মার্গে অনন্য সম্মান ধৃতিমান দত্ত (সেরা)

অনন্য সৃষ্টি সাহিত্য পরিবার
সাপ্তাহিক প্রতিযোগিতা পর্ব – ৭৪
বিষয় – সরস্বতী পূজা
অপহৃত শৈশব
সকাল সকাল অরূপ পাজামা-পাঞ্জাবী পড়ে বেরিয়েছিল সরস্বতী পূজোর অঞ্জলি, পূজো, আরও অনেক কিছু দেখবে আর খাবে বলে। পুস্পাঞ্জলি দিতে অনেক পুরুষ- মহিলারা এসে দাঁড়িয়েছেন। সুন্দর সব সাজ…ধুতি-পাঞ্জাবী, রঙ-বেরঙের শাড়ীর মেলা, সুগন্ধি আতর, হাতে, মাথায়, খোঁপায় ধবধবে সাদা জুঁইফুলের চমকে সেদিন আত্মহারা না হয়ে পারেনি। সামনে যে দাঁড়িয়েছিল মাথায় এত সুন্দর ফুলের সাজ আর পুঁতির মালা… শেষে লোভ সামলাতে না পেরে চুল ধরে দিয়েছে সটান এক টান আর ব্যস! নিমেষে সব মালা ছিঁড়ে মাটিতে পড়ে সাজের একেবারে দফারফা। সঙ্গে সঙ্গে সে ‘আঃ’ বলে চিৎকার করে উঠলো; তারপর ঘুরে সজোরে এক থাপ্পড়। আর তারপরেই কান্নাকাটি। ওর কিছু বন্ধু আর লোকজন ওকে ওখান থেকে সরিয়ে নিয়ে গেল। অরূপের আশেপাশের লোকজন অরূপকে যাচ্ছেতাই বলতে লাগল মারমুখী হয়ে। সে আর থাকতে না পেরে লজ্জায় ঐ পরিবেশ থেকে বিদায় নিল প্রহারের ভয়ে। পরে অনুতাপ হয়েছিল অনেক- কেন করল সে এমন কাজ? কি হয়েছিল তার সেদিন?
হয়তো অনেক কিছুই মনে মনে ছবি হয়ে যায় নাটকীয় দৃশ্যপটের মতো। কিন্তু বলা বাহুল্য ঘটনার নায়ক অর্থাৎ অরূপ তখন তিন বছরের শিশু। আর যার চুল ধরে টেনেছিল তার বয়স কোনভাবেই পাঁচ বছরের বেশী হবে না। সে ছিল অরূপদেরই প্রতিবেশী। যাঁরা বকাবকি আর মারধোর করতে যাচ্ছিলেন তাঁরা হলেন স্বয়ং তাদের পরম পূজনীয় জনক-জননী যাঁদের সাথে তারা পূজো দেখতে বেরিয়েছে।
আজ সে অনেক বড় হয়েছে। উচ্চশিক্ষা নিয়ে বিদেশে সুখী দাম্পত্য জীবনে আবদ্ধ হয়ে আজ তারও একটা পাঁচ বছরের শিশুসন্তান। আবার দেখা তাদের সরস্বতী পূজোতে। মাঝে অনেকগুলো বছর শুধু পরিবর্তনের সাক্ষী হয়ে ছিল। কিন্তু আজ আর তার নেই কোনো রঙবরঙের সাজ, নেই চন্দনের ছোঁয়া আর জুঁইফুলের প্রাণঢালা সুবাসের উদ্বেলতা। চলনে, কথনে, পরনে সারা মুখ শুধুই পশ্চিমের ঢেলে দেওয়া উচ্ছিষ্ট সংস্কৃতির অনুজ্জ্বল আভার মোড়কে ঢাকা। ঠিক অরূপের সামনেই ফুটফুটে বাচ্চাটা দাঁড়িয়ে অবিকল সেদিনের মতই। কিন্তু বাচ্চাটার চুল ধরে টানবার ইচ্ছা বোধহয় সেদিন কারও ছিল না। সেই চুলেও যে খেলছে রীতিমত পাশ্চাত্যের ঢেউ যা টানবার জায়গা অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে খুঁজলেও পাওয়া যাবে না। এখন আর সেদিনের বাচ্চাটাকে অরূপ খুঁজে পাচ্ছে না যার চুলটা ধরে কেউ টানবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে। যার হাতে থাকবে না বাবা-মার ধরিয়ে দেওয়া কোনো স্মার্টফোন, থাকবে না তাতে কোনো গেম অ্যাপ। থাকবে না কানে গোঁজা সরু লিকলিকে তারের হেডফোনটা। থাকা চলবে না তার ক্ষুদ্র হাতের মুঠোতে ধরা দানবাকার ট্যাবলয়েটটা পাছে ঘুরে চড় মারতে অসুবিধা হয়। ওদের হাতগুলোকে মুক্ত রাখতে হবে। সেলফি শেখার সময় তো এখন নয় এদের। এসব কি সরস্বতী পূজোতে মানায়? অরূপ বুঝতে পারছে না এসব এরা কি করছে! কেন করছে?
আর বোধহয় নিজেকে সামলানো যাচ্ছিল না। হঠাৎ চোখাচোখি হতে মৃদু হেসে সে অরূপকে একবার শুধু জিজ্ঞাসা করলো- “ভালো আছো?” অরূপ না-এর ইঙ্গিতে ঘাড় নাড়লো। আবার প্রশ্ন- “চিনতে পারছো?” রাগে, দুঃখে আর ক্ষোভে বলে উঠলো- “না। আমি তোমাদের কাউকেই চিনে উঠতে পারিনি।” বলেই আচমকা মারতে শুরু করলো। ও ‘বাঁচাও বাঁচাও…হেল্প….’ বলে চীৎকার জুড়ে দিল। পূজোর সব জোগান লন্ডভন্ড হতে শুরু করলো। চারদিক থেকে সমস্ত লোকজন ছুটে এসে অরূপের কবল থেকে ওকে ছাড়াবার চেষ্টা করলো। পুলিশ টুলিশ ঢুকে পড়ে সে একেবারে বিশৃঙ্খল অবস্থা। অরূপের কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। তার অবলীলায় হাত চলতে থাকলো। পুলিশের দল অরূপের চুলের মুঠি ধরে তাকে টেনে হিঁচড়ে ভ্যানে নিয়ে গিয়ে তুললো।
এদিকে অরূপের চড়-থাপ্পড়, কিল-ঘুষি সব বিছানা-বালিশের ওপর পড়তে লাগলো।
– “কি হলো! হাত পা ছুঁড়ছো কেন? এবার ওঠো। অঞ্জলি দিতে যাবে না? তাড়াতাড়ি রেডি হও। আমার হয়ে গেছে। তোমার এক সেট পাজামা-পাঞ্জাবী বের করে দিয়েছি।”
সম্বিত ফিরে পেতে অরূপ টেবিলঘড়ির দিকে তাকায়। নিজেকে সামলে নিয়ে ভালো করে দেখে স্ত্রী আর মেয়ের সাজ। অবিকল ছোটবেলার সেই বাচ্চাটার মতই। সব কিছুই হুবহু এক। শুধু মাঝখানে অনেকটা সময়ের পার্থক্য। একটা যুগ বললেও বেশী বলা হবে না। এখনও তো পুরোমাত্রায় বজায় আছে বাঙালী সংস্কৃতির ঐতিহ্য যা সময়ের ব্যবধানে মলিন হয়ে যায়নি।
একটা কালো ডিজিটাল দৈত্য এসেছিল ওদের শৈশবকে কিডন্যাপ করে নিয়ে যাবার জন্য। এরই নাম কি প্রগতি? আচ্ছা; মা সরস্বতী কি এটাই চেয়েছিলেন? শুধু শুভেচ্ছা রাখলো অরূপ আগামী প্রজন্মের জন্য আর মনে মনে বললো- “মা! ভাগ্যিস তুমি এখনও তোমার মতই আছো চেতনায়, শিক্ষায়। তাই তো বাঙালির ঘরে ঘরে আজও তোমার পূজা আর আরাধনা বেঁচে আছে। তোমার লাবণ্যময় রূপ আর সাধনা যেন পশ্চিমের অস্তগামী সূর্যের মত না হয় মা।” অরূপের মনে হলো সে আজকের দিনের জন্য সবচেয়ে সুখী মানুষ।
ততক্ষণে বাইরের মাইক্রোফোনে বাজতে শুরু করেছে- “সরস্বতী মহাভাগে বিদ্যে কমললোচনে……।”