।। ত্রিতাপহারিণী ২০২০।। T3 শারদ সংখ্যায় চন্দ্রানী মিত্র

হলুদ গোলাপ

অর্ডার , অর্ডার , অর্ডার
ফাঁকা কোর্ট রুমে হাতুড়ির আওয়াজটা কানে বড্ড জোরে এসে লাগে রতনের। রোজ এ সময়ে ঝাড় পৌঁছ করে দরজা তালা লাগানোর কাজ তার। ধুতির খুঁটোয় চোখ পৌঁছা ও অভ্যেসে দাঁড়িয়ে গেছে। একটা একটা করে বেঞ্চি মুছতে মুছতে একেবারে সামনে পৌঁছে যায় সে।
দময়ন্তী চুপ করে মাথা নামিয়ে বসে আছে এখন। চারদিকে ফাইল আর কাগজপত্র ছড়ানো। ওর হাতেও একটা হলুদ রঙের কাগজ।কেমন যেন ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। অস্ত ব্যস্ত চুলের বোঝা ওর মুখটাকে ঢেকে রেখেছে।
দময়ন্তী সেন চৌধুরী .. একডাকে এই কোর্ট চত্তরে সব্বাই চিনতো তাকে। সাদা গাড়িটা এসে থামতো রোজ সকালে ঠিক এগারোটায় , কে জানে কেন কালো কোটের ভেতর থেকে দুধ সাদা শাড়ী চোখে পড়তো সবার। সাদা রং বড় পছন্দের ছিল তার। মাথার এক ঢাল চুল খোঁপায় সুন্দর করে বাঁধা থাকতো।বড় বড় চোখের সবটাই চশমায় যদিও ঢাকা থাকতো তবু জানে রতন খুব কম লোকেরই সাহস হয়েছে কোনদিন তার চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলার।
দুঁদে জজ সাহিবাকে সবাই সম্ভ্রম করেই কথা বলতো !
দময়ন্তী , দময়ন্তী ! দাদুর ডাকে সিঁড়ি লাফিয়ে লাফিয়ে উঠছে এখন ছাদে , মা বলে কোনদিন যদি হোঁচট খেয়ে পড়িস আমাকে কিন্তু ডাকবি না একবারও। এত গেছো মেয়ে কেউ দেখেছে বলে আমার মনে হয় না। একটু ধীরে সুস্থে যা না বাবা। পড়ে গিয়ে দাঁত মুখ ভাঙলে কি হবে ভেবেছিস। ওই তোর বাবা আর দাদুর প্রশ্রয়ে দিন দিন তোর এই অবস্থা সে আমি বেশ বুঝতে পারছি।
শেষ সিঁড়ির কাছে এখন দময়ন্তী , দাদুর দেওয়া নাম। আর দাদুই শুধু ওই এত বড় নাম ধরে ডাকে। মা আর বাবার কাছে সে শুধু দামিনী , যদিও মা আরেকটু জুড়ে দস্যি দামিনী বলেই ডাকে। কিন্তু দাদু রাগ করে।
–কেন বৌমা দামিনী বলো ঠিক আছে , এই এত ভালো মেয়েটার নামটার আগে ওই দস্যি না জুড়লে চলে না তোমাদের।
দামিনী তখন লনের ধারে ধারে লাগানো ফুল গাছের ফুল একটা দুটো তুলে তুলে নিজের সাজি ভরে তুলছে। একটু দেবে ওই পিসী দিদাকে বাদবাকি সব স্কুলের ব্যাগে ঢুকবে।
গন্ধরাজ ফুল অবনীকে , একরাশ সাদা টগর একটা ছোট্ট কাগজে মুড়ে দিশাকে , নীল অপরাজিতা তাপসীকে আর সব শেষে একটা হলুদ গোলাপ , নাঃ তুলতে তুলতেই মুখে একটু একটু হাসি দেখতে পাচ্ছে মা ওপরের জানলা থেকে। জিজ্ঞেস করেছে কতবার
— এ ফুল কার জন্য দামিনী !
দামিনী কিছু না বলে একটু হেসে ব্যাগে রাখতে রাখতে বলেছে শুধু “বলবো মা এখন সময় নেই!”
ঠাম্মি মাকেই উল্টে ধমক দিয়েছে “বৌমা মেয়েটা স্কুল যাবার সময়ে তোমার যত রাজ্যের প্রশ্ন , আরে একটা ফুল তো শুধু , দিক গে যাকে ইচ্ছে!”
স্কুলের বার্ষিক উৎসবে গিয়ে মা জেনেছে সে ফুল কার কাছে রোজ যায় , তখন দামিনী ক্লাস নাইন। সেই এক ভাবেই রোজ ফুল নিয়ে যায়। অন্য ফুল কোনদিন বাড়ে কোনদিন কমে কিন্তু গোলাপ রোজ যায়।
এই মিশনারি স্কুলে দেবার তোড়জোড় সবটাই দাদুর ইচ্ছে ছিল। বাবা চেয়েছিল বাংলা মিডিয়াম স্কুলে ভর্তি করতে। দাদু তিনদিন কথা বলেনি নিজের ছেলের সাথে।চারদিনের দিন ডেকে পাঠিয়েছিলেন ছেলেকে নিজের ঘরে। বললেন “সে যা চায় তাই যেন করে। কিন্তু ততদিনে এদিকে বাবা আর মায়ের মাঝে বেশ কথা কাটাকাটি হয়েছে আর এতটা জানে দময়ন্তী যে মা বারবার বলেছে “বাবা তো ভালোই চান তোমার মেয়ের , তা তার কথা অগ্রাহ্য না করে একবার ভেবে দেখলে তো পারতে !”
তাই বাবা যখন দাদুর ডাকে ঢুকলো সে ঘরে তখন একই কথা দুজনে একসাথে বলে উঠলো।
“যা তুমি চাও তাই করতে পারো , আমি বাধা দেবো না” আর চোখ চাওয়া চাওয়ি করে হেসে উঠলো দুজনেই। তারপরের ঘটনা খুব সোজা সরল ভাবেই ঘটে গেলো।
হঠাৎ বাবা আর ছেলে মিলে একসাথে বসে ঘন্টার পর ঘন্টা আলোচনা করতে লাগলো , যে কোন মিশনারি স্কুল ভালো হবে দময়ন্তীর জন্য।
শেষে বাবার কথা মেনেই জর্জ ফাউন্ডেশনে ভর্তি করানো হলো।
লেখাপড়ার সাথে সাথে জুডো ক্যারাটে , ঘোড়ায় চড়া সবই শিখতে শিখতে দিন কাটছিল নিজের গতিতে। এলো বার্ষিক অনুষ্ঠান আর সে দিনেই মা বাবা আর দাদু ঠাম্মি স্কুলে গেলো দময়ন্তীর অনুষ্ঠান দেখতে। অপূর্ব সব অনুষ্ঠানের মাঝেই দৌড়ে আকাশ এসে নিজের পরিচয় দিয়ে গেলো আরো দু চার জনের সাথে। সবাই দেখলো কি না কে জানে কিন্তু মা দেখলো একটা সুন্দর হলুদ গোলাপ আকাশের হাতে ধরা। এক নিমেষে বুঝে গেলো রোজ রোজ ওই বাড়ির হলুদ গোলাপ কার কাছে গেছে। বুঝে গেলো মা , দময়ন্তী নিজের প্রথম ভালোবাসা এই ছেলেটাকে দিয়ে ফেলেছে। অনুষ্ঠান আর তেমন করে দেখা হলো না ওর মার।
সেরাতে সব কাজ মিটিয়ে ঘুমন্ত মেয়ের পাশে শুয়ে ওর কপালে হাত বুলোতে বুলোতে প্রশ্ন করলেন “তুই কি ভালোবাসিস আকাশকে !” ঘুমন্ত দময়ন্তী জড়িয়ে নিলো নিজের মাকে। যা বোঝার মা তো আগেই বুঝেছিল তবু শেষ প্রশ্ন এখনও বাকি ছিল। প্রশ্ন করলেন “ও তোকে ভালোবাসে !” কোন উত্তর এবারেও পেলেন না তিনি , কি জানি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে শুধু ওকে বুকে জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন।
কাটলো দিন মাস বছর আর দময়ন্তী দাদুর দেখানো পথেই চলতে শুরু করলো। একটু একটু করে আইনের পড়া শেষ করে যেদিন কোর্ট চত্তরে প্রথম পা রাখলো কি জানি কেন একটু একটু ভয় লাগলো তার। এত লোক এত ভিড় কোনদিন দেখেনি সে। চারিদিকে কালো কোট পরা মানুষের ভিড়।
দাদুর বলা একটা কথা মনে পড়লো শুধু , তোমার আত্মগরিমা তোমার পরিচয় হয় যেন। একটু একটু করে নিজেকে ওই পরিবেশে মানাতে মানাতে অনেক কিছু শিখেও নিলো সে খুব কম সময়ের মধ্যে।
আকাশের সাথে আজকাল আর দেখা সাক্ষাৎ হয় না তেমন করে। সে নিজের বাবার ব্যবসায় ব্যস্ত হবার সাথে সাথেই কবে যেন একটু একটু করে দময়ন্তীর এই ব্যস্ত জীবন থেকে সরে গেছে।
এবার সামনে আরো বড় পরীক্ষা। ডব্লিউ বি জে এস পরীক্ষায় বসার জন্য দিন রাত এক করে নিজেকে তৈরী করলো দময়ন্তী। পরীক্ষা দেবার কিছু দিন আগেই হঠাৎ দাদু অসুস্থ হয়ে পড়লো।মন খারাপ করে বসে থাকতো কোর্ট থেকে ফিরে রোজ দাদুর কাছে। একদিন ওর হাত নিজের হাতে নিয়ে দাদু অদ্ভুত এক বায়না করলো।
“আমাকে কথা দে ,যেদিন জজ হয়ে ওই কোর্টে পা রাখবি সেদিন ওই কোর্টের মাটি ছুঁয়ে একটা প্রতিজ্ঞা করবি , কোনদিন কোন নিরপরাধকে শাস্তি দিবিনা।”
দময়ন্তী অবাক হয় নি একটুও কারণ জানতো যে কোর্টে একবার এমন ঘটনা ঘটেছিল যে দাদুর জীবনে যে পরদিন থেকে প্র্যাক্টিস করা ছেড়ে দিয়েছিলেন তিনি। সে গল্প অনেকবার শুনেছে দাদূর কাছে আর লক্ষ্য করেছে বলতে বলতে দাদুর চোখে কেমন যেন আগুন জ্বলে উঠতো প্রতিবার। তবু দাদুর হাতে হাত রেখে প্রতিজ্ঞা করলো মেয়েটা “আমি চেষ্টা করবো দাদু”
প্রথম মামলার শুনানি যেদিন ছিল সেদিনটার কথা কোনদিন ভুলতে পারবেনা সে। এক বৃদ্ধ বাবা মা যাকে ছেলে আর বউ মিলে বাড়ির বাইরে করে দিয়েছে।দু পক্ষের কথাই শুনলো সে। শুনলো দু তরফের উকিলের কথাও।
একে তো শুরুতেই ওই অন্য পক্ষের মা আর বাবা এসে প্রায় পা ধরে নেওয়ার জোগাড়, বহুকষ্টে তাদের বোঝালো যা হবে তা ন্যায় হবে অন্যায় হতে দেবে না সে।
চললো মামলার শুনানি একদিন দুদিন আর কয়েক মাস।
আর তারপর একদিন মামলার রায় দেবার দিন এগিয়ে এলো। অদ্ভুত ছিল যদিও মামলাটা তবু ঠিক রায় দেবার চারদিন আগে সোজা বাড়িতে এসে পৌঁছলো সেই বাবা মা। কে জানে কোথা থেকে ঠিকানা জোগাড় করে এসেছিল তারা। কোনরকম ভনিতা না করেই দুজনেই আবার মাটিতে বসে পড়ে বলে উঠলো একসাথে “এ মামলায় জিততে চায় না তারা। এ বাড়ি ছেলের নামে করে কোন বৃদ্ধাশ্রমে চলে যেতে চায় তারা। আর সে ব্যবস্থা দময়ন্তীকেই করে দিতে হবে।
সে এক অদ্ভূত অবস্থা। কিছুতেই বোঝাতে না পেরে দময়ন্তী দুদিন সময় চেয়ে ড্রাইভার দিয়ে তাদের বাড়ি পাঠাবার। চলে গেলো তারা কাঁদতে কাঁদতে আর পাঁচদিন পরে সে মামলা নিজের হাতেই বন্ধ করে দিলো দময়ন্তী সেই বৃদ্ধ বৃদ্ধার সই নিয়ে। কিন্তু হ্যাঁ বৃদ্ধাশ্রমে আর যেতে হলো না তাদের , কি করে যেন ভোল বদলে গেলো তাদের জীবনের । লজ্জিত ছেলে বৌ ক্ষমা টমা চেয়ে তাদের বাড়িতেই রেখে দিয়েছিল।
চলছিল দিন এমন ভাবেই , এর মাঝে আকাশের সাথে আর যোগাযোগ ছিল না তার। তবু একদিন কার কাছ থেকে যেন খবর পেলো আকাশের বিয়ে। অবাক হলো না দময়ন্তী একটুও , জীবনকে আস্তে আস্তে চিনতে পারছে সেও এখন।
বাড়ি ফিরে চুপ করে অনেকক্ষণ বসে ছিল সেদিন নিজের ঘরে। দাদু ঠাম্মি বেশ কিছু বছর ধরে আর হাঁটা চলা করতে পারে না সেভাবে। ঘরেই বন্দী থাকেন তারা। তবু সেদিন হঠাৎ দাদুর কাছে গিয়ে বসলো দময়ন্তী অনেক রাতে গিয়ে। দাদু নিজের সেই ছোট্ট দময়ন্তীকে চিনতেন ভালো করে। সেই ছোট থেকেই মন খারাপের সময় মেয়েটা শুধু তার কাছেই আসে তাও জানতেন ভালো করে। কিছু বললেন না। শুধু বললেন “শান্ত হয়ে যাও , যেটা হবার সেটাই তো হয় , এত উতলা হওয়া তোমায় মানায় না দময়ন্তী !”
চুপচাপ নিজের ঘরে ফিরে এলো সে। দক্ষিণের জানলার কাছে এসে দাঁড়ালো কিছুক্ষণ। কি জানি কি মনে হলো , অনেক দিন পরে ওই অত রাতে গান গাইলো সে। গানের আওয়াজ ঘরের দেওয়াল ভেদ করে দাদু ঠাম্মি আর ঘুমন্ত বাবা মায়ের কানের কাছে এসে পৌঁছলো। বুঝলো সবাই অস্থির আজ সে।
ভোরের আলো ফোটার পরে মা এসে দেখলো তানপুরা বুকে জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে সে মাটিতেই। লম্বা চুল এদিক ওদিক উড়ে তার মুখ ঢেকে রেখেছে। চোখের পাতায় জলের বিন্দু তখনও একটু লেগে আছে।
সে দময়ন্তী বদলে গেলো তারপর একটু একটু করে। কেমন যেন পাথরের মত হয়ে গেলো সে।হাসি যে কোথায় হারালো তার হদিস কেউ জানলো না। এখন দময়ন্তীর জীবনে শুধু কাজ , কাজ আর কাজ।
সেদিনটাও একটু একটু বৃষ্টি হচ্ছিলো সকাল থেকে। আজ আর বেরোবার ইচ্ছে ছিল না তার তেমন। কিন্তু আসিস্টেন্ট এর ফোন এলো , একবার কিছুক্ষণের জন্য হলেও আসতেই হবে। খুব নাকি দরকার। বাড়িতে কোর্টের কোনরকম কথা বলতো না সে। তাই অগত্যা যেতেই হলো।
শুনলো চারপাঁচ জন এসে বসে আছে তার সঙ্গে দেখা করার জন্য। নিজের চেম্বারে বসার একটু পরেই দেখলো দরজা খুলে আকাশ আর তার সাথে কয়েকজন ঢুকছে। মিথ্যে মামলায় ফাঁসিয়েছে আকাশকে তার ব্যবসায় কোন ক্লায়েন্ট, তেমনটাই বললো তারা। অনেকদিন ধরে অনেকের কাছে গেছে সে কিন্তু কোন সুরাহা হয় নি তাই শেষ কারো কাছে দময়ন্তীর কথা শুনে এসেছে তারা। একবারও চোখ না সরিয়ে সবটা শুনলো সে। আর তার ক্লায়েন্টের নাম , ঠিকানা সমস্ত নিয়ে হাত জোড় করে তাদের এবার আসতে বললো সে।
নিজেই ডেকে পাঠালো তাদের অফিসে আর সব শুনে বুঝলো আকাশ সত্যিই দোষী কিন্তু সে একা দোষী নয়। সমান ভাবে দোষী তার বৌও যে এই ব্যবসায় তার পার্টনার।
দিনের পর দিন শুনানি চললো আর সবশেষে হেরে গেল আকাশ , কোটি টাকার জরিমানা অন্যথায় ও আর ওর বৌয়ের আরো অনেক কিছু খারাপ হবার সম্ভাবনা সবটাই পড়ে শোনালো দময়ন্তী।
রায় বেরোবার একটু পরেই মাথায় হাত দিয়ে বসে ছিল দুজনেই ওই কোর্ট ঘরের বেঞ্চে। যেতে যেতে একবারও ফিরে তাকালো না দময়ন্তী। নিজের অফিস ঘরে এসে টেবিলে রাখা জলের গ্লাস তুলে ঢক ঢক করে জল খেয়ে ডেকে পাঠালো ড্রাইভারকে। বাড়ি ফিরতেই হবে এবার তাকে। আকাশ নিরপরাধ নয় তবু কি জানি কেন এই বিচারের সাথে ওর মন ওকে কাঠগড়ায় দাঁড় করালো। টেবিলে মাথা ঝুঁকিয়ে যে বসে রইলো সে দুঁদে জজ সাহিবা নন। একটা ছোট্ট মেয়ে সবার আড়ালে একটা হলুদ গোলাপ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কাউকে দেবে বলে ..
স্কুলে ছুটির শেষে চুপ করে গেটের কাছে দাঁড়িয়ে আছে সে , দামিনী ! দামিনী হরিকাকা নিতে এসেছে ওকে। কিন্তু আজ যে আকাশের সাথে দেখা হয়নি ওর। দেওয়া হয়নি হলুদ গোলাপ।
“ও হরিকাকা ! একটু দাঁড়াবে , একটা কাজ যে বাকি আছে আমার!”
হরি কাকা অসহিষ্ণু হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে আর হঠাৎ চোখে পড়লো তার দামিনী দৌড়ে গিয়ে কাউকে একটা কিছু দিলো। আর লাল মুখ নিয়ে আসছে দৌড়োতে দৌড়োতে গাড়ির কাছে।
একঝলক কুসুমের মুখটা মনে পড়ে গেলো হরি কাকার। গ্রামে সেই ক্ষেতের থেকে সদ্য তোলা লাল গোলাপের জন্য দাঁড়িয়ে থাকতো মেয়েটা পুকুর পাড়ে। হরি কাকা তখন কতই বা বয়েস এই সতেরো বা আঠেরো হবে। আর কুসুম হয়তো পনেরো। কোঁকড়া চুল ওর কপালে পড়ে থাকতো সবসময়। সারাদিন কাজ করতো মেয়েটা , জানতো হরি ওর বাবা মা কেউ নেই। দূরসম্পর্কের এক কাকা কাকীর কাছে থাকে।গ্রামের পাঠশালাতে যেতো শুরুতে তারপর সব ছাড়িয়ে ওই সারাদিন পুকুর পাড়ে বসে বাসন মাজতো আর কাপড় কাচতো।
শুধু শেষ গোধূলির আলো যখন জল ছুঁয়ে ছুঁয়ে ওর কপাল আর গাল ছুঁয়ে নেমে আসতো পুকুরের জলে ঠিক সেই সময়ে লাল গোলাপের আভা ওকে আরো সুন্দর করে তুলতো। কিন্তু সে আর ক’দিন।
হরিও তো তারপর শহরে এই কাজ পেয়ে কাউকে কিছু না বলেই চলে এসেছিল একদিন।ফিরেছিল বেশ কিছু মাস পরে। এসেছিল নিয়ে যেতে নিজের মা’কে। কিন্তু হয় নি সে ইচ্ছে পুরো তার। দাদা বৌদি দুজনেই এক কথা বলেছিল। মা নাকি ও যাবার পরেই কেমন আনমনে বসে থাকতো সারাদিন বাড়ির বাইরে ওই বট গাছটার নিচে। গ্রামের দুজন একজন করে পাশে এসে বসতো। মা ওদের সাথে ওই হরির কথাই বলতো। শেষে একদিন খুব ঝড়ে ওই গাছের ডাল এসে পড়ে মাথায়। চেষ্টা করেছিল গ্রামের সবাই তাকে বাঁচাবার কিন্তু ওই হরির নাম নিতে নিতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিল ওর মা। শুনেছিল দুই ছেলে মেয়ের বাবার সাথে কুসুমের বিয়ে দিয়ে ওর মামা মামী এখন বেশ নিশ্চিন্তে আছেন।
আর যাওয়া হয়নি হরির গ্রামে আর যাবেই বা কার জন্য।শুধু দুচার বার কেউ কিছু না বলাতেও টাকা পাঠিয়েছে। ধীরে ধীরে সব সম্পর্ক চুকে বুকে গেছে।
হঠাৎ গাড়ির আওয়াজে আবার চমকে ফিরে এলো হরি কাকা ওই কোর্ট চত্তরে। একটা সাদা গাড়ি এসে থামলো গা ঘেঁষে একেবারে। ইন্দ্রনীল নামলো গাড়ি থেকে। আর কিছু বলার আগেই দেখলো দামিনী দাঁড়িয়ে আছে ঠিক তার সামনে। কিন্তু মাথা একেবারে নিচু । পুরো মুখে কেউ যেন ছাই ঢেলে দিয়েছে।
ওর হাত নিজের হাতে নিয়ে নিলো ইন্দ্র আর হরি কাকাকে বললো “কাকা তুমি বাড়ি যাও , আমি পৌঁছে দেবো তোমার দামিনী দিদিমণিকে একটু পরেই “
দামিনী হাত ধরে চুপচাপ শান্ত হয়ে গিয়ে বসলো সামনের সীটে। হরি কাকা নিশ্চিন্দে বাড়ির পথ ধরলো। ইন্দ্র মনোরোগ বিশেষজ্ঞ। আজ কিছু মাস ধরে ওর চিকিৎসা চলছে। জানে সবাই ও ভালোবাসে দামিনীকে। কিন্তু দময়ন্তী এসব এখনো বোঝে না। ওর মনের চিলেকোঠা শুধু আকাশকে ছুঁতে চায় .. সে আকাশ আর ওর নেই সে এখন অন্যের। তবু এত বছর পরে সামনে এসে আবার সব গুলিয়ে ফেলেছে সেই স্কুলে যাওয়া মেয়েটা .. ফাঁক পেলেই মাঝে মাঝে হলুদ গোলাপ নিয়ে স্কুলের গেটে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে আর যেদিন আবার মেয়েবেলা পেরিয়ে বড় হয়ে যায় সেদিন কালো কোট পরে গাড়ি চালিয়ে কোর্টরুমে এসে বসে। ফাঁকা কোর্ট রুমে বাদ প্রতিবাদ চলে। বেলা শেষে হরিকাকা বা ইন্দ্রনীল এসে ধরে ধরে বাড়ি নিয়ে যায় .. ভালো ওকে হতেই হবে জানে ইন্দ্র কারণ হলুদ গোলাপ গাছের একটা গোলাপ পাবার আশা তার মনেও যে মাঝে মাঝে উঁকি দেয় …
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।