সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে দীপশিখা দত্ত (পর্ব – ২)

কাকাতুয়া বাড়ী (পাখিটা)

কাকাতুয়াটার সঙ্গে সম্ভবতঃ আরো কিছু পাখি কিনে এনেছিলেন মেজজেঠু, হাতিবাগান থেকে। আমাদের ছেলেবেলায় কাঁধে করে খাঁচাভর্তি পাখি নিয়ে রাস্তা দিয়ে পাখিওয়ালা বিক্রি করতে যেতো। টিয়া, ময়না, বুলবুলি, কাকাতুয়া আরো অনেক রকমারী পাখি। অনেকে দরদাম করে কিনতো, পোষার জন্য। আবার কেউ কেউ ঘুঘু, ডাহুক এসবও কিনতো, মাংস রান্না করে খাবে বলে। তখনো বাঙালীর হেঁশেল ঘরে পোলট্রী মুরগী এতো রমরমা ছিলো না। অনেকে হাঁসের মাংস খেতো,দেশী মুরগীও চলতো। মেজজেঠু মুরগী রাঁধতেন আলাদা করে রাখা একটা তোলা উনুনে।
আমি একদম ছোটবেলায় দেখতাম কাকাতুয়াটা মাঝের একখানা ঘরেই, পায়ে শিকল বাঁধা অবস্থায় দাঁড়ের ওপর বসে থাকতো। ওই ঘরেই ছিলো মেজজেঠুর আস্তানা। ওই ঘরের কোনায় একটা লোহার খাটে উনি অবসর সময়ে শুয়ে থাকতেন।
দিদুর মুখে শুনেছি, কাকাতুয়ার সঙ্গে দুটো টিয়াও ছিলো। টিয়াপাখিগুলো নাকি কথা বলতেও শিখেছিলো। একদিন স্নান করিয়ে, উঠোনে খাঁচা রোদে দিতেই খাঁচা খোলা পেয়ে টিয়াগুলো উড়ে পালিয়ে যায়,আর ফেরৎ আসেনি। দিদু বলতেন, “বুঝলে টুটুল, টিয়া পাখি বড্ডো বেইমান হয়। ওরা কখনো পোষ মানে না, সুযোগ পেলেই বেইমানি করবেই!” তখন দিদুর পায়ে পায়ে এঘর থেকে ওঘর ঘুরঘুর করতাম আর মাথা নেড়ে নেড়ে সায় দিতাম। বুঝতাম নাতো, পাখির কি আর খাঁচায় বন্দী জীবন ভালো লাগে?
কাকাতুয়াটাকে জেঠুরা আর দিদু ডাকতেন ‘বুড়ু’ বলে। আমরা কাকাতুয়াটার কাছে গিয়ে জোরে জোরে গাইতাম,”লালঝুঁটি কাকাতুয়া ধরেছে যে বায়না, চাই তার লাল ফিতে চিরুণী আর আয়না।” তখন ‘বাদশা’ সিনেমার এই গানটা বাচ্চাদের খুব প্রিয় ছিলো। বলতাম,”কিরে লাল ফিতে নিবি, চিরুণী নিবি?” জিজ্ঞাসা করলে, চুপ করে দাঁড়ে বসে থাকতো, কি বুঝতো কেজানে আর চ্যাঁচাতো না।
অনেক ছোলা ভিজিয়ে দাঁড়ের বাটিতে অল্প অল্প করে দিতো মেজজেঠু। কখনো দেখতাম শীতকালে পাখিটা কাঁচা ছোলার গাছ থেকে ঠোঁট দিয়ে খোসা ছাড়িয়ে মিষ্টি ছোলা খাচ্ছে। কাকাতুয়াটা বিস্কুট খেতো, মাখন লাগানো পাউরুটি টোস্ট,রুটির টুকরো,জল,পাকা পেঁপে, পেয়ারা, আপেল এইসব খেতো।
আমাদের চিনে যাওয়ার পর থেকে,দেখলেই দাঁড়ের ওপর লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে একাকার করতো, কখনো কখনো ঘাড় নেড়ে নেড়ে নিজের দিকে ডাকতো। হলদে ঝুঁটি তুলে ক্যাঁও ক্যাঁও করে মধুর স্বরে ঠেকে ডেকে আহ্লাদ করতো। একদিন দিদু বলে দিয়েছিলেন, “ভুলেও ওর কাছে যাবে না, ও কিন্তু কামড়ে দেবে।” আমরা শুনতাম, দূর থেকেই সবাই কথা বলতাম ওর সাথে। পাখিটার রাগ হলে বাঁকানো ঠোঁট দিয়ে পায়ের শিকলি কাটার চেষ্টা করতো। দিদুর মেয়েরা অনেকদিন পর পর আসতেন বলে পাখীটা মেয়েদের দেখেও প্রথম কদিন চিৎকার করতো, শেষে বকুনি খেয়ে চুপ হতো। বকলে পরে রাগ করে খেতো না। তখন আবার মেজজেঠু ওকে তোয়াজ করে খাওয়াতেন।
কতোদূর দূর থেকে,অন্য পাড়া থেকে লোকেরা ছোটো বাচ্চা সঙ্গে নিয়ে এসে বলতো,”আমরা কাকাতুয়াটা একবার দেখবো”,বলে দেখেই চলে যেতো। বাড়ীটা পাখিটার নামেই প্রসিদ্ধ হয়ে গেলো। সবাই বলতো ‘কাকাতুয়া বাড়ী’! বিহারীরা বলতো ‘তোতা কা ঘর’। কাকাতুয়া কে তোতা কেনো বলতো কে জানে?
আমার ছোটো বোন পাপু যখন খুব ছোট্ট ছিলো, মা বাড়ী না থাকলে কান্না জুড়তো,তখন আমরা ওকে ট্যাঁকে নিয়ে কান্না থামাতে যেতাম পাখি দেখাতে। কখনো রাতের বেলায় পাখী দেখতে কেউ এলে সে দেখতে পাবেনা।দিদু আর জেঠুরা খুব বিরক্তি সহকারে বলতেন,”এখন পাখী ঘুমোচ্ছে, এখন দেখা হবে না। দিনের বেলায় এসো।” পাখীটা বেড়াল, ইঁদুর, আরশোলা এসব দেখলেই খুব চিৎকার করতো।
পরিবারটা যখন একদম ছোটো হয়ে গেলো তখন পাখিটা একলা অতবড়ো একটা ঘরে রাজকীয় ভাবে থাকতো। মেজজেঠু তখন বাইরের ঘরে শুতেন।
আমি ১৯৮৮তে চাকরী পেয়ে মালদা যাবার আগ পর্যন্ত পাখীটাকে দেখেছি,বেশ বুড়ো হয়ে গিয়েছিল। তেমন চেঁচামেচি করতো না। মাঝে মাঝে ইচ্ছাসুখ খেতো,নইলে দাঁড়ে বসে ঝিমোতো। বাড়ীর মালিকানা বদলের আগে মনেহয় মেজজেঠু পাখিটা কাউকে দিয়ে দিয়েছিলেন।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।