দীর্ঘ কবিতায় দীপশেখর দালাল

ঈশ্বরোচিত

১| 

মাহেন্দ্রক্ষণটিতে আমি ছুঁয়ে ফেলবার আগে
তুমি কী স্বর্গের দেবী ছিলে?
ঈশ্বরের মতো তেমন সুখ ছিল না অথচ তোমার?
গায়ে-পায়ে চন্দনগন্ধ, খোঁপায় সর্বরোগহর ওষধিগাছ ছিল?
সকালবেলায় কি পায়ে আলতা পরে
তালবনটি পেরিয়ে পুষ্করিণীতে জল আনতে যেতে?
যদি ঈশ্বর ছিলে, তবে
যেদিন নেশার ঘোরে উন্মাদের মতো তাড়া করলাম
সেদিন রুখে দাঁড়ালে না কেন?
অর্থাৎ মানুষ হতেও বড় সাধ?

২|

শ্রেষ্ঠ ফসলটির গায়ে আমি বসালাম রোদের কুচি
শ্রেষ্ঠ শৃঙ্গারবদ্ধ মানবীকে আমি ভালোবাসলাম
অন্তত ভালোবাসতেই চাইলাম
শ্রেষ্ঠ তিথিতে আমি লিখতে বসলাম আত্মচরিত
শ্রেষ্ঠ ভুলটিকে আমি বললাম বেঁচে থাকা
শ্রেষ্ঠ কবিতাটিকে বললাম তিষ্ঠ ক্ষণকাল
আমি পৌঁছে যাব ঠিক
শ্রেষ্ঠ ছোরাকে আমি কোমরে গুঁজলাম
শ্রেষ্ঠ গর্ভে আমার সন্তান খেলা করলো সন্ধে পর্যন্ত
অথচ শ্রেষ্ঠ পুরুষটিকে খোদাই করতে গিয়ে দেখলাম
কেমন পিতার মতো আদল তার
আমার মুখের সাথে কোনো মিল নেই

৩|

আমি আছি, তোমরা দেখছ তাই আমি আছি
এবং না দেখতে পেলে আমি নেই
আমি গুহার গায়ে আমার হস্তাক্ষর চিনতে পারি
চিনতে পারি প্রাচীনতম বটবৃক্ষের বীজটিকে
এবং চিনতে পারলুম নিজস্ব চিতাগন্ধ, হাওয়ায়
ঘুরপাক খাচ্ছে পৃথিবীকে
সামান্য অস্থি, তাও ভস্মরূপ, উড়ছে
এত আকাঙ্ক্ষা, এত থেকে যাবার আকুতি
দু্র্গদ্বারে প্রহরা পেরিয়ে অনন্তকাল ধরে ভেট পাঠাচ্ছি শালা যমরাজকে
নে আমার অস্থি খা, আমার মাংস খা, আমার হৃৎপিণ্ড খা
আমার বোধ ঘুমালো না তবু
জোনাকির মতো দপদপ দপদপ করে জ্বলছে
মুক্তি নেই আমার?
হে পাপসকল আমার, মুক্তি নেই?

৪| 

এত যে ম্যাজিক দেখালাম নক্ষত্রভূমিতে
এত যে বেশ্যাপাড়ায় বেচলাম বাঙলা মদের চাট
আর আড়চোখে দেখে সমস্ত মানচিত্র মুখস্থ করলাম বন্যারাতে
এত যে উপর্যুপরি মনুষ্যশাবকের অভিনয় করছি যাত্রাপালায়
এবং বরাহটি পিতৃত্ব দাবি করে বসছে ততবার
এসব কি আমার প্রাপ্য?
আমি কি নিন্দেমন্দ শুনতে আসলুম?
আমি কি পাহাড় ভাঙিনি?
আমি নতুন দ্বীপে বসতি স্থাপন করিনি একদিন?
আমি কি পরাশর মুনিটির মতো জ্ঞানী ও কামুক ছিলাম না একদিন?
তবে কিসের জন্য এত কবিতা লিখে লিখে পাঁচালি গাইব আমি?
আমার ফালতু কথার ডিঙিটি ডুবে যায় না কেন?

৫|

অন্ধ মানুষটি আধুলি বুঝে নেবার আগে
নরম মাটি দাবড়ায়নি কোনোদিন
অন্ধ মানুষটি রাস্তা পারাপারের সময় জল মাপতে চাইল
অন্ধ মানুষটি রাধিকার দেহের ঘ্রাণ পায়
অন্ধ মানুষটি জাদুদণ্ড ঘোরায় দিগন্তে দাঁড়িয়ে, ম্যাজিক দেখায় একা
অন্ধ মানুষটি তোমার দিকে তাকিয়ে তোমায় দ্যাখে না
অন্ধ মানুষটির রোদে রোদে ঘুরেও শিরঃপীড়া হয় না
অন্ধ মানুষটির পৃথিবী একটি কালো কুয়ো
অন্ধ মানুষটি তোমার হাত ধরল
আর ভেবে নিল ঈশ্বরের হাতটি কত কোমল
অন্ধ মানুষটি কি ঈশ্বর?
তুমি কি দেবী ছিলে? মানুষজন্ম চেয়েছিলে?
আমিও কি ঈশ্বর তবে?
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।