মার্গে অনন্য সম্মান দেবাশিস বসু (সেরা)

অনন্য সৃষ্টি সাহিত্য পরিবার
সাপ্তাহিক প্রতিযোগিতা পর্ব – ৬৭
বিষয় – মাতৃভাষা
রাজপথ রক্তে ভেসেছিলো
শিকড়টা ছড়িয়েছিল ইতিহাসের ধূসরতায়
রাজপথ রক্তে ভেসেছিল
সবে বসন্ত এসেছিল
শিমুল পলাশ মাদারের লালে ছিল উন্মাদনা
কুটো মুখে নিয়ে পক্ষীমাতার উড়ানে ছিল দুঃসাহস
মেডিকেল কলেজ ছাত্রাবাসে বারো নম্বর শেডের
বারান্দা ভেসে গিয়েছিল রক্তের প্লাবণে
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বই গড়িয়েছিল পথের ধূলায়
ডাক্তার হাতে করে বয়েছিল গুলিতে ছিটকানো মগজ-
মগজহীন রফিক ছাত্রাবাসের সতেরো লেখা ঘরে
সালাম তো ছিল এক সামান্য পিয়ন
কলকাতায় বন্দর কর্মী
স্কুলের গণ্ডিও সে ছাড়ায়নি
সেই তো বুঝেছিল মায়ের ব্যথা
গুলিবিদ্ধ দেড় মাস শায়িত হাসপাতালে
এক মুঠো ফুল দিও
আজিমপুরের সাড়ে তিন হাত ভূঁয়ে
হাইকোর্টের কেরানী বা প্রাথমিক পাশ কৃষিজীবী জব্বার
তারাও তো মায়েরই সন্তান
হৃদয় জ্বলেছিল মায়ের অপমানে
উর্দির সাথে ভাষার মৃত্যুসংগ্রামে
তারা আমার মুখের কথা কেড়ে নিতে চেয়েছিল
কচ্ছপের মতো আমি আমার বাড়ী পিঠে করে ঘুরে বেড়াই
আমার বাড়ী আমার ভাষা
গোপনে নিঃসৃত দুগ্ধধারার সাথে
এ ভাষা আমার মায়ের নাড়ি
সময়ের সাথে ঝাপসা হয়ে আসে স্মৃতি
তবুও তুমি জীবন্ত আমার ভাষায়
শিশুর লালাগ্রন্থির জারকে ভেজানো
ঐ আঠালো স্মৃতিই আমার ভাষা
লুকোনো আচারের বয়ামে
পকেটের আধ খাওয়া পেয়ারায়
কিশোর প্রেম বানভাসি বিচ্ছেদ
আর প্রথম মৈথুনের উচ্ছ্বাসে ছিল আমার ভাষা
বাড়ী থেকে বেরিয়ে রাস্তায় খুঁজে পাই অচিন শব্দের মিছিল
এমনই মুখোমুখি আমার ভাষা অচেনা শব্দ জটিল
পালী মাগধী মৈথিলী অবহট্ট হয়ে
হাজার বছরের ধূসর ইতিহাসে
হয়তো ভালোবেসেছিল বানজারা পরদেশীকে
কিছু মিশে গিয়েছিল শরীরে
কিছু শব্দসন্তান হারিয়ে গিয়েছিল বিস্মৃতির অন্ধকারে
তাল তমাল হিজলের ফিসফাসে আমার ভাষা
আলগোছে ঘোমটা সরানো বধূর
চাল ধোয়া জলের ধূসরতায়
পিদিমের স্নিগ্ধ আলোয় তুলসীতলায়
শিউলি ফোটার শব্দে শিশিরের ছোঁয়ায়
মাটির নিঃশ্বাসে বৃষ্টির প্রথম ফোঁটা শুষে নেওয়ায়
শেষ বিকেলে রোদের ছায়ায় বকের ডানায় আমার ভাষা
কালোচোখ তালপুকুরের ভাবসমাধিতে আমার ভাষা
সন্ধ্যায় পথহারানো হাঁসের কাতর ডাকে আমার ভাষা
ফাগে ঢাকা কিশোরীর লজ্জালাল মুখে আমার ভাষা
পায়ে পা ঘষা আলোছায়া চুম্বনে আমার ভাষা
একুশে ফেব্রুয়ারীর রক্তরাঙা দুপুরে ছিল তার আভাস
হলুদ ব্যাকরণ বইতে নয়
সালাম বরকত রফিক শফিক জব্বারের সমাধিতে পাবে তাহার ইতিহাস