সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে দীপশিখা দত্ত (পর্ব – ৩)

কাকাতুয়া বাড়ী
পিসীমা রা
দিদুর দুই মেয়ে ছিলো। যাঁদের আমার জন্মের অনেক বিয়ে হয়ে গেছিলো। বড়োজন ছিলেন পুষ্প পিসীমা আর ছোটোজন হাসি পিসীমা।
দুজনেই দেখতে সুন্দরী ছিলেন বলে, বেশ বর্ধিষ্ণু ঘরেই বিয়ে হয়েছিল। পুষ্প পিসীমার বিয়ে বেশী দূরে হয়নি। ব্যারাকপুর চিড়িয়ামোড় এলাকা সেসময় পুরোপুরি ঘোষেদের দখলে ছিলো। ঘোষরা অনেক ভাই ছিলো এবং বেশ পয়সাওয়ালা ছিলো। তাদেরই কোনো এক শরীকের সঙ্গে বিয়ে হয় পুষ্প পিসীমার। লোকমুখে শুনেছিলাম, চিড়িয়ামোড়ের মুখে বিশাল তিনতলা জাহাজ বাড়ীটা নাকি ওনার শ্বশুর বাড়ী। আমি দেখতাম বেশ ভারী মোটাসোটা এক মহিলা পরণে বেশীরভাগই সাদাখোলের দামী তাঁতের শাড়ি আটপৌরে ভাবে পরা, দুহাতে দুটো সোনার মোটা কাঁকন, মাঝে মাঝেই মোটরগাড়ী বা রিক্সা থেকে নেমে দেখতে আসেন মা ভাইদের। পেছনে চাকর টিফিন ক্যারিয়ার ভর্তি খাবার নিয়ে ঢুকতো। এসেই বেশ হম্বিতম্বি করে কথা কইতেন। দেখলেই বেশ সম্ভ্রম জাগে। কেনো জানিনা ওনাকে দেখে আমার খুব ভয় লাগতো।একদিন সামনে পড়ে যেতেই আমার দিকে এমনভাবে তাকালেন, যেন আমি ভিখারী গোছের কেউ! নিজের দাদাদের নির্বুদ্ধিতার দোষ দিয়ে বেশ অবজ্ঞার দৃষ্টিতে বললেন, ,”দাদা! তোমরা যে সারাদিন কি করে বাড়ীটাকে হাট বানিয়ে রাখো, বুঝিনা,আর মাকেও বলিহারি যাই!”
তারপরেই আমার দিকে ফিরে বললেন, “অ্যাই তুই কোনবাড়ীতে থাকিস রে?”
অমনি বড়োজেঠু রে রে করে বলে উঠলেন, “ওকে কিছু বোলো না, ও বাদলের বড়ো মেয়ে। ভারী ভালো মেয়ে। ও এখানে এসে, চুপটি করে বসে, আমার কাছ থেকে গল্প শোনে।”
“বাদল, কোন বাদল? যারা অনেক বছর পর বাড়ী ফিরেছিলো? ভাড়াটেরা যাদের বাড়ী দখল করে নিয়েছিলো?”
” হ্যাঁ। ও বাচ্চা মেয়ে, তুমি যেনো আবার সেসব কথা তুলো না,ওর সামনে। তাহলে ভয় পেয়ে যাবে।”
আমি খানিকক্ষণ চুপটি করে বসে থেকে গুটি গুটি পায়ে উঠে চলে আসি।
ওইভাবে বলার পরে বেশ কয়েকদিন ওবাড়ী যাইনি দেখে, বড়োজেঠু বাজার ফেরৎ নিজে ডাকতে এসেছিলেন,বাড়ী বয়ে। জানতে চেয়ে ছিলেন কেনো যাইনি, আমি কিছু উত্তর দিতে পারিনি।
আমি অনেক আগেই দিদুর মুখে শুনেছিলাম, পুষ্প পিসীমা নাকি আমার ঠাকুরমার থেকে অল্প ছোটো ছিলেন। বৌদি ডাকতেন ঠিকই, কিন্তু প্রথমজীবনে দুজনের নাকি ছিলো দারুন সখ্যতা।
বাড়ী এসে সুযোগ বুঝে আমার ঠাকুরমাকে চেপে ধরি,আসল ঘটনা কি ঘটেছিলো, ভাড়াটেদের সঙ্গে, জানার জন্য। ঠাকুমা বলতেন থাকেন, অল্পবয়সে নাবালক দুই সন্তানকে নিয়ে এক বালবিধবার জীবনের মর্মান্তিক কাহিনী।সে গল্প অন্যত্র লিখবো।
অল্প বয়সে ঠাকুর্দার মৃত্যুর পর নিজেকে বাঁচানোর জন্য ও সন্তানদের সঠিক প্রতিপালনের জন্য আমার ঠাকুরমা বাধ্য হন স্বামীর ভিটে ছেড়ে, কোচবিহারে, বাপের বাড়িতে চলে যেতে। যাবার সময় বসতবাড়ীটা ভাড়া দিয়ে যান। ভাড়াটিয়ারা বাঙালী হলেও চূড়ান্ত অসভ্য ছিলো! ঠাকুমার অসহায়ত্বের সুযোগে কিছুদিন পরেই ভাড়া পাঠানো বন্ধ করে দেয়। সুদূর কোচবিহার থেকে আসা তখন ঠাকুমার জন্য সহজ কাজ ছিলো না। কাজেই ক্রমশঃ বাড়ী, ভাড়াটেদের কব্জায় চলে গেলো। এই ঘটনার আঠারো বছর পর ঠাকুমার বড়ো ছেলে অর্থাৎ আমার বাবা ম্যাট্রিকুলেশন দিয়ে একরকম জোর করেই মা- ভাইকে নিয়ে চলে আসেন মামারবাড়ী ছেড়ে। এসে দেখেন পুরো বাড়ীটাই ভাড়াটেদের দখলে, নিজেদের বাড়ীতে নিজেরাই ব্রাত্য। অনেক বলা কওয়া আর অনুনয় বিনয়ের পর মা আর দুই ছেলের থাকার জায়গা হলো সিঁড়ির তলায় ঘুঁটে আর পুরানো ছেঁড়া জুতো রাখার ঘরে। নিজের বাড়ীতে অনুনয়ের কারণ হলো আঠারো বছরের ব্যবধানে মানুষ অনেক কিছু ভুলে গেছে। পাড়ার লোকজন ডাক্তারবাবুর স্ত্রী সন্তানকে সেভাবে চিনতোও না, তাই ভাড়াটে বাড়ীওয়ালার ঝামেলা মেটাতে কেউ এগিয়ে আসেনি। ঘটনার তিনদিনের দিন বিলাসীবৌদি ফিরেছে শুনে দেখা করতে এসেছিলেন পুষ্প পিসীমা। এসেই ভাড়াটেদের কান্ড দেখে বাঁধিয়ে দেন লঙ্কাকান্ড। একটা একটা করে ঘুঁটে আর জুতো ঘর থেকে ছুঁড়ে ফেলেন। উঠোনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলতে থাকেন, তিনদিনের মধ্যেই ভাড়াটিয়া বাড়ী ছেড়ে চলে না গেলে থানায় নালিশ জানাবেন। যাইহোক সে যাত্রায় পুষ্প পিসীমার সঠিক প্রতিবাদে ভিটেমাটি ফিরে পেয়েছিলো আমার পূর্বপুরুষ। একথার কৃতজ্ঞতা জানাতে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমার ঠাকুমা কখনো ভোলেননি।
পুষ্প পিসীমার মেয়েরা আমার ছোটো পিসীমণির বন্ধু ছিলেন, সব একসঙ্গে বড়ো হয়েছিলেন। পুষ্প পিসীমার স্বামী আমাদের খুব ছোটবেলায় মারা যান। ওনার এক মেয়ে ডলিপিসীকে আমার এখনো মনে আছে।শ্যামলা রং,বেশ গোলগাল লক্ষীঠাকরুণের মতো মিষ্টি চেহারা ছিলো ডলিপিসীর। পুষ্প পিসীমা আর ওনার মেয়ে ডলি দুজনকেই কেন ‘পিসী’ বলতাম তার উত্তর আজো জানিনা। পুষ্পপিসীমার ছেলে-মেয়েরা মামারবাড়ীর খুব আদরের ছিলেন। ভাগ্নাভাগ্নীরা খুব প্রিয় ছিলো মামাদের। আমি অনেক বড়ো হয়েও দেখেছি, পূজোর সময় ডলি পিসীমা আমাদের বাড়ীতেও দেখা করতে আসতেন, বাবাকে ‘বাদল মামা’ বলে ডাকতেন। খুব আদুরী ছিলেন ডলি পিসীমা। দিদুর মৃত্যুর পর ভাইদের বয়স হয়ে যাওয়ার পর আর তত ঘন ঘন আসতেন না পুষ্প পিসীমা। তবে এতটুকু বলতে পারি, বাড়ীর মালিকানা বদলে মুখ্য ভূমিকা ছিলো পুষ্প পিসীমার।
এবার আসি হাসি পিসীমার কথায়। আমার জন্মের অনেক আগেই, বেশ ছোটো বয়সে হাসি পিসীমারও বিয়ে হয়েছিলো। দিদুর কাছে হাসি পিসীমার অনেক গল্প শুনতাম। একবার দেখি ও বাড়ীর ঘরদোর খুব পরিস্কার হচ্ছে, কারণ নাকি ডিব্রুগড় থেকে হাসি পিসীমা আসবেন।
ডিব্রুগড় কোথায় তা আমি তখন জানতাম না, শুধু জানতাম অনেক দূরের পথ। ট্রেনে করে আসতে দুদিন লাগে। অবশেষে হাওড়া স্টেশন থেকে হলুদ ট্যাক্সি করে কাকাতুয়া বাড়ীর সামনে এসে নামলেন হাসি পিসীমা। পরণে সাদা খোলের তাঁতের শাড়ি, চোখে রোল্ডগোল্ডের সোনালী ফ্রেমের চশমা, হাতে সুন্দর কাজ করা বটুয়া, আলব্রেট কেটে আঁচড়ানো চুলে বিনুনী বেঁধে খোঁপা করা, সিঁথিতে আলতো সিঁদুরের ছোঁয়া, কপালের মাঝে ছোট্ট সিঁদুরের টিপ। ভারী মিষ্টি দেখতে, পাকা গমের মতো গায়ের রং,মাখমের মতো মোলায়েম চামড়া আর তেমনি মিষ্টি কথাবলার ভঙ্গী। ঠিক যেন বাংলা সিনেমার নায়িকাদের মতো।
আমরা একটুও ভয় পেতাম না হাসি পিসীমাকে। রোজ বিকেলে গা ধুয়ে গাছের ফোটা তাজা বেলী ফুল বাটিতে জলে ভিজিয়ে রেখে, রাস্তার ধারের খড়খড়ি লাগানো জানলার পাশে বসে হাসি পিসীমা ছোটোবেলার গল্প, শ্বশুরবাড়ীর গল্প বলতেন মুচকি হেসে হেসে। সেসব গল্প আমার মাথায় ঢুকতো না, অভিভূত আমি একদৃষ্টে চেয়ে থাকতাম হাসি পিসীমার দিকে। তাই আজ আর সেইসব কথা কিছু মনে নেই, আমার সারা মাথা জুড়ে ছেয়ে থাকতো হাসি পিসীমার মিষ্টতা আর সৌন্দর্য্য।
সৌন্দর্য্য আরো ছড়িয়ে পড়তো যখন শীতেরদুপুরে জানলার রোদে বসে একপিঠ চুল শুকিয়ে নিতেন। চার পাঁচ বছরে একবার করে আসতেন হাসি পিসীমা, কখনো কখনো ওনার ছেলে প্রদীপও আসতো ওনার সঙ্গে। প্রদীপের ডাকনাম ছিলো বাবলু। প্রদীপ দিদুর খুব প্রিয় নাতি ছিলো। ওনার দুই মেয়ের অনেক ছোটোবয়সে বিয়ে হয়েছিল,বেশ বয়স্ক পাত্রের সঙ্গে। দিদু আর জেঠুরা এতোই মার্জিত ছিলেন যে ওনাদের কোনো রকম আবেগও তেমন দেখতে পেতাম না,কারো প্রতি। আমরা কয়েকজন বাচ্চা ছাড়া পাড়ার কারো সাথেই ওনাদের তেমন মেলামেশা ছিলো না।এমনিতে দিদু সুস্থ থাকাকালীন দুচারটে নিরামিষ পদ রান্না করতেন কিন্তু ও বাড়ীর মেইন শেফ ছিলেন মেজজেঠু। হাসিপিসীমাও এসে দীর্ঘদিন থাকলে কখনো সখনো দুয়েকটা পদ রান্না করতেন। উনি ডিব্রুগড় থেকে এলে মাসখানেক বা তারও বেশী থাকতেন। তখন বাড়ীতে একটা খুশীর হাওয়া চলতো। শেষবার এসে নিজের ছোড়দাকে বিয়ে করতে রাজী করিয়েছিলেন। সেইসময় দাঁড়িয়ে অনেকটা বেশী বয়সে হলেও ছোটজেঠুর বিয়ে হবে শুনে আমাদের সবার সেকি আনন্দ! কত্তো বছর বাদে কাকাতুয়া বাড়ীতে আনন্দানুষ্ঠান হবে শুনে সবার কতো জল্পনা কল্পনা। বাড়ীতে সাজো সাজো রব। এমনকি পাখীটাও কি বুঝতো কে জানে, কারণে অকারণে দাঁড়ে লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে লেজ তুলে ক্যাঁ ক্যাঁ করে চেঁচিয়ে উঠতো। তারপর বহু বছর বাদে একবারই হাসি পিসীমাকে দেখেছিলাম।
ক্রমশ…