ক্যাফে গদ্যে দীপান্বিতা বিশ্বাস

আলোর উৎস

বৃষ্টি শেষ হতেই আকাশ জুড়ে জ্যোৎস্না চাদর বিছিয়েছে, দু’একটা শেয়াল মাঝে মধ্যে ডেকে উঠছে। ঝিঁঝিঝিঁঝি পোকার ডাকও দূর থেকে ভেসে আসছে, তবে ব্যাঙের ডাক কিন্তু শোনা যাচ্ছেনা। বৃষ্টি হলো কিন্তু ব্যাঙ ডাকছে না, এ প্রশ্ন মাথায় আসতেই হুমায়ূন আহমেদের ব্যাঙ না ডাকার বিশ্লেশণটি মনে পড়ে গেল। উনি তার উপন্যাস “নীল অপরাজিতায়” পুষ্প কে বলেছেন “আকাশে মেঘ হলে কিংবা মেঘ হবার সম্ভাবনা থাকলেই ব্যাঙ ডাকে, চাঁদের আলো থাকা মানে মেঘ নেই কাজেই ওরা চুপ করেই ছিল”। ভেবেই একবার নিজে নিজে হেসে নিলাম, সারাদিন বই পড়ে পড়ে আমার মাথায় শুধু এ উপন্যাস সে উপন্যাস ঘোরাঘুরি করছে।
আমি একটা নতুন উপন্যাস লেখা শুরু করেছি, তার জন্য পড়া, প্লট সাজানো এদিকে লেখাও শুরু করে দিয়েছি খানিক। কদিন এসব নিয়ে থাকতে থাকতে ক্লান্ত লাগছে। দুদিন ছুটি নেওয়া দরকার তাই এখানে এসেছি। পাড়াগাঁ বলা চলে, আমার মামাবাড়ি। গ্রামটির নাম শিকড়ে, জানিনা এমন নাম কেন! অদ্ভুত একটা নাম হয়তো কোন শিকড় থেকেই এই নামের সৃষ্টি।
তবে এখানে এসেও নিস্তার নেই, কাজ কর্ম তো কিছুই নেই তাই এখানেও সারাক্ষণ বই নিয়ে বসে। বাড়ি পুরো ফাঁকা দিদা আর এক কাজের মেয়ে। দাদু গত দূর্গা পুজোর দিন কুঁড়ি আগেই গত হয়েছেন। এদিকে সন্ধ্যা হলেই রাতের খাবার শেষ করেই সবাই ঘুমিয়ে পড়ে, আমিও সবার সঙ্গে সেই সাড়ে সাতটার সময় ডিনার সেরে নিয়েছি এখন সাড়ে নটা বাজে।
বৃষ্টি শেষের পরে যে মিষ্টি হাওয়া বয় ওটা আমার ভীষণ ভালোলাগে, আমাদের কলকাতায় সেসব বালাই নেই। তাই বারান্দায় এসে চেয়ারটা নিয়ে বসেছি, কিছুক্ষণ আগে “হলুদ বসন্ত” পড়ছিলাম যদিও এটা আমার আগে পড়া তবু কেন জানিনা আমার বড্ডো পছন্দের একটা উপন্যাস এটা। অনেকের স্বভাব থাকে পছন্দের সিনেমা বারবার দেখা, আমি আবার পছন্দের বই বারবার পড়তে ভালোবাসি।
মনটা কেমন যেন রোমান্টিক রোমান্টিক হয়ে উঠলো, চাঁদের আলো এসে আমার শরীরে রুপোলি রং ছড়িয়ে গেল খানিক। আমার প্রকাশিতব্য উপন্যাস “দুই তীরের মাঝে” তে দুটো লাইন লিখেছিলাম “ছেলেটির হাতের মাঝে মেয়েটিকে কি স্নিগ্ধ দেখাচ্ছে! যেন মেঘলা দিনের সাদা মেঘ বালিকা; পুরো বর্ষার নির্যাসটুকু কেড়ে নিজের করে নিয়েছে। হয়তো এমন বৃষ্টি দিনে পুরুষ মানুষের শরীর কাছে থাকলে মেয়েদের একটু স্নিগ্ধই লাগে।”
চারিধারে সব কেমন শান্ত হয়ে এলো।
হঠাৎ আমার হাতের উপর একটা ঠান্ডা স্পর্শ পেয়ে একটু কেঁপেই উঠলাম। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে চারিদিক ভালো করে দেখলাম কই না কেউ কোথাও নেই তবে কিসের স্পর্শ!
মনের ভুল হবে হয়তো, বাইরের ঠান্ডা হাওয়াই এসে লেগেছে।
ফোনে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গান চালালাম “ঘুম ঘুম চাঁদ ঝিকিমিকি তারা এই মাধবী রাত”, আহা গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের এই গানের কবিতাটি আমার অদ্ভুদ ভালোলাগে।
কবিতার কথা মাথায় আসতে মাথার পোকা আমার নড়ে উঠলো, তাইতো আমি অনেকদিন হলো কোনো কবিতা লিখিনি।
কেমন যেন মনে হলো এই ওয়াদারে একটা যদি কবিতাই না লিখি নাহলে এ জীবনই বৃথা। কবিতা বলতেই আমার আগে প্রেম মনে আসে, আসলে প্রেমের মধ্যেই লুকিয়ে আছে আমাদের যাবতীয় সুখ। আমার সামনে দুটো দিক ছিল এক “অন্ধকার” অর্থাৎ কালো আর কালো; দুই “রুপোলি আলোর বাতাস” অর্থাৎ প্রেমের মাধুর্য। অন্ধকার নিয়ে লিখতে ইচ্ছে করলোনা যদিও আমাদের সমাজ অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়ে আছে। আমার মতে সব অন্ধকারের আলোর উৎস একমাত্র “প্রেম”, প্রেম অর্থে ভালোবাসা, মানবিকতা বলতে চেয়েছি।
বাইরের সিঁড়িতে কুকুর ডেকে উঠলো আবার, মনে হলো ওই দূরের মাঠে কোথাও আবার শেয়াল ডাকছে। এখানে আবার শেয়ালের ডাক শুনতে পেলেই কুকুর গুলো ডেকে ওঠে। মামাবাড়িতে দুই কপোত কপোতি থাকে সারারাত উঠোনে শুয়ে বাড়ি পাহারা দেয়, আজ অবশ্য সিঁড়ির উপর এসে গুটিসুটি মেরে শুয়েছিল, হঠাৎ তাদের ডাকে ভাবনা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কেঁপে উঠলাম যেন।
গান বন্ধ হয়ে গেছে, কিন্তু গানতো বন্ধ হবার কথা নয়! আমিই কি তাহলে অবচেতনে গানটা বন্ধ করে দিলাম। ঘাড়ের কাছে ঠান্ডা নিঃশ্বাস! শিরদাঁড়া বেয়ে ঠান্ডা স্রোত যেন নেমে গেল। পেছন দিকে তাকানোর সাহস হলোনা আমার।
মনে হলো কেউ যেন আমার মনের কথা বুঝতে পেরে এখানে এসেছে। না আমার ভয় করছিলনা একদমই। এক অদ্ভুদ ভালোলাগা কাজ করছিল। আসলে বাস্তব জীবনে আমাদের সব থেকেও আমরা কোথাও একটা খুব একা। আমাদের কাউকে চাই যাকে কেউ দেখতে পারবে না কেউ অনুভব করতে পারবে না শুধু আমরা একাই অনুভব করতে পারবো কিন্তু ছুঁতে পারবোনা। একটা বীভৎস রহস্য কাজ করবে তার মধ্যে। আমার ক্ষেত্রেও সেটাই হয়েছে, আমি বুঝতে পারছি অদৃশ্য কিছু আমার ঘাড়ের কাছে এসে আমার চুলের গন্ধ নিচ্ছে আর ঘনঘন নিঃশ্বাস ফেলছে ঘাড়ের কাছে। আমি জানিনা সে কে, কি চায় কেন এসেছে তবে আমার ভালোলাগছে। বাড়ির ডান দিকের জমিটা রাজনীগন্ধার রাতের দিকটা এমনিও রোজ গন্ধ ভেসে আসে। আজ এই মৃদু হাওয়ায় গন্ধটা যেন আরো মিষ্টি লাগছে।
ওই অদৃশ্য মানুষটি আমার পাশে এসে দাঁড়ালো, আমি পুরো অনুভব করতে পারছি।
ফোনটা নিয়ে লক খুললাম, নোড প্যাড খুললাম একটা কবিতা লিখবো বলে। মনে হলো কেউ ঝুঁকে এসে আমার ফোনের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আমি কিছুতেই তার দিকে তাকাতে পারছিনা না ভয়ে নয়, তাকালে যদি সে পালিয়ে যায়। কবিতা লিখতে শুরু করলাম-
যদি কোনোদিন দেখা পাই তবে আমার চোখের সব আলো,
তোমার অন্ধকার রাজ্যের সব ক্ষমতা কেড়ে নেবে।
লোভী সমাজের বেড়াজালে আটকে নিজের জন্য যেটুকু সময় খুঁজি,
সেটুকুও তোমার বুক পকেটে রাখা ছোট সংসারের ভোরের হাতে তুলে দেব।
পাওয়া না পাওয়া সে তো পরের কথা,
ঈশ্বরের গর্ভে যখন জন্ম নিয়েছি তখন সবটা আমারই হাতে।
আমার মাকে আমি ঈশ্বর বলে ডাকি, কারন আমার সৃষ্টি তার গর্ভে।
আমি তোমাকেও ঈশ্বর বলে ডাকলাম।
আমার এ কবিতা তোমার জন্য সৃষ্টি,
আমার কাছে সব সৃষ্টিকত্তার মধ্যেই এক অন্য ভগবান বাস করে।
এ আমি কি লিখলাম! একজনকে না দেখে শুধুমাত্র অস্তিত্ব অনুভব করে তাকে ঈশ্বর বানিয়ে দিলাম! সেই শীতল হাত আবার আমার হাতে হাত রাখলো, আমি এবারও তার দিকে তাকাতে পারলাম না। আমাকে নিয়ে উঠে দাঁড়ালো সে, বারান্দা পেরিয়ে উঠোনে এলাম আমরা, কুকুর দুটো চুপচাপ ঘুমাচ্ছে এখন। বাইরে সোঁদা মাটির গন্ধ আর ঠান্ডা বাতাস, আমার চুল গুলো হাওয়ায় উড়ছে। নির্ভীক একটা ঠান্ডা হাত ধরে আমি হেঁটে চলেছি উঠোন পেরিয়ে মাঠ, চারিদিকে এবার শুধু মাঠ আর মাঠ। আমরা হেঁটেই চলছি এ রাস্তা মনে হয় আর শেষ হবেনা। অন্তত কাল ধরে আমরা হেঁটে যাব, মাঠের মাঝে নক্ষত্ররা ছোটাছুটি করছে। আলো আর আলো, একটুও অন্ধকার নেই, আলো ভিতর দিয়ে আমরা হেঁটে চলেছি।
বুল্টি ওঠ বেলা হয়েছে, দিদা এসে ডাক দিতেই আমি ধরফড় করে উঠে বসলাম। ফোনে টাইম দেখলাম আটটার একটু বেশি বাজে তাহলে কি স্বপ্ন ছিল সব! আমি তো বিছানাতেই শুয়ে আছি। না কাল রাতে যা যা হয়েছে কিছুতেই তা স্বপ্ন হতে পারেনা, যা ঘটেছে সব সত্যি। কিন্তু যদি সত্যিই হবে তাহলে আমি ঘরে এলাম কখন! আর বিছানায় বা কি করে এলাম? না আমার সব যেন গুলিয়ে যাচ্ছে। মাকে একটা ফোন করি বরং, ফোনের লকটা খুলতেই নোড প্যাড খুলে গেল। তাতে কিছু অদ্ভুত কথা লেখা আছে, কিন্তু আমি এমন কখন লিখলাম! কিছুই মনে পড়লোনা, তবে লেখাটা পড়ে আমি যা বোঝার বুঝে গেলাম। এবার বেশ শান্তি হচ্ছে, লেখাটা এমন–
ঈশ্বর তোমার বুকের বাম দিকে থাকে, ডান দিকেও থাকতে পারে কিংবা শরীরের প্রতিটা অঙ্গে।
তুমি নিজেকে একা ভাবছো! জেন, তোমার প্রতিটা নিঃশ্বাস তোমার সঙ্গে আছে।
যেদিন তোমার নিঃশ্বাস নিঃস্ব হবে সেদিন তুমি একা হবে।
জীবিত অবস্থায় কেউ একা নয়, একা হতে পারেনা
শুধু নিজের অস্তিত্বকে খুঁজে নিতে হবে; খুঁজে পেলেই দেখবে তোমার ভিতর হাজার ঈশ্বরের বাস।
আলো দিয়ে অন্ধকার মেটানো যায়না বরং অন্ধকার থেকে আলো খুঁজে বের করো। আলো নিভে গেলে সেই অন্ধকারই হয়, তাই যত পারো অন্ধকার মাখো দেখবে এই অন্ধকারই তোমাকে আলোর পথে নিয়ে যাবে। সব আলোর উৎস অন্ধকারই।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।