প্রবাসী মেলবন্ধনে দীপশিখা দে (মেলবোর্ন)

অগ্রহায়ণ, দাঁড়কাক, কোকিল 

বাংলা ক্যালেন্ডার একসময় পয়লা বৈশাখে সোনার দোকান বা মায়ের পরিচিত শাড়ী কাকুর দোকান থেকে আসতো। সেই সময় ছোট ছোট দোকান আর তাদের কিছু চেনা খদ্দের। যাতায়াতের পথে দেখলেই ‘ও বৌদি ‘ বলে হাঁক। তারপর হাসিমুখে নিমন্ত্রণ টা জানাতো, হালখাতার দিন আসার। হয়তো বছরে দুটো শাড়ি কেনা হয় কি হয়না। অথবা সেই সোনার ছোট্ট ঝলমলে কাঁচের দেয়াল জোড়া দোকানে কবে কোন অন্নপ্রাশনের ছোট খাটো রুপোর তাগা বা চামচ বাটি বা ছোট কানের দুল কেনা হয়েছিল তবুও সে চেনা পরিচিত। একটা হাসিমাখা মুখে নিমন্ত্রণ সেই চেনা সামান্য এক খদ্দের কে। যাইহোক মিষ্টির বাক্সের সাথে কখন মা তারার ছবি অথবা গণেশ লক্ষীর জোড়া মূর্তির ছবি সাথে স্বস্তিক চিহ্ন আঁকা ঘট ধানের ছড়া আঁকা ছবি দেয়ালে জায়গা করে নিতো। ঠাকুরের মুখ ছবিতে তাই বছর ঘুরে গেলেও সে ক্যালেন্ডার নামানো হতোনা। তাকে ছেঁড়া যায়না , ফেলা যায়না। তাই নতুন ক্যালেন্ডার ওইটুকু পেরেকের মধ্যেই পুরোনোর সাথে জায়গা করে নিতো।

তাই গরম কালে জোরে ফ্যান ঘুরলেই মাঝে মাঝে ক্যালেন্ডার পেরেক থেকে খুলে মাটিতে পরে যেত। আর পুরোনো বছরের ক্যালেন্ডার উঁকি দিতো একবার।নতুন আর পুরোনো বোধহয় এইভেবে মিলেমিশে থাকে। মনিবন্ধনে আঁটা ঘড়ি , অনামিকা তে পড়ে থাকা আংটির মতো দেওয়ালে টাঙানো ছবি ক্যালেন্ডার কেমন নিজের একটা ছাপ রেখে যায় তাইনা ? নিজের পরিচিতির সম্পূর্ণ ছবি রেখে যায়।

আজকাল ঘড়ির সময় , সাল -মাস তারিখ সব কিছু একটা স্বচ্ছ পর্দার ভিতর।ওরা আসে যায় বদলায় শুধু কোন ছাপ থাকেনা।মুঠোফোনে বন্দি জীবনে ওরাও বন্দী। তবু বছরের উৎসবের মাস আসলে ভার্চুয়াল পর্দায় একবার এই বাংলা ক্যালেন্ডার দেখি।

এখন তো অগ্রহায়ণ মাস। কি অদ্ভুত না ! অগ্র অর্থাৎ আগে , হায়ণ অর্থ বছর। একসময় বাংলা মানেই যখন গোলা ভরা ধান , চাষীর মুখে হাসি ছিল তখন বাংলা মাসে এই মাস আগে আসতো। খেত ভরা উৎকৃষ্ট ধান আসতো এই মাসে তাই অগ্রহায়ণ ছিল সমৃদ্ধির মাস তাই সে ছিল প্রথম। যদিও বাংলা বছরে এটি অষ্টম মাস।

তবু আজও এই মাস খুশির মাস।জীবনের প্রথম চাহিদা পেট ভরা খাবার আর তার জন্য অর্থ সবই তো আসে এই মাস থেকেই , তাই তো বাংলার মাটি লেপা ঘরে নতুন চালের টগবগ করে ফোটার সুগন্ধ ,ছোট ছোট পায়ের ছাপ মা লক্ষীর মাস এটি।পেটের সাথেই মনের যোগ। পেট ভরা থাকলে গলায় আসে সুর , গান। মনে জাগে প্রেম- প্রণয়, তাই মুকুলিত হয় বিয়ের ফুল। লাল টুকটুকে বেনারসি , শোলার টোপর ,সিঁদুর কৌটো , আলতা , সানাই ,ক্ষীরের বড়-বৌ , নাকে নথ পরে সিঁদুর রাঙা মাছ। প্রেম প্রণয় অনেকটা শীত বেড়ালের মত। সাদা ধবধবে শীত যেন পা টিপে টিপে একটু করে সামনে এগিয়ে আসে অগোচরে আবার নজর করলেই সে চোখ বন্ধ করে চুপটি করে ঘাপটি দিয়ে বসে থাকে যেন। এক সময় নরম স্পর্শ তার হৃদয়ের দোরে নিজের উপস্থিতি জানান দেয়। এই মাসটির এমনই জাদু।

নতুন কনের নতুন সংসারে যেমন একটা মিষ্টি নরম গন্ধ থাকে। সব কিছু অবাক লাগে , চমক এনে দেয় , অগ্রহায়ন মাসটিও ঠিক তেমন যেন। চাষীর ঘরে ফুটন্ত ভাত , লক্ষীর ভারে আরো কিছু অর্থের রিনঝিন শব্দ আর তার চোখ জুড়ে সবুজ মাঠে হলুদ সোনা ধান। কিভাবে যেন চাষী বর – বৌ সেই ক্ষীরের পুতুল হয়ে যায়। দিনশেষে ঘামে ভেজা শরীরে জলে ভেজানো ঠান্ডা নরম গামছা আলতো করে বৌ এনে গায়ে দিয়ে দেয়। দুজনে সূর্যাস্তের লালচে কমলা আলোতে তাদের সোনা রাঙা হলুদ ক্ষেতের দিকে চেয়ে থাকে। ওই হলুদ মাখা চোখে একবার চাষী বৌয়ের মুখের দিকে চেয়ে দেখে। সূর্যাস্থের কমলা আলো বৌয়ের নরম ক্লান্ত মুখে কেমন এক আদর ঢেলেছে। ওর নিরাভরণ শরীরে মা লক্ষী যেন কোন এক জাদু কাঠির ছোঁয়ায় সোনা মুড়ে দিয়েছে। ধানের রং সূর্যের আলোয় মিশে বৌটাকে আবার নতুন কনের রূপ দিয়েছে। শহরের ছবি জানিনা তবে আমার মানস চক্ষে অগ্রহায়নের এই ছবি দেখতে পাই।

ভার্চুয়াল খাতায় শব্দের সাথে সেই ছবি আঁকলাম। জানি লেখাগুলি চলে যাবে নিজের নিয়মে। তবু একটা অলীক ফ্রেমে একটা ছবি যদি এঁকে থাকি কোনো পাঠকের চোখে তাই বা কম কি !

আমিও সুদূর অস্ট্রেলিয়া তে বসন্তের আগমনের অপেক্ষায় বসে আমার দেশে একবার অগ্রহায়ণের হাত ধরে ঘুরে এলাম। বাড়ি যেতে পারিনা বহুদিন। ক্যালেন্ডার বদলাচ্ছে ঋতুর সাথে। ক্যামেলিয়া ফুল ঝরে পড়েছে, করবী এসেছে গাছে। দাঁড়কাকের কালো রঙে কোকিল ভ্রম হয়। মানস ভ্রমণের আনন্দ পেতে শিখেছি এই লেখার হাত ধরে। আমারি তো মন। ভাবতে দোষ কি !!

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।