। ছাতা মাথায় দেখলাম সরোবরের নৈসর্গিক সৌন্দর্য্য। এরপর আবার লাঞ্চ। ভাত ডাল আলুভাজা আর মাছভাজা। আবার তিনচার ঘন্টা জার্নি শেষে একটি সাইট সিন। সানসেট দেখবো কি? প্রবল বৃষ্টি। চলে এলাম হোটেলে। রাতের খাওয়া সেরে ঘুম দিলাম। সকালে উঠে ব্রাশ করে ব্রেকফাস্ট। লুচি পুরি ভাল লাগে না। তাই বাটার টোস্ট। সেজে গুজে বেরোলাম আবার। বেতলা ফরেস্ট বন্ধ। পরের দিনই খোলার কথা। অভিমান সবার চোখে মুখে। এবারের গন্তব্য ছিন্নমস্তা কালী দর্শন। ঝিরঝিরে পাহাড়ি বৃষ্টিকে সাথে নিয়ে আমাদের স্করপিও দুপুর সাড়ে বারোটা নাগাদ পৌঁছালো মন্দিরে। প্রায় সব মন্দিরের মতই এখানেও পান্ডাদের ইচ্ছাই সব। বিশাল লাইন। মায়ের দর্শন পেলাম না। সামনেই দশ বারো ফুট উঁচু বাবা ভোলানাথের পাথরের তৈরী লিঙ্গ। তাতেই পূজো দিলাম। মন্দির সংলগ্ন ধাবায় পুরি আর চানা খেলাম। খেলাম গরম পান্তুয়া। বৃষ্টি মাথায় গেলাম আর এক সুসজ্জিত হোটেলে। সেখানে ডিনার সেরে লম্বা ঘুম। সকালে উঠেই ব্রেকফাস্ট সেরে গন্তব্য অরন্যের দিনরাত্রি-র শ্যুটিং স্পট। অস্কার প্রাপ্ত পরিচালক সত্যজিৎ রায় ছিলেন ঐ ছবির পরিচালক। তির তির করে বয়ে যাওয়া দূরের ঝরনা বাহিত নদীর পাশে ছোট্ট বাংলো। সত্তরের দশকের সাদা কালো সিনেমার সাথে মিলিয়ে দেখছিলাম। ট্যুরিস্টদের জন্য অনেক বেশী সুসজ্জিত। এরপর লক্ষ্য হুড্রু ফলস। বয়ে চলা ঝরনার পাশে যে পাহাড়ি পাথুরে চওড়া অংশ, ওখানে জিরোচ্ছে বহু মানুষ। ওখানেই এক পাশে ভেজা কাঠ দিয়ে অসাধারণ শৈল্পিক নিপুনতায় শিল্পীর তৈরী হাতা, খুন্তি,ছোরা, ঘর সাজানোর টুকটাকি ইত্যাদি কিনতে ইচ্ছে হল। কিন্তু লংজিবিটি কম ভেবে কেনা হল না। ফিরলাম হোটেলে। ভীষণ ভীষণ আনন্দ উপভোগ করলাম শেষ দিনটা। প্রকৃতির অমোঘ দানকে প্রান ভরে আহরণ করে। দুপুর একটা ত্রিশে শতাব্দী এক্সপ্রেসে ব্যাক টু প্যাভিলিয়ন। যাবার দিন বুঝিনি রাত হয়েছিল বলে। আসার দিন উপভোগ করলাম পাহাড়ি ঢাল বেয়ে আমাদের শতাব্দীর দোদুল্যমান পরিষেবা। দুপাশে সবুজ সবুজ আর পাহাড়। আজীবন স্মৃতির অতলে স্বর্ণাক্ষরে রচিত থাকবে এমন সফরটি। রাত নটা দশে পৌঁছালো আমাদের শতাব্দী হাওড়া স্টেশনে। বাড়ি পৌঁছালাম সাড়ে দশটায়। আমাদের চোদ্দ জনের সবুজ সফর চিরদিন সবুজ বাতি জ্বালাবেই এমন অঙ্গীকারবদ্ধ আমরা।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।