নিবন্ধে ডরোথী দাশ বিশ্বাস

উৎসব নিয়ে কিছু কথা

উৎসব নিয়ে কিছু লিখবো- ভাবতে ভাবতেই দুর্গাপুজো শেষ হয়ে গেলো, কিন্তু তাতে কি, আরো উৎসব বাকি আছে এখনো।

উৎসব আসে, উৎসব যায়- থেকে যায় আনন্দের রেশ। উৎসব বলতে আমি বাঙালীর প্রধান উৎসব দুর্গাপুজো এবং তার সাথে দীপাবলি, শ্যামাপুজো, ভ্রাতৃদ্বিতীয়া সহ পুরো উৎসবের মাসকেই বুঝিয়েছি। একজন মানুষের জীবদ্দশায় তাঁর শৈশব, কৈশোর, যৌবন, বৃদ্ধবয়সের অর্থাৎ বিভিন্ন সময়ে পুজোর প্রকৃতি কিন্তু বিভিন্নরূপে প্রতীয়মান হয়। আনন্দের প্রকাশও তাই বিভিন্ন। বছরের অন্যান্যদিনের তুলনায় পুজোর দিনগুলি কিন্তু একেবারেই অন্যরকম। প্রকৃতিও যেন সেজে ওঠে শিউলি, শালুক , পদ্ম, কাশ- এই রকম বিশেষ ফুলে ফুলে, জলহীন হাল্কা মেঘে ভেসে বেড়ায় নীল আকাশে। ঝকঝকে রোদ, পুজোর মরসুমে কখনো প্রকৃতিতে থাকে বর্ষার আধিপত্য। ভিজে যায় গ্রাম ও শহর, কর্দমাক্ত পথ, মাটির সোঁদা গন্ধে বাতাস হয়ে উঠে ভারী। তবু মননে আনন্দের ঘাটতি হয়না কারো। এখানেই উৎসবের মাহাত্ম্য। ভোর থেকে সারারাত যখনই বৃষ্টি ছেড়ে যায় তখনই রাস্তায় ও পুজোপ্যান্ডেলে দর্শনার্থীর ঢল নেমে যায়। রাতের আলোকমালায় শুধু নয়, দিবালোকেও সুন্দর রিল্যাক্সে প্রতিমা দর্শণ চলে। যতোই বলো না কেন, এ কথা তো সত্যি, ঢাকের আওয়াজ কানে এলেই মনটা কেমন যেন নেচে ওঠে। নতুন পোশাকে পাড়ার বুঁচির মা-কেও কেমন সুন্দর লাগে। আর পাশাপাশি নিজেকে- হ্যাঁ, নিজেকে কি কম সুন্দর মনে হয়? পুজোর দিনগুলি সব কিছু ভালো লাগার দিন। পুজো মানে শুধু নতুন পোশাক তো নয়, পাশাপাশি চলে নানা রকম খাওয়া-দাওয়া। সেবার সপ্তমীর দিন ছেলের কলিগের বাড়ি নিমন্ত্রণ ছিলো। মেয়ের অন্নপ্রাশণ দেশের বাড়িতে সম্পন্ন হয়েছে বলে, সপ্তমী পুজোর দিন স্থানীয় ভাবে কয়েকজন আমরা নিমন্ত্রিত ছিলাম। সেখানে মধ্যাহ্ন ভোজনের মেনুতে ছিলো সুক্তো, ভেজ মুগডাল, পোস্ত ছড়ানো পটল ভাজা, ঘোলা মাছের গোলমরিচ দিয়ে রাঁধা হাল্কা ঝোল, সর্ষে ইলিশ, ক্রিস্টাল আমসত্বের চাটনী, রাজভোগ, সুস্বাদু আইসক্রীম। গৃহকর্তা নিজে হাতে সব রান্না করেছেন। ফ্রেশ রান্না তো, খেলাম তৃপ্তি ভরে। প্রতি বছর অষ্টমীর দিন আমাদের এক বন্ধুর বাড়ি খিচুড়ি খাওয়ার নিমন্ত্রণ থাকে। ওঁরাও নিজে হাতে অড়হড় ডালের সুস্বাদু ভুনো খিচুড়ি, মিক্সড্ সব্জি, চাটনি, পায়েস রেঁধে পরিবেশণ করে। ওখানে সাত আটটি পরিবার একসাথে হই। কারো কারো সাথে বছরে ঐ একটা দিনই দেখা হয়, কুশল বিনিময় সহ প্রচুর গল্প হয়। আমরা বন্ধুপত্নীর জন্য শাড়ি ও সকলের জন্য মিষ্টি নিয়ে যাই। এবার অষ্টমীর সকালে পাশের বাড়ির নমিতা তাঁর স্বামী প্রতুলবাবুকে বলছে, “হ্যাঁ গো, আজ কিন্তু রান্না করতে পারবো না, আজ রত্নদীপে বিরিয়ানী খাবো।” সত্যিই তো, কারই বা নিত্যদিন রান্না করতে ইচ্ছে করে? পুজো মানেই একটু নিয়মের ব্যতিক্রমও। আমি নিজে অবশ্য বাইরে খাই না। পুজোর সময় একটু বেশী যত্নসহকারে নানা পদ রাঁধতেই বেশী ভালোবাসি।দুর্গাষষ্ঠীর দিনই ফ্রাইড রাইস, ডিমের কারি, চিলি ফিশ রেঁধেছি। নতুন পোশাক পরে সেজে গুজে ঠাকুর দেখতে যাওয়া ও তার সাথে খাওয়া দাওয়া না হলে চলে না কি? তবে বুঝে সুঝে। পানীয় জল শুদ্ধ হওয়া চাই। বাইরের জল না খাওয়াই ভালো। আর নানা রকম পছন্দের খাবার, বেশী না খাওয়াই ভালো। ভালো লাগলেও বেশী খেয়ে ফেললে অসুবিধা হতেই পারে। কারণ এই সময় কায়িক পরিশ্রম অনেক কম হওয়ায় স্বাভাবিক ভাবেই দেহে খাদ্যের চাহিদা কম থাকে। খাদ্যগ্রহনের মোট পরিমাণের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখা একান্ত দরকার। আগে থেকেই এ বিষয়ে সচেতন হতে পারলে লাভ নিজেরই। আর একটি বিষয় হলো ঘুম। পুজোর আগে বাড়িঘর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন (যাকে বলে “ঘর ঝাড়া”) করার জন্য, বাগান পরিষ্কার, শরৎ আসার প্রাক্ মুহুর্তে বর্ষায় গজিয়ে ওঠা ঝোপঝাড়, বেড়ে ওঠা শাখা ছেঁটে ফেলা, মশারী সহ বিছানা পত্র, পর্দা, গালিচা- সব কেচে রোদে দেওয়া, সদ্য শেষ হওয়া বর্ষার পর আলমারীর কাপড়, চাদর- সব রোদে দেওয়া ইত্যাদি নানা রকম কাজের চাপ চলতে থাকলে, পুজোর আগে শাড়ির ফলস্ লাগানো, পিকো করা, ম্যাচিং ব্লাউজ কেনার ধকল, এরকম নানা করনীয় কাজ সেরে ফেলার তাড়ায় মানসিক চাপ বেড়ে গেলে, দৈহিক ও মানসিক ক্লান্তি যেমন আসে, তেমনি কমে যায় ঘুমের সময়। কিন্তু ঘুম কম হলে তো শারিরীক সুস্থতা বজায় থাকবে না। তখন সকল আনন্দই মাটি হবে। তাই প্রচন্ড ব্যস্ততার মাঝেও লক্ষ্য রাখতে হয় যেন সঠিক সময় পর্যন্ত ঘুম ঠিক হয়। ঘুম ঠিক হলে কর্মক্ষমতা বজায় থাকবে, টেনশন কম হবে, শারিরীক সুস্থতাও বজায় রাখা সহজ হবে। মহানগরীতে, এমনকি শিলিগুড়িতেও রাত জেগে পুজো দেখেন বহু মানুষ। তাঁরাও নিশ্চয়ই সচেতন এই ব্যাপারে, যেন ঘুমের সময় কাটছাঁট না হয়। আনন্দে মেতে ওঠার জন্য প্রয়োজন সতেজ শরীর ও মন, একথা মনে রাখতে হবে যে—। পুজো মানেই পরিবারের সকলের সাথে একটু আধটু অনিয়মে মেতে ওঠা। তাই উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ ও অন্যান্য জটিল রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের পুজোর আগেই রুটিন চেক্ আপ অত্যন্ত জরুরী। পুজোয় অসুস্থ হলে চিকিৎসকের কাছে পৌঁছনোও যেমন কঠিন, তেমনই চিকিৎসকও ছুটিতে থাকতে পারেন, তাই যথাযথ চিকিৎসা সম্ভব নাও হতে পারে। আমি তখন একাদশ শ্রেনীর ছাত্রী। মহালয়ার পর থেকে পেটে ব্যথা শুরু হলো। ডঃ অনুপম সেনের কাছে গেলাম। উনার মেয়ে লালী আমার সহপাঠী। ডঃ দেখে বললেন, “সার্জেন ডি চৌধুরীকে একবার দেখিয়ে নে।” – সে দিন মহাসপ্তমী, ডি চৌধুরীকে দেখানোর সঙ্গে সঙ্গে উনি সদর হাসপাতালে ভর্তি করে নিলেন। এ দিকে মা হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক পার্থ সরকারকে বলে ওষুধ নিয়ে এলেন। আইরিশ টেনাক্স সিক্স, ওটাও খেতে লাগলাম। প্রথমদিন জেনারেল ফিমেল ওয়ার্ডে ছিলাম। ব্যারালগন ইঞ্জেকশন নিয়ে ব্যথা কমলেও সারারাত ঘুম হলো না। সব দেখে ডঃ নার্সদের বললেন, “এই পেশেন্টকে এন এস বি-তে পাঠিয়ে দেবেন। ও এখানে থাকতে পারবে না। ওটা ছাত্রীনিবাসের মতো ঝকঝকে, ওখানে দেখবেন ও ভালো থাকবে।” – সেই কথা মতো আমার স্থান হলো নিউ সার্জিক্যাল ভবনে (এন এস বি তে) … ওখানে লালী এলো দেখতে, একটা পুজোসংখ্যা (দেশ না আনন্দবাজার – ঠিক মনে নেই) আর মৈত্রেয়ী দেবীর “ন হণ্যতে” … সারাদিন পড়তাম। আর পরদিন থেকে দেখলাম ডঃ ডি চৌধুরির বদলে ডঃ সিনহা আমায় দেখছেন। ডঃ ডি চৌধুরী ছুটিতে বাড়ি গেছেন, ডঃ সিনহাকে আমাকে দেখবার ভার দিয়েছেন। ডঃ সিনহা কালীপুজোয় ছুটি নেবেন তখন উনার রোগীদের ডঃ ডি চৌধুরী দেখবেন। আমার অপারেশন হবে কি না জিজ্ঞেস করতেই ডঃ সিনহা দেখে বললেন, “পেট তো নরম আছে। এখন অ্যাপেন্ডিক্স অপারেশণ না করলেও চলবে। দু’দিন দেখে ছেড়ে দেবো।” – এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বলি, পুজোর আগেই চেক আপের মাধ্যমে জেনে নিতে হবে ক্রণিক রোগের সঠিক অবস্থা। সেই মতো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা আগে ভাগেই নিয়ে রাখতে হবে। উৎসবের আনন্দে যখন সবাই মেতে আছে সামান্য অনিয়ম বা ভুলে ঘটে যেতে পারে ছন্দপতন। মনে রাখতে হবে হঠাৎ প্রয়োজনে চিকিৎসক খুঁজে পাওয়া বেশ মুশকিল, তাঁরাও মানুষ, তাঁরাও সপরিবারে ছুটি কাটাতেই পারেন। এছাড়াও কয়েকটি আসন-প্রাণায়ামের কথা বলবো। সুস্থ ও নীরোগ জীবন যাপণের জন্য নিয়মিত আসন প্রাণায়াম অভ্যাস খুবই জরুরী। সারা বছর করতে পারলে তো খুব ভালো, নইলে পুজোর মাস জুড়ে এই সময়ে প্রতিদিন খাওয়ার পর বা রাতে শোয়ার কিছু আগে পাঁচ দশ মিনিট বজ্রাসনে থাকা যেতেই পারে। এতে পায়ের পেশীর ক্লান্তি দূর হবে যেমন তেমনই হজমের সুবিধে হবে, ঘুম ভালো হবে, পুজো দেখতে গিয়ে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানোর ক্লান্তিও দূর হবে। সারাদিনে এক ফাঁকে খালি পেটে সুযোগমতো ডিপ ব্রীদিং বা ভস্ত্রিকা প্রাণায়াম সহ সুদর্শণ ক্রিয়া করতে পারলে খুব ভালো। এতে দেহে অক্সিজেন সরবরাহ বাড়বে, ক্লান্তিভাব কেটে গিয়ে নিজেকে সতেজ মনে হবে। এই সময়ে প্রফুল্লতার কারণে মানুষ ধৈর্য্য সহকারে ঠান্ডা মাথায় সকল কাজ আনন্দের সাথে নিষ্ঠাভরে করতে পারে। আত্মীয়, বন্ধু, পরিবারের সাথে যতোটা সম্ভব একসাথে কাটালে পুজোর খুশীর মাত্রা বাড়ে বই কমে না। দুর্গা পুজো শেষ হলেও আরো পুজো বাকি আছে, উৎসবের দিনগুলো সকলের আনন্দময় হোক- এই প্রার্থণা করি।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।