প্রবন্ধে দেবযানী ভট্টাচার্য

বর্তমান যুবসমাজ ও গুরুজন অমান্য

“অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ পৃথিবীতে আজ”- কবে লিখিয়াছিলেন জীবনানন্দ! আজ যেন তা আরো বেশি প্রাসঙ্গিক হইয়া উঠিয়াছে। অধুনা উদ্ভ্রান্ত, হুজুগে, উৎসব মুখর, নিজ সংস্কৃতির প্রতি আস্থাহীন , উন্নাসিক, ভীতি প্রদর্শনকারী, স্বার্থপর, আত্মসুখে নিমজ্জিত এক প্রকার যুব সমাজ আমাদের দেশ ও জাতির ভবিষ্যত হইয়া উঠিয়াছে। ইহাদের সবজান্তা ভাব এবং পূর্বের সমস্ত কিছুকেই নস্যাৎ করিয়া ক্ষুদ্র প্রমাণ করিবার এক প্রয়াস আমাদিগের চেতনায় আঘাত হানিতেছে। ‘গুরুজন ‘- শব্দটির প্রতিই এক ধরনের তাচ্ছিল্য বর্ষণ চলিতেছে! ইহাদের পিতামহ নাই, প্রমিতমহ নাই, শিকড়ের টান নাই, কেবল আর্থিক লাভবান হইবার নেশায় দিশাহীন তীব্রবেগে সম্মুখ পানে ধাইতেছে –।
কিছু বৎসর পূর্বেও রাস্তাঘাট ক্লাব , বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস, বাজার দোকান সর্বত্র গুরুজনের দৃষ্টি তাহাদের নিরবে শাসন করিত এবং লজ্জা ,ভয় জাতীয় বিষয় গুলি ইহাদের অবচেতন চেতনায় একটি দণ্ডের মতো প্রহার করিত! ভাবিবার অবকাশ তৈরি করিয়া দিত, কিন্তু চির সবুজের দল আজ নিজেই নিজের অভিভাবক হইয়া উঠিয়াছে এবং আত্ম সন্তুষ্টি তে বিভর হইয়া প্রবল সুখে নিম্মজিত হইয়া আছে, ইহাদের উৎসব উদযাপন ব্যতীত আর কোনো কিছুই করিবার নাই। বহুকাল আগে ‘ আতঙ্ক ‘ চলচিত্রের একটি হাড় হিম করা সংলাপ ,”মাস্টারমশাই আপনি কিন্তু কিছুই দেখেন নি “- শুনিয়া ভ্রু যুগল কম্পিত হইয়া উঠিয়াছিল, ইহাতে যে বার্তাটি সমাজের গুরুজনদের প্রতি দেওয়া হইয়াছিল আজ তা সার্বিক অর্থে সত্য হইয়া উঠিয়াছে।

যদি ভাষার কথা ধরি,যুব সমাজ সর্বদাই এটিকে মর্যাদা দেয় অথবা নতুন একটি ধারা তৈয়ার করে, যদি বঙ্গের দিকে দৃষ্টিপাত করি তবে অদ্ভুত একটি বাংরেজি ভাষার জন্ম হইয়াছে ইহাদের মুখ নিঃসৃত হইয়া, আর সেই ভাষার স্পর্ধায় গুরুজন কে অমান্য করিবার ,খিল্লি করিবার, অপমান করিবার এক অসীম স্পর্ধা ইহাদের সবজান্তা, লঘু গুরু বিভেদ বর্জন করিবার সাহস যুগাইয়া তুলিয়াছে।

কেবল মাত্র দোষারোপ করিয়া দাগিয়া দেওয়া আমাদিগের কাজ নহে, এই রূপ যুব সমাজ তো একদিনেই কোথা হইতে পতিত হয় নাই, একটি জাতির অবক্ষয়ের ফল স্বরূপ ইহারা আজ বর্তমান। আমাদের নেতৃত্বহীনতা , পালন পোষণে বিস্তর ফাঁক রহিয়া গিয়াছে, আমরাই উহাদের একান্নবর্তী সংসার,গুরুজনদের হইতে বিচ্ছিন্ন করিয়া , উহাদের দোষ ত্রুটি গুলি চোখে আঙ্গুল দিয়া দেখাইয়া একান্ত নিজের কুক্ষিগত করিয়া রাখিবার প্রয়াস করিয়াছি, আমাদিগের উচ্চাশা ইহাদের শিকড় হীন করিয়াছে , অভিভাবকের আশীর্বাদ বা বিচক্ষণ অভিজ্ঞতা যে আমাদিগের যাপন কে দিশা দেখাইবে এই ভাবধারাকে নিজ হস্তে খুন করিয়াছি, শিব গড়তে বাঁদর প্রস্তুত করিয়াছি !! আমরা দৃষ্টান্ত প্রস্তুত করিতে যে নীতি বা আদর্শ প্রস্তুত করিবার প্রয়োজন ছিল তাহা বিনষ্ট করিয়াছি , ফলস্বরূপ উহারা কলার উঁচাইয়া , আস্তিন গুটাইয়া গভীর আঁধারের দিকে ,’ আমার জীবন ,আমার ইচ্ছে ‘ বলিয়া ধাবমান হইতেছে।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।