প্রবন্ধে ডরোথী দাশ বিশ্বাস

শ্রমিকের রক্তে শ্রমের মূল্যায়নের ইতিহাস মে দিবস

কে কবে বেঁচেছে শ্রমবিমুখ হয়ে,
কে দিয়েছে বাহানা নানান—
আমি তো দেখেছি লয় ক্ষয় নেই,
বাঁচে আজও শ্রমজীবী প্রাণ।

ঘর্মসিক্ত শ্রমে নিমগ্ন মজদুর সমস্ত
পায়নি কখনো সঠিক মূল্য, সম্মানও দূর অস্ত

বুর্জোয়াশ্রেণী আত্মতুষ্টি লভে শোষিতের রক্তে
মৃত্তিকা ভেদী মহীরুহ যেন রাজ করে এ জগতে

কে কবে করেছে শ্রমিক শ্রেণীর
সঠিক মূল্যায়ণ
আমি তো দেখেছি ওরা বেঁচে যায়
খনি মজদুর কৃষাণ।

আজ থেকে ১২০ বছর আগে ১৮৮৬ খ্রীষ্টাব্দের ১ মে আমেরিকার শিকাগো শহরের হে মার্কেটে আট ঘন্টা কাজের দাবীতে ও কাজের পরিবেশের পরিবর্তনের সাথে সমাজ পরিবর্তনের লড়াইকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার স্বার্থে যে রক্ত ঝরেছিলো সেই রক্তধারা আজও প্রবহমান। রক্তে রাঙা এই পথে দুনিয়ার শ্রমজীবী মানুষেরা আজও শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে মুক্তির পথে অগ্রসর হওয়ার শপথ গ্রহন করেন। ঐ দিন হে মার্কেটে আমেরিকার পুলিশ ও সৈন্যবাহিনী শ্রমজীবী মানুষের মিছিল লক্ষ্য করে আক্রমন চালিয়েছিলো। প্রশাসনের প্রত্যক্ষ মদতে ছয় জন সংগ্রামরত শ্রমিক নিহত হয় ও আহত হয় শত শত শ্রমিক। জঙ্গী শাসকশ্রেণী মিথ্যা মামলায় অভিযুক্ত করে শ্রমিক নেতাদের নিষ্ঠুর কারাযন্ত্রণা ভোগ করতে বাধ্য করেন। ১৮৮৭ খ্রীষ্টাব্দের ১১ নভেম্বর অভিযুক্ত নেতাদের ফাঁসির হুকুম হয়। দুনিয়ার সর্বহারা মানুষের মুক্তি আন্দোলনের দিশারী অ্যালবার্ট পার্সনস, অগাষ্ট স্পাইজ, জর্জ অ্যাঞ্জেল ও অ্যাডলফ্ ফিসারের ফাঁসি হয়। শ্রমিক শ্রেণীর শোষণ ও বঞ্চনার অবসানের জন্য উৎসর্গীকৃত প্রাণ অগাস্ট স্পাইজের শেষ কথাগুলি আজও স্মরণীয়- “এমন একটা সময় আসবে যখন আমাদের নীরবতা শব্দের চেয়েও বেশী সরব হয়ে উঠবে।” সেই থেকে পৃথিবী থেকে সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদ, বিশ্বায়ন ও বেসরকারীকরণের বিরুদ্ধে; দুনিয়ার শ্রমজীবী মানুষের সংহতি ও স্বার্থরক্ষার লক্ষ্যে বিশ্বজুড়ে মে দিবস পালিত হয়। এই দিনে সমস্ত শোষিত বঞ্চিত কৃষক শ্রমিক ও মুক্তিকামী মানুষ সুসজ্জিত মিছিল ও সমাবেশে সমবেত হয়ে সমস্ত খেটে খাওয়া মানুষদের এক হবার জন্য আহ্বান জানান ও শপথ গ্রহন করেন- “তার চেয়ে পোষমানাকে অস্বীকার করো,/অস্বীকার করো বশ্যতাকে।/ চলো, শুকনো হাড়ের বদলে/ সন্ধান করি তাজা রক্তের,/তৈরী হোক লাল আগুনে ঝলসানো আমাদের খাদ্য।/শিকলের দাগ ঢেকে দিয়ে গজিয়ে উঠুক/সিংহের কেশর প্রত্যেকের ঘাড়ে।” কিন্তু সহস্রাব্দের অষ্টাদশতম মে দিবসেও বা বলা যায় ১৩৮ বৎসর অতিক্রান্ত হলেও আজও পৃথিবীর শ্রমজীবী মানুষ যে তিমিরে ছিলো সেই তিমিরেই আছে। ভাবলে অবাক হতে হয়, ভারতের যে যে রাজ্য খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ, সেই রাজ্যগুলির অধিবাসীদের বৃহদাংশেরই অর্থনৈতিক অবস্থা করুণ। খনিজ সম্পদ উত্তোলনে খরচ কমাবার জন্য কম মজুরীতে স্থানীয় শ্রমিকের চাহিদা বেশী। শুধু কম মজুরীই নয়, তাদের থাকবার বাসস্থানও অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর। ইউরেনিয়ামের মতো তেজষ্ক্রিয় পদার্থ উত্তোলণে (যেমন যদুগোড়ায়) শ্রমিকদের সীসার জ্যাকেট (পোশাক) ও দেওয়া হয় না। সেখানকার শ্রমিক পরিবারের শিশুরাও তেজষ্ক্রিয় প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। এমন কি সেই পরিবারগুলো তেজষ্ক্রিয়তার ভয়াবহ প্রভাব সম্পর্কে সচেতনও নয়। যারা দেশের অর্থনৈতিক বুনিয়াদ বা ভিত শক্ত করতে স্বল্প মজুরীতে শ্রম দেয়, তাদের মৃত্যুতে শিক্ষিত ও পরশ্রমভোগী দেশবাসীর সত্যিই কিছু এসে যায় না। পরিশেষে তবুও চার্লস রুদেনবার্গের কথা উদ্ধৃত করে বলতে চাই “মে দিবস পুঁজিবাদের বুকে জাগায় আশঙ্কা আর শ্রমিকদের বুকে জাগায় আশা।”

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।