সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে দীপশিখা দত্ত (পর্ব – ৬)

কাকাতুয়া বাড়ী
বড়জেঠু
ওই বাড়ীর সবচাইতে বুদ্ধিমান কর্তব্য পরায়ণ বড়োছেলে হলেন শ্রীযুক্ত বিমল কুমার ঘোষ- আমাদের বড়োজেঠু। আমরা বজ্জেঠু বলে ডাকতাম। স্বামীর মৃত্যুর পর ইনদুমতী দেবীর সবচাইতে ভরসার জায়গা, গর্বের বিষয় হলো তাঁরজ্যেষঠ সন্তান। আর আমাদের খোলা আকাশ। বজজেঠু পুরুষ মানুষ হিসেবে মাথায় সামান্য খাটো, ফর্সা টকটকে রং। আমি কখনো তাকে অফিসে যেতে দেখিনি। তবে আমাদের কাছে তখন উনি গল্পের ঝুড়ি নিয়ে বসতেন, বলতেন, আমি দশটা পাঁচটা সওদাগরী আপিসে কেরাণীগিরি করতুম। পরে জেনেছিলাম জেঠু ব্রিটানিয়া বিস্কুটের ফ্যাকটরীতে ক্লার্কের চাকরী করতেন। রিটায়ার করার পরও কোনো মানুষকে সবসময় অমন ধোপদুরস্ত পোষাক পরতে আমি সেই প্রথম দেখেছিলাম। যেকোনো কাজে বাইরে যেতে হলে জেঠু পরতেন কলার ওয়ালা ইস্ত্রী করা সাদা,গিয়ে অথবা আসমানী রংএর পাঞ্জাবী।রঙ্গীন হাফ পাঞ্জাবী আর মালকোঁচা মেরে পরা ধুতি। সে ধুতি পরার এমন কায়দা ছিলো যে এতটুকুও গোড়ালী কখনো দেখা যেতো না। এক উজ্জ্বল ফর্সা দৃপ্ত মানুষ যাকে দেখলেই শ্রদ্ধা করতে আর ভালোবাসতে ইচ্ছে করে। ছোটোখাটো শিরদাঁড়া সোজা গৌরকানতি নির্মেদ সুপুরুষ আমাদের বড়ো জেঠু। সবকিছু করতেন ঘড়ির কাঁটা ধরে। বাড়ীতে লিনেনের হলদে রঙের লুঙ্গি পড়তেন,সেও সেই গোড়ালী পর্যন্ত। কখনো কোনো মহিলার মুখের পানে চেয়ে কথা অবধি কইতে দেখিনি। আমরা যখন জেঠুকে দেখেছি তখন।তার অনেক আগে উনি ষাট পেরিয়েছেন। মাথার চুল পরিপাটি করে উল্টে আঁচড়ে হাতাওয়ালা সাদা গেঞ্জি পরে ঘড়ি ধরে সাড়ে বারোটার দুপুরের খাওয়া খেতে বসতেন। খেতে বসে একটি কথাও বলতেন না আমাদের তো অবারিত দ্বার,যখন খুশি আসি যাই। কখনো জেঠুর খাবার সময় হাজির হলেও চুপটি করে বসে থাকতাম খাওয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত। আরো অনেক বয়সে দেখছিলাম জেঠুর ধবধবে সাদা পিঠে অজস্র লাল লাল তিল। সেই প্রথম জেনেছিলাম তিল লাল রংয়ের ও হয়। প্রতিদিন জেঠু বাসীর ঝাঁট দিতেন। সকাল সন্ধ্যা সারা বাড়ীতে ধূপ দেখাতেন, কি মিষ্টি ছিলো সেই অগুরু ধূপের গন্ধ,সেসব এখন আর পাওয়া যায় না। ফি শনিবার বিকেলে জেঠু দক্ষিণেশ্বরে ভবতারিণী মন্দিরে যেতেন। ফিরতে রাত হয়ে গেলে পরদিন কপালে ছুঁইয়ে দিতেন প্রসাদী ফুল আর ক্ষীরের ছোট্ট প্যাঁড়া। তখন জানতাম না দক্ষিণেশ্বর কতো দূরে, সেখানে কি আছে? রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ, মা সারদা এঁদের কথা জানার প্রথম হাতে খড়ি দিলেন জেঠু। আমার হাতে তুলে দিলেন ছোটদের রামকৃষ্ণ। শ্রীরামকৃষ্ণের বাণী লেখা একটি চটি বই দিয়ে বললেন,এটা রোজ পোড়ো। এক শিশু মনে আধ্যাত্মিকতা দেশপ্রেমের প্রথম বীজ বপন করেছিলেন আমার বড়ো জেঠু। ইংরেজদের গল্প, স্বাধীনতা সংগ্রামের গল্প, নেতাজী, গান্ধীজী, স্বামীজী সবার কথা বলতেন আমাকে,আর আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো গিলতাম সেসব কথা। ওইটুকু বয়েসে সাভারকর ভাইদের গল্প, বল্লভভাই প্যাটেল, বালগঙগাধরতিলক এঁদের কথা শুনে আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠতো। আজ যখন ফিরে দেখি, বুঝতে পারি জেঠু নিজের সান্নিধ্যে রেখে গল্পচ্ছলে আমার শিশু মনকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন পরিনত মনস্কতার দিকে। ওনাদের বাইরের ঘরে ছিলো পাড়ার একমাত্র লাইব্রেরী রবীন্দ্র পাঠাগার।আমার সঙ্গে গল্প সম্পর্কের বাইরের কাজও ছিলো জেঠুর বই বেছে দেওয়া।ওই সময়ে বড়ো জেঠু মনের মধ্যে মানুষ হবার বীজটা পুঁতে দিয়ে নিজে হয়েছিলেন বটগাছ। জেঠুকে কখনো অগোছালো দেখিনি- বাজারে অবধি যেতেন ইস্ত্রী করা ধবধবে ধুতি পাঞ্জাবী পরে। পায়ের কালো পাম্পশু থাকতো একদম আয়নার মতো চকচকে। আমি কখনো কখনো বলতাম, জেঠু আপনি বীয়ে করেননি কেন? একদিন জেঠু আমায় সামনে বসিয়ে বুঝিয়ে ছিলেন, বুঝলে টুটুল!আমি হলুম গে মায়ের ভক্ত। আমি গৃহী ব্রহ্মচারী, আমায় বিয়ে করতে নেই। আমার নাম টুটুন কিন্তু ওবাড়ীর সবাই আমাকে ডাকতেন ‘টুটুল’বলে।
বাস্তবেও দেখতাম জেঠু ব্রহ্মচারীর মতোই থাকতেন। নিজের মা বোন ছাড়া কোনো মহিলার মুখের দিকে চেয়ে কথা অবধি বলতেন না। বাজারে আসা যাওয়ার পথে আমাদের কিছু দিতে এলে আর আমরা বাড়ী না থাকলে মা ঘোমটা টেনে কথা বললেও উনি কিন্তু ভুলেও মুখের পানে চাইতেন না। কাকাতুয়া টাও বড়জেঠুকে খুব সমীহ করতো। বেশী চেঁচামেচি করলে, খিদে পেলে বেশী লাফালাফি করলে খুব বকতেন জেঠু। বলতেন,বুড়ু দিন কে দিন সুশীলের আদরে বডডো বেয়াড়া হচ্ছো। চুপ করে বোসো,নইলে ঘরে বন্ধ করে দেবো।
আমাদের বাড়ীর সামনের আর পেছনটা টালিখোলার তৈরী ছিলো। ঘরের মেঝেগুলো এবড়োখেবড়ো। আমাদের কাছে তাই কাকাতুয়া বাড়ীটা ছিলো রূপকথার স্বপ্নপুরী। আমার যখন সাত আট আর বোনের চারপাঁচ বছর বয়স তখন বাবা ঠিক করলেন বাড়ীতে মিস্ত্রী লাগিয়ে পুরোটা পাকা ছাদ করে মেঝেটা সারাই করবেন। কাজেই মিস্ত্রীরা সবটা ভেঙে ফেললে আমরা দুবোন সারাদিন তো ওবাড়ীতে থাকতামই এমনকি একসপ্তাহ মতো আমরা ওবাড়ীতে রাতেও থেকেছি। স্বপ্নপুরীর ঘরে রাতে ঘুমোবো ভেবে আনন্দে আমার ঘুম আসতেই চাইতোনা। কি আনন্দ! আর কি রোমাঞ্চ! মনে। মনে মনে ভাবতাম মিস্ত্রীদের কাজ যেন অনেকদিন ধরে চলে। আমরা রাতের খাবার ওবাড়ীতে খেতাম গরম রুটি আর সাদা আলুভাজা।আহা অমৃত! বড়জেঠু কি মতন করে মশারীর চারকোণা টানটান করে টাঙিয়ে চারদিকে সুন্দর করে গুঁজে দিতেন। তারপর অনেক রাত অবধি খড়খড়ি লাগানো বাক্স জানালার ওপরে বসে থাকতেন, আমরা ঘুমিয়ে না পড়া পর্যন্ত। আমাদের গল্প শোনাতেন, আমরা দুবোন গল্প শুনতে শুনতে একে অপরকে জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়তাম। সেসময় মা বাবা বাড়ীতেই ছোটবোনকে নিয়ে রান্নাঘরে শুতেন। গভীর রাতে,কারেন্ট চলে গেলে বড়জেঠু জানলা খুলে দিয়ে, পাখা নিয়ে মাথার কাছে বসে বাতাস করতেন। নীলরং এর ডিমলাইটের আলোয় আমরা একা ঘরে ভয় পেতে পারি ভেবে সারারাতের কতোবার যে দেখতে আসতেন তার ইয়ত্তা নেই। আমাদের শোওয়া খুব খারাপ ছিলো। সারারাত ঘুমের মধ্যে গোটা বিছানায় ঘুরতাম। অনেকবার আমরা খাট থেকে পড়েও গেছি। সেসময় ওবাড়ীতে যখন আমরা শুতাম একরাতে আমার বোন খাট থেকে পড়ে গিয়েও মশারীতে ঝুলছিলো।জেঠু এসে দেখতে পেয়ে বলেছিলেন, একি মা, টুটুল ! তুমি বোনকে ফেলে দিলে খাট থেকে! আসলে ঘুমিয়ে ঘুমিয়েও তো আমাদের হাত পা ছোড়ার বিরাম ছিলো না। জেঠু বোধহয় একটু ঘুমিয়ে জেনে কি ঘুমোননি ‘ধুপ’ আওয়াজ শুনেই ছুটে এসেছেন। টিংকু বরাবরই ঘুমোতে খুব ভালোবাসতো,ওতো খাট থেকে পড়ে গেছে টের ই পায়নি, ঝুলন্ত অবস্থায় ই ঘুমিয়ে যাচ্ছে। জেঠু এসেই ওকে মশারী থেকে উদ্ধার করলেন, কোথাও লেগেছে টেগেছে কিনা সব পরীক্ষা করে আবার শেষরাতে সুন্দর করে মশারী টাঙিয়ে, চারদিক টানটান করে গুঁজে, দুধারে দুটো বড়ো পাশবালিশ লাগিয়ে ঘুমোবার ব্যবস্থা করে দিলেন। আসলে সেসময় জীবনের পরতে পরতে মেশানো থাকতো ভালোবাসা মাখা দামী সম্পর্কগুলো। সেই পুরোনো সম্পর্কগুলোতে হয়তো রক্তের বন্ধন ছিলোনা, কিন্তু সততা আর বিশ্বাসের ভিত ছিলো বড়ো মজবুত। ওই স্বপ্নপুরীতে আমাদের কোনো ক্ষতি হতে পারে না এই বিশ্বাস আমাদের বাবা-মারও ছিলো। তাই বড়ো নিশ্চিন্তে থাকতেন ওনারা। নীচের ছবিটি ছোটজেঠুর বিয়ে উপলক্ষ্যে কেনা ক্যামেরায় ছোটো জেঠুর তোলা আমরা দুইবোন আমাদের শৈশবের প্রিয় মানুষটির সাথে ফটো তোলার পোজে দাড়িয়েছি। সেসময় ওবাড়ীতে আনন্দের জোয়ারে ভাসছি আমরা সবাই। তাই ফটো তোলা হবে শুনে আমরাও পোজ নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিলাম। এই ছবি প্রায় আটচল্লিশ উনপঞ্চাশ বছর আগের তোলা- এলবামের পাতা জুড়ে বসেছিলো স্মৃতি হয়ে। আজ লেখনীর সবারথে এটি যে এতোবড়ো ঐতিহাসিক দলিল হবে কখনো ভাবিনি। এটি যে বড়ো জেঠু আমার মায়ের হাতের বড়ি দিয়ে লাউশুক্তো, মোচার ঘন্ট, নিরামিষ এঁচড়ের,ডুমুরের তরকারী, ঠান্ডা ঝোল এসব খেতে বড়ো ভালোবাসতেন।মাও ওসব বানালেই ওবাড়ীতে নিশ্চিত একবাটি পাঠাতেন ই। দিদু মারা যাবার পর থেকেই বড়জেঠু নিজেই আস্তে আস্তে লাটাই গোটাতে শুরু কররেন। যে জীবন প্রৌঢ়তবে এসে থমকে গিয়েছিলো এক ভালোবাসা ময় জ্ঞানী ব্যকতিতবসমপনন সোজা মেরুদন্ডের বড়োজেঠু কে আমরা চিনতাম একঝটকায় মানুষটার মেরুদন্ড নুইয়ে পড়তে শুরু করলো। মায়ের অসুস্থতার সময় বাইরের কাজ আগেই ছেড়েছিলেন,আস্তে আস্তে ঘরের সব কাজকর্মের থেকেও মুখ ফেরাতে শুরু করলেন। আমাদেরো উঁচু ক্লাস হয়ে পঢড়াশুনোর চাপ বাড়লো, আমাদের চারপাশের ভালোলাগার জগৎটাও আস্তে আস্তে বদলাতে শুরু করেছিলো। বাড়ীতে প্রবল গৃহযুদ্ধ শেষে বিজয়ীর শিরোপা নিয়ে প্রবেশ করলো এক বোকাবাক্স। আর আমরা তাকে ঘিরে এক স্বপ্নের সোনালী দুনিয়ায় নতুন করে গা ভাসাতে শিখলাম। সপ্তাহে দুচার দিন স্বল্প সময়ের জন্য অভ্যাসবশত গেলেও কথা বলার মতো কেউ ছিলনা বলে আমাদেরো আকর্ষণ কমে গেলো। মাঝে মাঝেই দুইভাই বাচ্চাদের মতো প্রবল ঝগড়াঝাঁটি করতেন। আসলে যে বয়সে দুটি প্রৌঢ়কে পরিবারের সকলের আগলে রাখা র কথা সেই বয়সে তারা হয়ে গেলেন চরম একা। তখন আমাদেরো জীবন সম্বন্ধে এতো গভীরতা তৈরী হয়নি। মেজ জেঠু দোকান বাজার রান্না, অফিস, ঘরের কাজ সব সামলে আর ধৈর্য্য রাখতে পারতেন না। বাইরের বারান্দায় চওড়া তাকে বসার জাগয়াটায় একটা ময়লা লুঙ্গি পড়ে কাজের অবসরে, পায়ের ওপর পা তুলে বসে যখন হাতের বিড়িটায় সুখটান দিতেন একা একা তখন ভীষণই অবসন্ন দেখাতো ওনাকে। ধীরে ধীরে একটা সময় বড়োজেঠু কথাবার্তা বলাও ছেড়ে দিলেন। আমি মাস্টার্স করতে করতেই চাকরী পেয়ে চলে গেলাম কলকাতার বাইরে। মায়ের চিঠিতে জানতে পেতাম ওনাদের শরির বেশ খারাপ। প্রায় ই মা শুকতো বানিয়ে পাঠালে তবেই ভাত খেতেন। কখনো কখনো বায়না করতেন আমি মিনুর হাতে খাবো। মিনু হলেন আমার মা, তিনি সারাজীবন ভাসুর জ্ঞানে ঘোমটা টেনে দূর থেকে কথা বলেছেন, সেদিন ভাত মেখে দিলেও নিজে হাতে খাইয়ে দেবার আগলটুকু ভাঙতে পারেননি। শেষের দিন দুপুরের দিকে ওইরকম ছেলেমানুষী করছেন দেখে মেজজেঠু বাধ্য হয়ে মাকে ঠেকে নিয়ে যান।মা গিয়ে দেখে, বারবার পায়খানা হচ্ছে আর কাপড়চোপড় নষ্ট হচ্ছে বলে মেজজঠু একটা গামছা পরিয়ে উঠোনে বসিয়ে রেখেছেন।মাকে দেখেই বলে উঠলেন,দেখো মিনু সুশীল আমার কি হাল করেছে।মা আস্তে আস্তে ধরে ঘরে এনে শুইয়ে দিয়ে ওষুধ খাইয়ে দিতেই আস্তে আস্তে ঘুমিয়ে পড়লেন। সন্ধ্যের দিকে মা দেখতে গেলে,মাকে বলেছিলেন, আমাকে রাতে একটু গরম গরম রুটি আর আলুভাজা করে দিও তো।মা দিয়েছিলেন, খুব অল্প ই খেয়েছিলেন কিন্তু খুব তৃপ্তি সহকারে। সেই শেষ খাওয়া। সে রাতেই ইহলোকের মায়া ত্যাগ করেন আমাদের বড়োজেঠু।