আমাদের সমস্ত দিনে নত হয়ে আছে সন্ধের ঝাউগাছ
আমাদের সমস্ত আয়ুর উচ্চতায় উড়ছে সোনারোদের ঈগল
আমাদের সমস্ত চুম্বনে ধানের সুঘ্রাণ
আমাদের সমস্ত লুকোচুরিতে সতর্ক চোর সিঁদ কাটে
আমাদের আরশিতে গভীরতম ইঁদারা খোঁড়া হয়েছে
আমাদের সিঁড়ি জুড়ে ছড়িয়ে আছে বাসি পারিজাত
আমাদের শিরায় ধমনীতে ঘুমিয়ে আছে একদা দানব
আমাদের উঠোনে খেলা করছে আনন্দসন্তান
তবু আমরা কেমন যেন বেঁচে আছি
বেঁচে আছি প্রবাহে ভাসতে থাকা ছিন্নমূল উদ্ভিদের মতো
আমাদের কথা ইদানীং কেউ বলে না আর
২| পুরনো বাসন ডোবে
কবেকার ভাঙা ঘাটে জল আসে
জল আসে, আসে আর চলে যায়
পুরনো বাসন একা ডোবে
যেন প্রস্তরযুগে স্তনঢাকা এক নারী এসে বসেছিল ওইসব মাজবে বলে
তারপরে নিরীহ রাজপুত্র তাকে নিয়ে চলে গেছে মহাজাগতিক মাঠে
পুরনো বাসন তার ডুবে থাকে শ্যাওলার কাছে
আমাদেরও কি সব উপন্যাস ডুবে গেছে তার পাশটিতে ঠিক?
৩| পৃথিবীর সব খই
পথের ধারে একটা মাচায় বসে আছি আর দেখছি
মানুষ কাজে যাচ্ছে, কাজ থেকে ফিরছে
স্বল্প সঞ্চয়টুকু জমিয়ে রেখে ভেবেছে স্বপ্ন কিনবে, যেদিন দিগন্তে মেলা বসবে
সে কিনবে, সে কিনে নেবে প্রত্যাখ্যানের স্পর্ধা সেদিন
কিনবে অনবদ্য এক আলো একদিন বিকেলবেলায়
তারপরে হঠাৎ দেখলাম খই উড়ছে আকাশের গায়ে একদিন
আমি দেখলাম, দেখলাম এবং চায়ের ভাঁড়টিতে চুমুক দিয়ে ভাবলাম
পৃথিবীর সব খই একদিন শেষ হয়ে যাবে
আমরা কী এইটুকু থাকি কেবল?
৪| বৃক্ষ
অনর্থক হেঁটে যাচ্ছি, অনবরত হাঁটছি
জন্মে ইস্তক ওই একটাই পথ
মাঝে কিছু কাজ অকাজ এবং গেরস্থালির দেওয়ালজোড়া আলপনা
কিন্তু হাঁটছি রোগা এক বৃক্ষের দিকে
কতদূরে কোন গাঁয়ে এক ন্যুব্জ কাঠুরে সংবাদ পাবে একদিন
আর বৃক্ষটি আমায় সাজিয়ে দেবে তার সমূহ শাখাপ্রশাখা দিয়ে
একা হাঁটছি না, তুমিও হাঁটছো আমি জানি
বৃক্ষটির দিকে
৫| আমার সাজা হোক
আমার দ্বীপান্তর সাজা হোক
অথবা কেড়ে নেওয়া হোক চকমকি পাথরটি
কিংবা মাথা ন্যাড়া করে বসিয়ে রাখা হোক আমার চরিত্রের পাশে
আমি আলোকবর্ষ ধরে এভাবে উদ্দেশ্যহীন ঘুরছি
ঘুরেই যাচ্ছি আর অবিশ্বাস্য পিচ্ছিল হয়ে গেল পথ ক্রমে
কত পাখি পিতার আদেশ অমান্য করে পরিযায়ী হয়ে গেল বহুবার
জন্ম নিল ব্ল্যাকহোল
নদীচরের মাঝে বেড়া দিয়ে গেল রাজকর্মচারী
দলিল পুড়ে গেল সিন্দুকে সিন্দুকে
আর চরিত্রের শালগ্রামশিলা বার করে আমি যজমান হ’লাম মহাদেশে
আমাকে এমন সাজা দেওয়া হোক
যেন যুদ্ধের আগে নিরস্ত্র দাঁড়াতে হয় ভাসমান আয়ুফাতনার নিচে
আমাদের মোহরকলস লুঠ হয়ে গেছে
৬| অমর হ’ব ভেবে
সরল দিঘির ‘পরে মুখাবয়ব দেখার দিন পেরিয়ে এসেছি
বাতাসে উড়ছে শস্যরেণু, আমার চোখ পুড়ে যায় হে মানবজন্ম
আমাদের এইটুকু সুখ যে আমরা একদিন ছিলাম
অযথা বিচিত্রগমনের শেষে আমরা ছিলাম
আমাদের সৌধ ছিলনা, আমাদের ছিল সমগ্র তারার আলোর পৃথিবী
একদিন কুলুঙ্গিতে প্রদীপ রেখে আমরা অমর হ’বার কথা ভেবেছিলাম
আমরা আঙুল রেখেছিলাম
আমরা অমর হ’বার কথা ভেবেছিলাম একদিন।