T3 || স্তুতি || শারদ বিশেষ সংখ্যায় দেবদত্তা বিশ্বাস

চোরাস্রোতের গতিপথে
প্রবাহমান তিস্তা। পার্বত্য প্রবাহের সুগভীর বহমানতা পেরিয়ে সমভূমি প্রবাহে নিজের সবটা উজাড় করে এক সময় এসে থমকে দাঁড়ায় গজলডোবা ব্যারেজে। খানিকক্ষণ জিরিয়ে রংধামালীর পথে আবার একটু গতি বাড়ায় সে। বর্ষায় টই টুম্বুর নদীর রূপ ও গাম্ভীর্যের তুল্য মূল্য বিচার করা বড়ই কঠিন। সে সময় এই পথে পাহাড়ি আবেগ আর সমতলের আকাঙ্ক্ষার মুহুর্মুহু গর্জন ঘূর্ণি তোলে জলে।চোরাস্রোত বয়ে যায় হিমশীতল ঘোলাটে ঠান্ডা জলে।
বছর সতেরোর মুকুল নদীর পাশের ঝোপটায় প্রায় দু’ঘণ্টা বসে। পাশের ঝোপে খসখস শব্দে একটু ফিরে তাকিয়ে নিতাইকে দেখে মুকুল। ওদের দলে নিতাইটা একটু ভীতু স্বভাবের। গতকাল এই ঝোপগুলোর মধ্যে একটা কালচিতি সাপ দেখেছিল সে। আজ তাই বায়না ধরেছিল ‘মুই না যাম’। পিছনে সজোরে লাথি কষে মুখে এক প্যাকেট গুটকা ঢেলে মুকুল বলে ‘শালা ভাদাইমা, ঘরে একটা বিষধর সাপ পুষে রেখে ঝোপের সাপ ভয় পাচ্ছিস?’ নিতাই চোখ গোল করে বলে ‘কে?’ ‘কেন তোর শুয়োরের বাচ্চা বাপটা?’ লালচে দাঁতের ফাঁক দিয়ে ব্যঙ্গাত্মক হাসি ফুটে ওঠে মুকুলের। খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে ওদের দলের বাকি শাগরেদ লাকি আর প্রীতম।
নদীর ডান দিকের বাঁধ ঘেঁষে একটা কাঠের লগ ভেসে আসে। সঙ্গে সঙ্গে হুইসেল বাজিয়ে ওদের সংকেত পাঠায় পালের গোদা আরিফ। চারটা মিলে ঝাঁপিয়ে পড়ে জলে। কখনো খাবি খায় কখনো ভেসে যায় তবুও প্রাণপণে লগটাকে আঁকড়ে থাকে ওরা। দিনের আলোতে তবু দৃশ্যমানতা স্পষ্ট হয়। কিন্তু রাতের আঁধারেই এই কাজ করা ভালো। অন্তত আরিফের নির্দেশ সেটাই।। উল্টো দিকের বাঁধ থেকে ঝাঁপিয়ে তখন জলে ঘুপঘাপ শব্দ তুলে সাঁতার কেটে এগিয়ে আসে আরো চার-পাঁচ জন। আরিফ ওদের বলে অ্যান্টি পার্টি। জীবনের বাজি রেখে খরস্রোতা তিস্তায় গাছের গুঁড়ি নিয়ে লোফালুফি খেলে সদ্য মরদ হয়ে ওঠা কয়েকটি ছেলে। প্রতিদিন রাত জেগে ছেলেগুলো কমবেশি লগ টেনে দুশো তিনশো টাকা রোজগার করে। যেদিন জলে বেশি কাঠ ভেসে আসে আর আন্টি পার্টির মুখ থেকে সেগুলো ছিনিয়ে ওরা প্রায় সারা রাত জলে খাবি খায় সেদিন উপরি পাওনা ও কিছু মেলে। আরিফ হাতে থুতু লাগিয়ে নোটগুলো গুনে ওদের হাতে দিয়ে চোখ টিপে বলে ‘যা শালা মস্তি কর’। এরপর কাঠের লগগুলো ভ্যানে তুলে হাতে দারুর বোতল নিয়ে কোন অজানা উদ্দেশ্যে আরিফ মিলিয়ে যায় সে খবর অবশ্য মুকুলদের জানা নেই। ট্যাঁকে টাকা গুঁজে দু একদিন অবশ্য মস্তি করে পয়সা উড়িয়েছিল মুকুল গোলাপির আঁচলের তলায়। ওর চাইতে পাঁচ সাত বছরের বড় বিধবা মহিলা ছেলে নিয়ে একাই থাকতো দরমার বেড়া ঘেরা ঘরটায়। ছেলেটা ঘুমিয়ে পড়লে মুকুল বেড়া ঠেলে আস্তে আস্তে পা বাড়াত বেটির বিছানার দিকে। দারুর বোতল খুলে বসলে গোলাপি ঝাল ঝাল করে মেখে আনত ছোলা। একদিন ছোলা মাখা কাগজটাকে কুড়িয়ে নিয়েছিল মুকুল। ছোট ছেলেটার বই থেকে পৃষ্ঠাটা ছিঁড়ে এনেছিল গোলাপি। একটা ছবি আঁকা ছিল তাতে। নামটা মনে না থাকলেও মুকুলের মনে পড়ে ছেলেবেলা অনেক কবিতা পড়েছিল ওঁনার লেখা। হ য ব র ল নাকি হ য র ল ব কিসব কবিতা ছিল ওর রঙিন বইটাতে। কিছুটা আবেগ তাড়িত হয়ে মুকুল ধমকে বলেছিল গোলাপিকে ‘ছেলের বইয়ের আর একটা পাতাও ছিঁড়বি না তুই’। এরপর সযত্নে পাতাটাকে ভাঁজ করে ঢুকিয়ে রেখেছিল নিজের বুক পকেটে। টলমল পায়ে ফিরে আসতে আসতে সেদিন অনেক পুরনো কথা মনে পড়েছিল মুকুলের। পটগুলটিশ ওয়ার। হ্যাঁ হ্যাঁ পাঠ্য বইটাতে এমনই একটা মজার খেলার কথা পড়িয়েছিলেন মাস্টার মশাই। বুকপকেটে ভাঁজ করে রাখা এই প্রিয় কবির ছেলেবেলার স্মৃতির সাথে জড়ানো মজার খেলাই তো পটগুলটিশ ওয়ার। পাতি বাংলায় কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি খেলা। কাদার ডেলা গুলোকে আগুনে একটু শক্ত করে পুড়িয়ে বোনের সাথে ছোঁড়াছুঁড়ি করে এই খেলা ছেলেবেলায় তার কাছে ছিল এক নির্মল আনন্দ। অথচ কোথায় গেল সেদিন। মুকুলের মনে পড়ে নিজের অজান্তেই একদিন এই খেলাটাকে হাতিয়ার হিসেবে করে সে বাঁচাতে পেরেছিল বোনের সম্ভ্রম। মা-বাপের মধ্যে সেই রাত্তিরে তুমুল হাতাহাতি। মাতাল বাপটা মাটাকে ঠেলে সরিয়ে বোনের দিকে ক্ষিপ্র গতিতে এগিয়ে আসছিল বারবার। আর বোনটা বিছানায় শুয়ে কাতরে উঠছিল যন্ত্রনায়। রক্তে ভাসছিল তার নিম্নাঙ্গ। ভালো-মন্দ না বুঝেই মুকুল হাতে তুলে নিয়েছিল ঘরের কোণে রাখা শুকনো গোল গোল ঘুঁটের ড্যালা।পটগুলটিশ ওয়ার খেলে খেলে ততদিনে ওর হাতের টিপ আর জোর বেশ ভালো রকম জমে উঠেছে। তাতেই ঘায়েল হয় মাতাল বাপ। সেই রাতে যে ঘর ছাড়লো আর কোনদিন এদিকে পা মাড়ায় নি বাপটা। ঘটনাটার আকস্মিকতা মুকুলকে কিংকর্তব্যবিমূঢ় এক পরিস্থিতির সামনে দাঁড় করায়। বহুদিন এর কোন সঠিক ব্যাখ্যা খুঁজে পায়নি মুকুল। পরে জানতে পারে বাপটা তার জন্মদাতা ছিল না। জন্মদাতা বাপটা অনেক ছোট থেকেই নিখোঁজ।
ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামে আকাশ ভেঙ্গে। মুকুল টাকা কটা পকেটে নিয়ে এক ছুট দেয় বাড়ির দিকে। যত রাতই হোক সে জানে ছোট বোনটা ঠিক না খেয়ে বসে থাকবে দাদার অপেক্ষায়। সকাল সকাল মাকে নিয়ে যেতে হবে ডাক্তারের কাছে। হাত-পা অসাড় শয্যাশায়ী শীর্ণকায় মহিলাটিও তার অর্ধ সচেতনতায় দরজায় তাকিয়ে দেখে বারবার। বর্ষা এলেই ওদের বুকে হাতুড়ি পেটায় এক অজানা আতঙ্ক। আর গোলাপি?না।সে আর যায় না গোলাপীর ঘরে। যেদিন অ্যান্টি পার্টির ছেলে বিমল দারুর বোতল নিয়ে বসেছিল গোলাপির বিছানাটায় আর গোলাপি ওর জন্য পকোড়া ভেজে নিয়ে পাশে গিয়ে বসেছিল, সেদিন আড়াল থেকেই ফিরতি রাস্তা ধরে মুকুল। এরপর একদিন রাস্তায় গোলাপির ছোট ছেলেটাকে ডেকে একটা বই হাতে দিয়েছিল কিনে। বইটার উপরে লেখা ছিল আবোল তাবোল।
ঘন্টায় ঘন্টায় তিস্তার জল বাড়ে। নদী তখন ফুঁসছে। পাহাড়ের দিকে বৃষ্টি হচ্ছে খুব। ব্যারেজ নতুন দুটো লকগেট খুলেছে কিছু আগে। খবরটা পেয়ে আরিফের লম্বাটে চোখের মণি গোলচে হয়ে চকচক করে। মুকুলদের হাতে আরিফ গাঁজার কলকে গুঁজে দেয়। সে জানে ভয়ংকরী তিস্তার সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়াতে গাঁজার কলকের টনিক ওদের সঞ্জীবনী সুধা। ভয়ংকরী তিস্তার সাথে পাল্লা দিতে কলজেতে দম থাকা চাই। বৃষ্টি ও তার বেগ বাড়ায় মুহুর্মুহু। আশেপাশে দৃশ্যমানতা অস্পষ্ট হয়ে ওঠে প্রায়। আরিফের বাঁশির আওয়াজ তীব্রভাবে কানে বাজে যেন বুক চিরে ছুরি নামে রক্তাক্ত শরীরে। মুকুলরা ঝাঁপিয়ে পড়ে জলে। একটা দুইটা তিনটা…. লগের পর লগ ভেসে আসে জলে। ওরা জল থেকে ওঠার সময় পায়না আজ।অ্যান্টি পার্টির ছেলেগুলো ঝাঁপিয়ে প্রায় মাঝে চলে আসে নদীর। মুকুলরা কোণঠাসা হয়ে নদীর কিনারে সরে আসে। বিমলকে দেখে দাঁতে দাঁত চাপে মুকুল। নিতাই গলার রগ ফুলিয়ে বলে ‘নেহি ছোড়েঙ্গে।’ পারের দিকে হাত বাড়িয়ে মুকুল খুঁজে পায় কিছু নুড়ি পাথর। ঘন ঘন দৃশ্যপট বদলায় ওর চোখের সামনে।ঝাপসা হয়ে আসা চোখের জলে মুকুল দেখে অসংখ্য নোট হাওয়ায় উড়িয়ে আরিফ দাঁড়িয়ে খিলখিলিয়ে হাসছে। উড়ন্ত নোটগুলোর দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে শয্যাশায়ী এক অভাগিনী। নোটগুলোকে লুফে নেওয়ার চেষ্টায় ছোট দুটো ছেলেমেয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে নোটের উপর। আন্টি পার্টির বিমল আর সৎ বাপটা সব টাকা ছিনিয়ে নেয় ওদের হাত থেকে। ছেলেমেয়ে দুটি হাতে তুলে নেয় কাদার ড্যালা। পোড়ানো কাদার ড্যালা গুলো ছুঁড়ে ছুঁড়ে মারে বাপের দিকে। মুকুল ও সর্বশক্তি সঞ্চয় করে নদীর পাড় থেকে নুড়ি তুলে নেয় হাতে। কিছুতেই আজ লগ হাতছাড়া করবে না সে। কাল যে করেই হোক মায়ের ওষুধ সে কিনবেই। অ্যান্টি পার্টির ছেলেগুলো ভেসে যাওয়া বড়ো লগটাকে চেপে ধরে। মুকুলরা শুধু করে পটগুলটিস ওয়ার। নুড়ি ছুঁড়ে ছুঁড়ে ঘায়েল করে সবকটাকে। লগ টেনে টেনে যুদ্ধজয়ের শেষে ভোরের দিকে কিছুটা অবসন্ন হয় শরীর। আরিফ এসে সামনে দাঁড়ায় ওদের। কচকচে নোটগুলো ধরিয়ে দেয় হাতে। বৃষ্টি ধরে আসে। অবসন্ন শরীরে হাঁটতে হাঁটতে বাড়ি ফেরে ওরা। খসখস শব্দে পিছন ফিরে তাকায় মুকুল। তখন অসংখ্য হাসজারু, বকচ্ছপ আর হুকোমুখো হ্যাংলা ওর পিছু ধরে চলেছে।