দীর্ঘ কবিতায় দীপশেখর দালাল

এই জন্ম, এই কথার নক্ষত্র
।১।
ইদানীং মনে হয় শস্যের রাতে অনেক কথার ডিঙি
বহুদূর চলে গেছে, বহুদূরে গঙ্গাফড়িং শুয়ে আছে অপলক
কুয়াশার ঘাসে, নিয়নসরণি বেয়ে কবেকার ফসিলচিঠির শব্দেরা
মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে লন্ঠন জ্বেলে
তুমি কি ভালো আছো?
আমি কি রয়েছি ভালো এত এত মিতব্যয়ী ঠোঁটে?
কথার নক্ষত্র পোড়ে, কথার নক্ষত্র মরে যায়
আমরা কি রয়েছি ভালো এই রোশনাই সাঁকোর দু’দিকে?
। ২।
অন্ধকারে হাতড়ে খুঁজছি ঝিনুকটি
কী অপর্যাপ্ত আসবাব চারিদিকে
কলসির গায়ে হাত দিই, পিঁড়িটি শীতল হয়ে আছে
সমুখে রাজপালঙ্ক, পেছনে বটগাছটির কোটর
শাবকের চোখ বুঝে যাই
কিছু সোনার ধান রোদের জন্ম দিয়ে ইতিউতি পড়ে আছে
সাবলীল পড়ে আছে আমার কঙ্কাল ডানদিকে
এইসব হাতে ঠেকে
অথচ সমুদ্রের কাছে আমার ঝিনুকটি ছিল
এবং সমুদ্র শান্ত হয়ে আসে বুকে বুকে
আমার ঝিনুকটি পাই না খুঁজে তবু
। ৩।
এই যে দীর্ঘ প্রতীক্ষার মতো মহীরুহ হ’লাম শেষমেষ
এবং চাঁদটিকে আর কিছুদিনের মধ্যেই ছুঁয়ে ফেলব
এবং পৃথিবীর থেকে ক্রমশ দূরত্ব রচনা করছি
পাখিটি ফিরছে, মানুষ ফিরছে, ঋতু ফিরছে
এবং তুমি ফিরছো না
এতে কি আমি একদিন ঘূর্ণাবর্ত রচনা করব না?
আমি কি একদিন লিখে ফেলব না সাধ্যাতীত কবিতাটি?
উল্কা শুনবে? মূমূর্ষু ঋষিটি শুনবে? আর তুমি শুনবে না?
ছায়ার দৈর্ঘ্যে আমি তোমার গ্রাম ছুঁলাম এই
শিকড়ের সাপটির শীতঘুম ভাঙা পর্যন্ত অপেক্ষা করব আমি
তারপর কাঠুরের ঠিকানায় একটি চিঠি লিখো না’হয়
। ৪।
একটি হিমবাহ পুষেছি
এখন সেখান থেকেই সমস্ত পৃথিবীতে শীত আসলো
গাঁয়ে আসলো একটি নদী
পাখি আসলো ভিন্ন পাড়া থেকে
শরীর থাকল দীর্ঘকাল একইরকম, যেরকম কামনা তপস্যা করতে করতে
আমার মতো একটি মানুষ দীর্ঘকাল আগে মারা গিয়েছিল
সেরকমই সে পড়ে থাকল এত জ্যোৎস্নাপ্রাচুর্যে স্থিরনয়নে
সে মারা গিয়েছিল, সে কি এক শরীর পেয়ে
এবং তারপরে কোনোদিন না পেয়ে পেয়ে শিখর থেকে শিখরে গিয়েছিল একদিন?
শালপাতায় এক রাতে নধর শুয়োরটির গরম মাংস চিবিয়ে
সে শুয়ে থাকল বরফের গায়ে
অথচ আলোকবর্ষ দূরত্বের হিমবাহ গলে, হিমবাহ গলে যায়
উষ্ণায়ন কি তার দেহতাপ?
নদী কি তার স্রোতস্বিনী শব্দ?
পাখিটি কি তার অরণ্যের স্মৃতিশিলায় বসলো আজ রাতে?
। ৫।
ভেজা পথটির ওপর খালি গায়ে বসে আছি
কী শীত, কী শীত, জোনাকি মুখ থুবড়ে পড়েছে চুল্লুর বোতলে
নোনতা ছোলার বাটি উলটে রয়েছে পড়ে
দূরে শুয়ে আছেন ঈশ্বরী এক, তাঁরও ঠাণ্ডা লাগছে
কুয়াশা ঘন হয়ে আসে, আরও ঘন হয়ে এসেছিল ঈশ্বরীর স্তন
আরও পাপ? এত পাপ তো ঈশ্বরীর অজানা নয়
তবু সে কেন আসে? কিসের জন্যে সে রাস্তায় শুয়ে দু’বোতল চুল্লু গিলে কাঁপছে?
আমি কি মানুষ নই? কামের মূহুর্তে আমাকে কি ঈশ্বরের মতো মনে হয়?
আমি তো শব্দ খুঁজতে এসেছিলাম, আর একটি ঝিনুক মাত্র
ও কেন শুয়ে শুয়ে কাঁপছে?
। ৬।
এভাবে দরিদ্রের মতো মুষ্টিভিক্ষা না পেয়ে চলে যাব না
রাজাধিরাজের মতো রথের ঘোড়াটির রশি টেনে ধরে
ধুলো উড়িয়ে অন্য জন্মের দিকে চলে যাব
এত নেই, এত নেই, এত না থাকার পরেও এই যে
শব্দ বিস্তার করে আহত ডানাটির ‘পরে জলপটি রেখে
তোমাকে অজস্র চিঠি পাঠাচ্ছি কবিতার নামে
এবং পৌঁছসংবাদ পাচ্ছি না দূরের গ্রামে আমার
আর শ্বাপদপরিচয় ভুলছি একটু একটু করে
উনুনে রেঁধে নিচ্ছি অড়হর ডাল
এরকম থাকব না চিরকাল আমি
সাঁকোর এদিকে আছি, তবু জানি
অন্যদিকের ঘাস তোমার পায়ের নুন জানে
এরকম এক নিঝুম শীতের রাতে
আমি চরিত্র ব্যয় করতে করতে ক্লান্ত হবো ঠিক
আর সমস্ত হিসেব বুঝে নেব সেই রাতে
অন্য জন্মের দিকে যাবার আগে তীব্র নখদাঁত দিয়ে চেখে নেব সব
তারপর রাজাধিরাজের মতো অন্য জন্মের দিকে চলে যাব।