মুক্তগদ্যে চন্দ্রাবলী মুখোপাধ্যায়

তোমার পরশ লাগে…
এতদিনে তোমার সঙ্গে আমার সম্পর্কটা গাঢ় হ’তে হ’তে সর পড়ে যাওয়ার কথা ছিল । কিন্তু বুঝতেই পারিনি একটা সুড়ঙ্গ খোঁড়া ছিল আমার স্বপ্নের প্রাসাদের তলায় । ভাগ্যের কি সুনিপুন পরিহাস! কে যেন অকালে আমার যৌবনকে গলা টিপে বধ করে দিয়ে গ্যাছে। প্রতিমুহূর্তের দুর্বিপাকের স্মৃতি জ’মে জ’মে আমার প্রশ্বাস প্রায় আটকে যায় আর কি। সে আসুরিক শক্তির কাছে মাথা নত ক’রে দেহের রক্ত-রস নিংড়ে দিয়েছি বারেবার। তবুও দেখেছি তার হৃদয়ে স্নেহ নেই, চোখে জল নেই ।
সে অনুশাসন বড়ো অদ্ভুত! তার-ই তাড়নায় অপাত্রে কন্যা সমর্পণ, তারপর অবধারিত নিত্যনৈমিত্তিক দুর্ঘটনা । পরের ঘরে গিয়ে যে স্বপ্ন দেখার ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলাম, যাকে আপন ভেবে চারপাশে গন্ডী কেটে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম … সে ধন কোথায় গেলো?
অলস অবসরে ঘুরে ফিরে সেই ক্ষতে হাত পড়ে যায় । খালে, বিলে , ডাঙায় আকাশে কোথাও যেন একটা বেদনার সুর …
নাহ্ সে বসন্ত আসেনি । আর আসলেই বা কি? তাকে যে বিদায় দিয়েছি অনেক আগেই ।
জড়-অদৃষ্টের সঙ্গে সংগ্রাম করতে করতে মৃত্যুর আহবানকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছি। ইদানীং মনে হয় আমার ঘরের উঠোন ছায়া দিয়ে ঢেকে, সুগন্ধে আকুল ক’রে, বাহু দিয়ে ঘিরে কে যেনো দাঁড়িয়ে আছে ।
অবশেষে ‘সম্পর্ক’-এর সঠিক অর্থ আমার মনে সিঁধ কেটেছে। তাকে যত্ন ভ’রে আঁকড়ে থাকি সর্বক্ষণ।
এখন জানি ‘সম্পর্ক” মানে অন্ধকার রাতে আকাশ ঠিকরে বিদ্যুৎ চমকালে ‘তার’ আদুর-বুকে মুখ গুঁজে আশ্রয় নেওয়া। ‘সম্পর্ক’ মানে আধো ঘুমে কপালে ‘তার’ ঠোঁটের স্পর্শ পেলে তড়িৎ-গতিতে আমি উদ্দাম …আদরে সোহাগে নিরাভরণ দেহে, তখন পাপড়িগুলোর উঁকিঝুঁকি । শরীরের অধিত্যকা উপত্যকা জলস্রোতে ভাসে। শিশির ভেজা ভোরের বাতাস তখন স্নিগ্ধ-শিরশিরে , রোদের রং অনেকটা কাঁচা সোনার মতো ।
দ্যাখো, আজ সব বেড়া ভেঙ্গে দিয়ে তোমার মহা-অপূর্ব কোলে আমি মাথা রেখে শুয়ে আছি…
আমায় জুঁই ফুল দিয়ে সাজিয়ে দাও।